শনিবার, ১ আগস্ট ২০২৬

অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিলের দায় কার?

৫০ হাজার ৩০০ কোটি টাকার বকেয়ার চাপ, প্রি-পেইড মিটার চার্জ প্রত্যাহারে ধীরগতি—অস্বস্তিতে কোটি কোটি গ্রাহক

বিশেষ অনুসন্ধান | দৈনিক প্রান্তকাল

দেশের বিদ্যুৎ খাত একদিকে যেমন ক্রমবর্ধমান আর্থিক সংকটের মুখে, অন্যদিকে তেমনি অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিল, প্রি-পেইড মিটারে অতিরিক্ত অর্থ কর্তন এবং বিলিং ব্যবস্থার নানা অসঙ্গতিতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন কোটি কোটি গ্রাহক। রাজধানী থেকে জেলা-উপজেলা পর্যন্ত একই অভিযোগ—বাসায় বিদ্যুৎ ব্যবহার বাড়েনি, নতুন কোনো যন্ত্রও সংযোজন হয়নি, উল্টো লোডশেডিং ছিল; তারপরও জুন মাসের বিল এসেছে দুই, তিন, এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে দশ গুণ পর্যন্ত বেশি।

দৈনিক প্রান্তকাল-এর অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এই সংকটের পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ—বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের বিপুল বকেয়া, বিলিং ব্যবস্থার দুর্বলতা, অনিয়মিত মিটার রিডিং, তথ্য এন্ট্রির ভুল, প্রশাসনিক সমন্বয়ের ঘাটতি এবং দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা নীতিগত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ধীরগতি।

বিদ্যুৎ খাতে বকেয়া ৫০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র মিলিয়ে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন বাবদ বকেয়ার পরিমাণ প্রায় ৫০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। মার্চ মাসের হিসাব যুক্ত হলে এই অঙ্ক আরও বাড়বে।

বিদ্যুৎ খাতের অর্থনৈতিক চাপ বাড়ার পেছনে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে মূল্যবৃদ্ধি, আমদানিনির্ভর জ্বালানির ব্যয় বৃদ্ধি, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র চালুর ব্যয়কে প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

জুন এলেই কেন বাড়ে বিদ্যুৎ বিল?

প্রতি বছর জুন মাসে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল নিয়ে অভিযোগ নতুন নয়। কিন্তু এবার অভিযোগের পরিধি ও মাত্রা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি।

রাজধানী ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, সাভার, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, হবিগঞ্জ, কুড়িগ্রাম, নাটোর, জামালপুর, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

গ্রাহকদের ভাষ্য, প্রকৃত ব্যবহার অপরিবর্তিত থাকলেও বিল কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। অনেকেই অভিযোগ করেছেন, বিদ্যুৎ অফিসে না গেলে ভুল ধরা পড়ে না।

পোস্টপেইডে ‘ভূতুড়ে বিল’, প্রি-পেইডেও স্বস্তি নেই

অনুসন্ধানে জানা যায়, শুধু পোস্টপেইড নয়, প্রি-পেইড মিটার ব্যবহারকারীরাও একই ধরনের সমস্যার মুখোমুখি।

রাজধানীর এক গ্রাহক জানান, মাত্র ১৩ দিনের ব্যবধানে প্রায় ৯ হাজার টাকা রিচার্জ করেও মিটারে নগণ্য ব্যালেন্স অবশিষ্ট ছিল। অন্য সময় যেখানে মাসিক ব্যয় তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত, এবার একই ব্যবহারে প্রায় তিন গুণ অর্থ ব্যয় হয়েছে।

আরো একাধিক গ্রাহকের অভিযোগ, রিচার্জ করার কয়েক দিনের মধ্যেই শত শত টাকা বিভিন্ন চার্জ হিসেবে কেটে নেওয়া হয়েছে, যদিও বাসায় ছিল কেবল ফ্যান, লাইট, ফ্রিজের মতো সাধারণ ব্যবহার।

মিটার ভাড়া প্রত্যাহারের ঘোষণা, বাস্তবায়ন কবে?

প্রি-পেইড মিটারের মাসিক ভাড়া (মিটার চার্জ) দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্কের বিষয়।

সরকার গ্রাহকবান্ধব সেবা নিশ্চিত করতে এই চার্জ প্রত্যাহারের নীতিগত সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে। তবে বাস্তবায়ন এখনো শুরু হয়নি।

বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা বাস্তবায়নে একটি কমিটি কাজ করছে। কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অন্যদিকে, গ্রাহকদের প্রশ্ন—মিটারের মূল্য বহু আগেই আদায় হয়ে গেলে প্রতি মাসে ভাড়া আদায়ের যৌক্তিকতা কোথায়?

অতিরিক্ত বিলের পেছনে কী কী কারণ?

বিদ্যুৎ খাতের একাধিক কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে কয়েকটি সম্ভাব্য কারণ উঠে এসেছে—

  • নিয়মিত মিটার রিডিং না নেওয়া।
  • কয়েক মাসের ব্যবহার একসঙ্গে যোগ করে বিল তৈরি।
  • তথ্য এন্ট্রিতে মানবিক ভুল।
  • বিলিং সফটওয়্যারের ত্রুটি।
  • উচ্চ ট্যারিফ স্ল্যাবে চলে যাওয়ায় ইউনিটপ্রতি মূল্য বৃদ্ধি।
  • মাঠপর্যায়ে পর্যাপ্ত তদারকির অভাব।
  • অভিযোগ নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা।

কিছু বিশেষজ্ঞের মতে, অর্থবছরের শেষ সময়ে রাজস্ব সমন্বয়ের চাপও কিছু ক্ষেত্রে অতিরিক্ত বিলের কারণ হয়ে থাকতে পারে। যদিও এ বিষয়ে কোনো সরকারি সংস্থা আনুষ্ঠানিকভাবে এমন অভিযোগ স্বীকার করেনি।

ভুলের মাশুল দিচ্ছেন সাধারণ গ্রাহক

রাজধানীর এক বাসিন্দার মাসিক বিদ্যুৎ বিল সাধারণত দেড় হাজার টাকার কাছাকাছি। কিন্তু জুন মাসে বিল আসে প্রায় ১৪ হাজার ৫০০ টাকা। পরে অভিযোগের পর দেখা যায়, একটি ডিজিট ভুলভাবে এন্ট্রি হয়েছিল। সংশোধনের পর বিল নেমে আসে প্রায় আগের পর্যায়ে।

এ ধরনের আরও বহু অভিযোগ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে পাওয়া গেছে। কোথাও কয়েক হাজার টাকার বিল, কোথাও কয়েক কোটি টাকার বিলও ইস্যু হয়েছে, যা পরে কম্পিউটারজনিত ভুল হিসেবে সংশোধন করা হয়েছে।

প্রশ্ন উঠেছে—যেসব গ্রাহক অভিযোগ করতে পারেন না বা বিষয়টি বুঝতে পারেন না, তাঁদের অতিরিক্ত অর্থের দায় কে নেবে?

সরকারের নির্দেশনা, বাস্তবায়ন কতদূর?

অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বিদ্যুৎ বিভাগ জেলা প্রশাসক এবং বিতরণ কোম্পানিগুলোর কর্মকর্তাদের নিয়ে পর্যালোচনা সভা করেছে।

সেখানে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে—

  • প্রতিটি অভিযোগ দ্রুত তদন্ত করতে হবে।
  • কারিগরি বা তথ্যগত ভুল থাকলে তাৎক্ষণিক সংশোধন করতে হবে।
  • অসদুপায় বা গাফিলতির প্রমাণ মিললে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।
  • ভুল বিলের কারণে কোনো গ্রাহকের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা যাবে না।

তবে মাঠপর্যায়ে এসব নির্দেশনার বাস্তবায়ন নিয়ে এখনো প্রশ্ন রয়েছে।

বিদ্যুৎ খাতে পুরোনো সংকট, নতুন সরকারের চ্যালেঞ্জ

জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান আর্থিক সংকট একদিনে সৃষ্টি হয়নি। দীর্ঘদিনের নীতিগত দুর্বলতা, ব্যয়বহুল বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি, আর্থিক ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা এবং বিতরণ ব্যবস্থার দুর্বলতার প্রভাব এখনো বহন করছে খাতটি।

তাদের মতে, বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি বিতরণ ও বিলিং ব্যবস্থায় প্রযুক্তিনির্ভর স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে গ্রাহক হয়রানি কমবে না।

বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ

জ্বালানি ও ভোক্তা অধিকার বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে—

  • শতভাগ ডিজিটাল ও যাচাইযোগ্য মিটার রিডিং ব্যবস্থা চালু,
  • বিল তৈরির আগে স্বয়ংক্রিয় যাচাই ব্যবস্থা,
  • প্রতিটি বিতরণ কোম্পানিতে স্বাধীন অডিট,
  • প্রি-পেইড মিটারের মাসিক চার্জ প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত দ্রুত বাস্তবায়ন,
  • অতিরিক্ত বিলের অভিযোগ নিষ্পত্তিতে নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ,
  • ভুল বিলের জন্য দায়ী কর্মকর্তা বা কর্মচারীদের জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন।

প্রান্তকালের পর্যবেক্ষণ

অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিল এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; এটি ধীরে ধীরে একটি জাতীয় ভোক্তা-অধিকার ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বাড়তেই পারে, আর্থিক চাপও থাকতে পারে। কিন্তু প্রশাসনিক দুর্বলতা, বিলিং ত্রুটি কিংবা মাঠপর্যায়ের অব্যবস্থাপনার দায় সাধারণ গ্রাহকের ওপর চাপিয়ে দিলে জনআস্থা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

প্রি-পেইড মিটার চার্জ প্রত্যাহারের ঘোষণার দ্রুত বাস্তবায়ন, নির্ভুল বিলিং ব্যবস্থা, জবাবদিহিমূলক প্রশাসন এবং কার্যকর অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থাই পারে বিদ্যুৎ খাতের প্রতি গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন