বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ভারত যথেষ্ট উদ্যোগ নিয়েছে, এবার ঢাকার পালা: সাবেক ভারতীয় হাইকমিশনার

ঢাকা–দিল্লি সম্পর্ক মেরামত সম্ভব, তবে প্রয়োজন দুই পক্ষের উদ্যোগ—পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী

বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে ভারত ইতোমধ্যে যথেষ্ট উদ্যোগ নিয়েছে এবং এখন পরবর্তী পদক্ষেপ ঢাকার ওপর নির্ভর করছে—এমন মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের সাবেক হাইকমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম The Indian Express-এ বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে তিনি বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্কের বর্তমান টানাপোড়েন, তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের সঙ্গে দিল্লির সম্পর্ক, শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান, পানি বণ্টন, সীমান্ত ও নিরাপত্তা এবং বাংলাদেশে চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের ভূমিকা নিয়ে কথা বলেন।

সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন The Indian Express-এর ডিপ্লোম্যাটিক এডিটর শুভজিৎ রায়। সাক্ষাৎকারটি নেওয়া হয়েছিল ৩ সেপ্টেম্বর।

‘সম্পর্ক মেরামত সম্ভব’

দুই দেশের বর্তমান সম্পর্কের উন্নতি সম্ভব কি না—এমন প্রশ্নে পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী ইতিবাচক উত্তর দেন। তবে তাঁর মতে, এর জন্য উভয় পক্ষকেই এগিয়ে আসতে হবে।

তিনি বলেন, “India has made enough overtures. Now it’s up to Dhaka.” অর্থাৎ ভারত যথেষ্ট উদ্যোগ নিয়েছে, এখন ঢাকার পালা।

সাবেক এই কূটনীতিকের মতে, বাংলাদেশ চাইলে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক সীমিত পর্যায়েও রাখতে পারে। তবে ভৌগোলিক অবস্থান, বাণিজ্য, যোগাযোগ, চিকিৎসা ও জনগণের পারস্পরিক সংযোগের কারণে দুই দেশের সম্পর্ককে উপেক্ষা করা কঠিন।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহে ভারত তার সামর্থ্য অনুযায়ী বাংলাদেশকে সহায়তা করছে বলে দাবি করেন তিনি।

তারেক রহমান সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক

তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের প্রতি ভারতের দৃষ্টিভঙ্গি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে পিনাক রঞ্জন বলেন, দিল্লির নীতি হচ্ছে বাংলাদেশে যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক, তার সঙ্গে কাজ করা।

অতীতে সামরিক সরকার, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও নির্বাচিত সরকার—সব ধরনের সরকারের সঙ্গেই ভারত কাজ করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, রাজনৈতিক পরিস্থিতি যাই হোক, মানুষে-মানুষে যোগাযোগ, ব্যবসা, শিক্ষা ও অন্যান্য স্বাভাবিক সম্পর্ক বন্ধ করে দেওয়ার নীতি ভারতের নয়।

তবে বর্তমান বিএনপি সরকারকে খালেদা জিয়ার আগের সরকারের সঙ্গে সরাসরি তুলনা করা ঠিক হবে না বলেও মত দেন তিনি।

শেখ হাসিনা এখন দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু

সাক্ষাৎকারে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থানের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়।

পিনাক রঞ্জন বলেন, শেখ হাসিনার দিল্লিতে অবস্থান এখন দুই দেশের সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদানে পরিণত হয়েছে। তাঁর মতে, হাসিনা সরকারের সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল এবং নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা ও আঞ্চলিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে দিল্লি সেই সরকারের সঙ্গে কাজ করেছে।

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়ার দাবি নিয়েও তিনি কথা বলেন। প্রত্যর্পণের বিষয়টি আইনি প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত বলে উল্লেখ করেন সাবেক এই কূটনীতিক।

একই সঙ্গে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার বক্তব্য ঢাকা–দিল্লির কূটনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে বলে তাঁর মূল্যায়ন। ভারত সরকার তাঁকে বক্তব্য দেওয়া থেকে বিরত রাখতে পারে কি না—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, শেখ হাসিনা ভারতে বন্দী অবস্থায় নেই।

নিরাপত্তা নিয়ে দিল্লির উদ্বেগের কথা

বাংলাদেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন পিনাক রঞ্জন। তাঁর দাবি, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর মুক্তি পাওয়া কিছু ইসলামপন্থী ও সন্ত্রাসবাদে অভিযুক্ত ব্যক্তি পুনর্গঠিত হওয়ার চেষ্টা করছেন।

এ ধরনের তৎপরতা ভারতেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি এবং এ ক্ষেত্রে পাকিস্তান পরিস্থিতিকে কাজে লাগাতে পারে বলে মন্তব্য করেন।

তবে এগুলো পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তীর নিজস্ব মূল্যায়ন; সাক্ষাৎকারে উত্থাপিত এসব অভিযোগের বিষয়ে বাংলাদেশের সরকারের পাল্টা বক্তব্য ওই প্রতিবেদনে বিস্তারিতভাবে উপস্থাপিত হয়নি।

সামনে গঙ্গা পানি চুক্তি

দুই দেশের নদীর পানি বণ্টনকে আসন্ন বড় কূটনৈতিক ইস্যু হিসেবে চিহ্নিত করেছেন সাবেক ভারতীয় হাইকমিশনার।

তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ৫৪টি অভিন্ন নদী থাকলেও পূর্ণাঙ্গ পানি বণ্টন চুক্তি রয়েছে মূলত গঙ্গাকে কেন্দ্র করে। বর্তমান গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা।

তিস্তা চুক্তি দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকার পেছনে পশ্চিমবঙ্গের আপত্তির কথা উল্লেখ করেন তিনি।

গঙ্গা চুক্তির নবায়ন নিয়ে দুই দেশের মধ্যে কঠিন আলোচনা হতে পারে বলেও ধারণা দেন পিনাক রঞ্জন। তাঁর মতে, বাংলাদেশ আরও নিশ্চিত পানিপ্রবাহ চাইতে পারে; অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তন, হিমবাহ সংকোচন এবং পানির ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে ভারতের জন্য সেই দাবি পূরণ করা কঠিন হতে পারে।

বাংলাদেশ ঘিরে চীন–যুক্তরাষ্ট্র–পাকিস্তান প্রসঙ্গ

সাক্ষাৎকারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল বাংলাদেশের সঙ্গে চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের সম্পর্ক এবং তার প্রভাব।

পিনাক রঞ্জনের মতে, বাংলাদেশের ওপর চীনের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত প্রভাব উল্লেখযোগ্য। তিনি বলেন, বাংলাদেশের সামরিক সরঞ্জামের বড় অংশ চীন থেকে আসে এবং বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের মাধ্যমেও দেশটিতে বেইজিংয়ের উপস্থিতি বেড়েছে।

তিনি দাবি করেন, বঙ্গোপসাগরে কৌশলগত প্রবেশাধিকার সম্প্রসারণে চীনের আগ্রহ রয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র এ ধরনের চীনা কৌশলগত সম্প্রসারণকে ইতিবাচকভাবে দেখে না।

পাকিস্তানের ক্ষেত্রেও তিনি ভারতকেন্দ্রিক কৌশলগত প্রতিযোগিতার কথা বলেন। তবে বাংলাদেশ পাকিস্তানের সঙ্গে এমন কোনো অবস্থানে যাবে কি না, যাতে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক আরও খারাপ হয়—সে বিষয়ে তিনি সংশয় প্রকাশ করেন।

ঢাকা–দিল্লি সম্পর্ক কোন পথে

সাক্ষাৎকারটির মূল বার্তা হচ্ছে, বর্তমান টানাপোড়েন সত্ত্বেও বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্ক পুনর্গঠনের সুযোগ এখনো রয়েছে। তবে পিনাক রঞ্জনের দৃষ্টিতে দিল্লি ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি উদ্যোগ নিয়েছে এবং এখন ঢাকা কীভাবে সাড়া দেয়, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।

সম্প্রতি দুই দেশের সম্পর্কে শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান, তাঁর প্রত্যর্পণ প্রশ্ন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য ভারত সফর এবং পারস্পরিক রাজনৈতিক বক্তব্য নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। The Indian Express গত কয়েক সপ্তাহে এসব বিষয় নিয়ে একাধিক প্রতিবেদনও প্রকাশ করেছে।

ফলে আগামী দিনে গঙ্গা পানি চুক্তির নবায়ন, নিরাপত্তা সহযোগিতা, জ্বালানি ও বাণিজ্য, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ এবং উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক সফর—এই কয়েকটি বিষয়ই ঢাকা–দিল্লি সম্পর্কের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন