বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ইসরায়েল বয়কট ও নিষেধাজ্ঞার পক্ষে ব্রিটেনের বৃহত্তম শ্রমিক জোট

প্রথমবারের মতো BDS আন্দোলনের প্রতি সমর্থন TUC-এর • ইসরায়েলের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা ও অস্ত্র বাণিজ্য বন্ধের প্রচার চালানোর আহ্বান • বিস্তৃত নিষেধাজ্ঞার দাবি • ব্রিটিশ সরকার বলছে, অবৈধ বসতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেও BDS সমর্থন করে না

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

গাজা যুদ্ধ ও অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার প্রতিবাদে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে বয়কট, বিনিয়োগ প্রত্যাহার ও নিষেধাজ্ঞার (BDS) আন্দোলনকে সমর্থন করেছে যুক্তরাজ্যের বৃহত্তম শ্রমিক সংগঠনগুলোর ছাতাসংগঠন Trades Union Congress (TUC)। ব্রাইটনে অনুষ্ঠিত ১৫৮তম বার্ষিক কংগ্রেসে বুধবার এ-সংক্রান্ত প্রস্তাব গৃহীত হয়। TUC-এর ২০২৬ সালের সম্মেলন ১৩ থেকে ১৬ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হয়েছে।

বিভিন্ন প্রতিবেদনে এই সিদ্ধান্তকে TUC-এর জন্য তাৎপর্যপূর্ণ নীতিগত পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে। সংগঠনটি পাঁচ মিলিয়নের বেশি শ্রমিকের প্রতিনিধিত্ব করে এবং এবারই প্রথম ফিলিস্তিনিদের নেতৃত্বাধীন BDS আন্দোলনের প্রতি আনুষ্ঠানিক সমর্থন জানাল।

কী আছে প্রস্তাবে

Artists’ Union England-এর উত্থাপিত এবং UNISON-এর সমর্থিত প্রস্তাবে গাজায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ও অধিকৃত পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার বিরুদ্ধে সংগঠিত পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এর আওতায় যুক্তরাজ্য-ইসরায়েল সামরিক সহযোগিতা ও অস্ত্র বাণিজ্যের অবসানের জন্য প্রচার, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে বিস্তৃত নিষেধাজ্ঞার দাবি এবং ফিলিস্তিনের পক্ষে শ্রমিক সংগঠনগুলোর বিভিন্ন প্রচারাভিযানকে সমর্থনের কথা রয়েছে।

প্রস্তাবটি এমন শ্রমিক ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের প্রতিও সমর্থন জানিয়েছে, যারা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে বিবেচিত পণ্য ও সেবা নিয়ে কাজ করতে অস্বীকৃতি জানান। প্রস্তাবের ভাষায় ইসরায়েলের নীতির বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক ও সাংস্কৃতিক চাপ তৈরির কৌশল হিসেবে BDS-কে সমর্থন করা হয়েছে।

Artists’ Union England-এর জিটা হলবর্ন বলেন, ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের উচিত ফিলিস্তিনিদের সংহতির আহ্বানে সাড়া দেওয়া এবং নিজেদের সম্মিলিত শক্তি ব্যবহার করা।

BDS কী

BDS-এর পূর্ণরূপ Boycott, Divestment and Sanctions অর্থাৎ বয়কট, বিনিয়োগ প্রত্যাহার ও নিষেধাজ্ঞা। ফিলিস্তিনপন্থী এই আন্তর্জাতিক আন্দোলন ইসরায়েলের ওপর অর্থনৈতিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও সাংস্কৃতিক চাপ সৃষ্টির আহ্বান জানায়।

আন্দোলনের সহপ্রতিষ্ঠাতা ওমর বারঘুতি TUC-এর সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যে ফিলিস্তিনের পক্ষে গড়ে ওঠা আন্দোলন সরকারের ওপরও চাপ সৃষ্টি করছে। তবে ব্রিটিশ সরকারের নেওয়া সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলোকে তিনি পর্যাপ্ত মনে করেন না।

সরকারের সঙ্গে TUC-এর অবস্থানের স্পষ্ট পার্থক্য

TUC-এর সিদ্ধান্তের কয়েক দিন আগেই ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলি বসতির বিরুদ্ধে নতুন ব্যবস্থা ঘোষণা করেন। ৮ সেপ্টেম্বর পার্লামেন্টে তিনি জানান, অবৈধ বসতিতে উৎপাদিত পণ্য আমদানি নিষিদ্ধ করতে সরকার নতুন নিষেধাজ্ঞা কাঠামো আনবে। বসতি সম্প্রসারণে অর্থায়ন, নির্মাণ, অবকাঠামো বা অন্যান্য সহায়তায় যুক্ত নির্দিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দেন তিনি।

তবে একই বক্তব্যে মিলিব্যান্ড BDS আন্দোলনের বিরোধিতা করেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ব্রিটিশ সরকারের ব্যবস্থা অবৈধ বসতি ও বসতি সম্প্রসারণকে লক্ষ্য করবে, সামগ্রিকভাবে ইসরায়েলকে নয়। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সীমার ভেতরে ইসরায়েলের সঙ্গে বৈধ বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখার কথাও বলেছেন তিনি।

অস্ত্র রপ্তানির ক্ষেত্রেও সরকার জানিয়েছে, গাজায় ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর ব্যবহারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৩০টির বেশি অস্ত্র রপ্তানি লাইসেন্সের স্থগিতাদেশ বহাল রয়েছে। একই সঙ্গে দখলদারিত্বে প্রত্যক্ষ অবদান রাখতে পারে এমন অস্ত্র ও অন্যান্য পণ্যের নতুন রপ্তানি লাইসেন্স প্রত্যাখ্যানের নীতিও ঘোষণা করা হয়েছে।

পশ্চিম তীর নিয়েও বাড়ছে চাপ

অধিকৃত পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণের বিরুদ্ধেও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে লন্ডনের অবস্থান কঠোর হয়েছে। গত আগস্টে E1 বসতি প্রকল্পের দরপত্র প্রকাশের পর ব্রিটিশ সরকার এর নিন্দা জানিয়ে বলেছিল, প্রকল্পটি পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমের ভৌগোলিক সংযোগ এবং দ্বিরাষ্ট্র সমাধানের সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। যুক্তরাজ্য ইসরায়েলি বসতিগুলোকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচনা করে।

ফলে TUC-এর নতুন সিদ্ধান্ত এমন সময়ে এলো, যখন ইসরায়েল-ফিলিস্তিন ইস্যুতে ব্রিটিশ সরকারের নীতিতেও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। তবে দুই পক্ষের অবস্থানের গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়ে গেছে সরকার অবৈধ বসতির বিরুদ্ধে লক্ষ্যভিত্তিক ব্যবস্থা নিচ্ছে এবং BDS প্রত্যাখ্যান করছে; অন্যদিকে TUC এখন সরাসরি BDS আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে।

Palestine Solidarity Campaign-এর উপপরিচালক পিটার লিয়ারি TUC-এর সিদ্ধান্তকে আন্দোলনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর সংগঠনের দাবি, সরকারের বর্তমান ব্যবস্থার চেয়ে আরও বিস্তৃত অর্থনৈতিক ও সামরিক পদক্ষেপ প্রয়োজন।

TUC-এর ভোট সরাসরি ব্রিটিশ সরকারের নীতি পরিবর্তন করে না। তবে দেশটির সবচেয়ে বড় শ্রমিক সংগঠনগুলোর সম্মিলিত প্ল্যাটফর্ম থেকে BDS-এর প্রতি আনুষ্ঠানিক সমর্থন আসায় ইসরায়েল-ফিলিস্তিন ইস্যুতে সরকার ও ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের নীতিগত ব্যবধান আরও স্পষ্ট হলো।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন