বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

প্রকল্পে অহেতুক বিলম্ব গ্রহণযোগ্য নয়: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

প্রতিটি প্রকল্পে সময়সীমা বেঁধে দেওয়ার নির্দেশ • জনশৃঙ্খলা ও সুরক্ষা খাতে বরাদ্দ ২,৬৬২ কোটি টাকা • জেলায় জেলায় ডগ স্কোয়াড ও আধুনিক ফরেনসিক ল্যাবের পরিকল্পনা • গ্রামীণ থানায় হবে অভিন্ন ‘মডেল থানা’

নিজস্ব প্রতিবেদক

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন প্রকল্পে অহেতুক বিলম্বের কারণে ব্যয় বেড়ে যাওয়া আর মেনে নেওয়া হবে না বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। প্রতিটি প্রকল্পে সময়ভিত্তিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে নির্দিষ্ট মেয়াদের মধ্যেই কাজ শেষ করার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।

বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আওতায় বাস্তবায়নাধীন এবং ‘সবুজ পাতায়’ অন্তর্ভুক্ত অননুমোদিত প্রকল্পের পর্যালোচনা সভায় এ নির্দেশ দেন মন্ত্রী।

সভায় প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি বাড়ানো, নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা এবং পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

‘টাইম ওভাররান কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে অহেতুক সময়ক্ষেপণ বা ‘টাইম ওভাররান’ হলে শেষ পর্যন্ত প্রকল্পের ব্যয়ও বেড়ে যায়। এ কারণে প্রতিটি প্রকল্পের জন্য সুস্পষ্ট সময়সীমা বা ‘টাইম বার’ নির্ধারণ করতে হবে।

নতুন ও সংশোধিত প্রকল্পের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) দ্রুত প্রস্তুত করারও নির্দেশ দেন তিনি।

কারাগারসংক্রান্ত প্রকল্পে নিরাপত্তা ও যাতায়াতের বিধিনিষেধের কারণে কাজের স্বাভাবিক গতি কিছুটা ব্যাহত হতে পারে বলে উল্লেখ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তবে সাধারণ সিভিল ও অবকাঠামো প্রকল্পে বিলম্বের সুযোগ নেই বলে স্পষ্ট করেন তিনি।

স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের (এসআরবি) সদর দপ্তর নির্মাণসহ সাধারণ অবকাঠামোগত প্রকল্পগুলো নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়।

প্রতি জেলায় ডগ স্কোয়াড, আধুনিক ফরেনসিক ল্যাব

মাদক নিয়ন্ত্রণ ও অপরাধ তদন্তে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে বেশ কয়েকটি প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

এর মধ্যে রয়েছে প্রতি জেলায় ডগ স্কোয়াড গঠন, ডোপ টেস্টের সুবিধা সম্প্রসারণ, হাজতখানা ও মালখানা সংস্কার এবং জেলা পর্যায়ে আধুনিক ফরেনসিক ও ডিজিটাল ফরেনসিক অবকাঠামো স্থাপন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসব প্রকল্পের জন্য সুনির্দিষ্ট সময়সূচি নির্ধারণ করে বাস্তবায়ন এগিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেন।

সরকার এরই মধ্যে ডিজিটাল ফরেনসিক ও সাইবার সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনার কথা সংসদেও জানিয়েছে। পুরো ঢাকা শহরকে সিসিটিভি নজরদারির আওতায় আনতে ‘ডেভেলপমেন্ট অব স্মার্ট পুলিশিং ইন ডিএমপি’ প্রকল্পের ডিপিপিও পুনর্গঠন করা হচ্ছে।

গ্রামীণ থানাগুলো হবে ‘মডেল থানা’

দেশের গ্রামীণ এলাকার থানাগুলোর অবকাঠামোয় একটি অভিন্ন মান প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

সভায় গ্রামীণ থানাগুলোকে মানসম্মত ‘মডেল থানা’ হিসেবে গড়ে তুলতে একটি নির্দিষ্ট ‘প্রোটোটাইপ ডিজাইন’ অনুসরণের নির্দেশ দেওয়া হয়।

যেসব এলাকায় থানা বা সংশ্লিষ্ট স্থাপনা নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় জমির সংকট রয়েছে, সেখানে দ্রুত ভূমি অধিগ্রহণ করে বিচ্ছিন্ন প্রকল্পের পরিবর্তে একটি সমন্বিত প্রকল্প নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর লজিস্টিকস ও যানবাহন সংকট সমাধানেও সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানানো হয়।

পৃথক প্রকল্পের বদলে ‘ক্লাস্টার অ্যাপ্রোচ’

সভায় পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি উন্নয়ন প্রকল্পে একই ধরনের কাজের পুনরাবৃত্তি বা ‘ওভারল্যাপিং’ এড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন।

পৃথক পৃথক প্রকল্প নেওয়ার পরিবর্তে একই ধরনের কাজগুলোকে সমন্বিত করে ‘প্রোগ্রামেটিক বা ক্লাস্টার অ্যাপ্রোচ’ গ্রহণের আহ্বান জানান তিনি।

সরকারের বর্তমান মেয়াদের বাকি চার থেকে সাড়ে চার বছরের মধ্যে দৃশ্যমান ফল অর্জনের লক্ষ্যে চলমান প্রকল্পগুলো পুনর্মূল্যায়ন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ‘রিস্কোপিং’ করার ওপরও গুরুত্ব দেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী।

জনশৃঙ্খলা ও সুরক্ষায় ২,৬৬২ কোটি টাকা

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এডিপিতে ‘জনশৃঙ্খলা ও সুরক্ষা’ খাতের উন্নয়নে মোট ২ হাজার ৬৬২ কোটি ৫ লাখ টাকা বরাদ্দ রয়েছে।

এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন ২ হাজার ৫৫২ কোটি ৮ লাখ টাকা এবং প্রকল্প ঋণ ও অনুদান ১০৯ কোটি ৯৭ লাখ টাকা।

এই অর্থের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় যাতে অপ্রয়োজনীয়ভাবে না বাড়ে, সেদিকে নজর দেওয়ার নির্দেশনা আসে পর্যালোচনা সভায়।

নির্বাচনী ইশতেহারের ২৬ প্রতিশ্রুতির ম্যাপিং

সভায় জানানো হয়, ‘সুরক্ষিত ও শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশ’ গড়ার লক্ষ্য সামনে রেখে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বিএনপির ‘নির্বাচনী ইশতেহার ২০২৬’-এর ২৬টি প্রতিশ্রুতির ম্যাপিং সম্পন্ন হয়েছে।

সরকারের পঞ্চবার্ষিক অর্থনৈতিক সংস্কার ও উন্নয়ন কৌশল—জুলাই ২০২৬ থেকে জুন ২০৩১—এর ‘৩আর স্ট্র্যাটেজি’ অর্থাৎ রিকভারি, রেস্টোরেশন ও রিকনস্ট্রাকশন অনুসরণ করে আইনশৃঙ্খলা খাতের অবকাঠামো ও সক্ষমতা উন্নয়নের পরিকল্পনার কথাও সভায় তুলে ধরা হয়।

এর আগে সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে সরকার স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনা নিয়েছে।

সভায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, মন্ত্রণালয়ের অধীন ১০টি দপ্তর ও সংস্থার প্রধান এবং সংশ্লিষ্ট প্রকল্প পরিচালকরা উপস্থিত ছিলেন।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন