বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রাজধানীর পাঁচ লেক দূষণমুক্ত করতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ

পয়ঃবর্জ্যের সংযোগ বন্ধ ও এসটিপি স্থাপনে জোর • গুলশান লেকে দূষণের ১২ উৎস চিহ্নিত • বর্জ্য অপসারণের নৌকা ২ থেকে বাড়িয়ে ১০টি করার নির্দেশ • স্লাজ অপসারণে নামবে ভাসমান এক্সক্যাভেটর

নিজস্ব প্রতিবেদক

রাজধানীর গুলশান, বনানী, বারিধারা, নিকেতন ও ধানমণ্ডি লেককে দূষণমুক্ত করতে সমন্বিত কার্যক্রম জোরদারের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। লেকগুলোতে পয়ঃবর্জ্য প্রবেশের পথ বন্ধ, নিয়মিত ভাসমান বর্জ্য ও স্লাজ অপসারণ, প্রয়োজনীয় স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (এসটিপি) স্থাপন এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।

বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) দুপুরে বাংলাদেশ সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এসব লেকের দূষণ পরিস্থিতি ও পরিবেশগত উন্নয়ন পরিকল্পনা পর্যালোচনা করা হয়।

বৈঠকে গুলশান, বনানী, বারিধারা ও নিকেতন এলাকার লেকগুলোর বর্তমান অবস্থা, দূষণের উৎস এবং সংস্কার পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়। পাশাপাশি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অধীনে ধানমণ্ডি লেকের সংস্কার, স্লাজ অপসারণ ও পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের অগ্রগতিও পর্যালোচনা করা হয়।

গুলশান লেকে পয়ঃবর্জ্য ঢোকার ১২ পয়েন্ট

বৈঠকে জানানো হয়, গুলশান লেকে পয়ঃবর্জ্য প্রবেশের ছয়টি প্রাইমারি ও ছয়টি সেকেন্ডারি পয়েন্ট চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব পথ দিয়ে দূষিত পানি ও পয়ঃবর্জ্য লেকে প্রবেশ করছে।

সমস্যা সমাধানে গঠিত কারিগরি কমিটি বৈঠকে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি করণীয় তুলে ধরে।

লেকে পয়ঃবর্জ্য প্রবেশের পথ বন্ধ করার পাশাপাশি ভবনভিত্তিক এসটিপি স্থাপন এবং বিদ্যমান স্যুয়ারেজ নেটওয়ার্কের বিস্তারিত জরিপের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

বাসাবাড়ি ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের পয়ঃনিষ্কাশন লাইন সরাসরি বৃষ্টির পানির ড্রেন বা লেকের সঙ্গে যুক্ত আছে কি না, তা শনাক্ত করে অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে ঢাকা ওয়াসা ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনকে সমন্বিতভাবে কাজ করার বিষয়েও আলোচনা হয়।

গুলশান-বনানী এলাকার পয়ঃবর্জ্য সরাসরি লেক ও স্টর্ম স্যুয়ারেজ ব্যবস্থায় পড়ার অভিযোগ নতুন নয়। এ বিষয়ে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় গত জুনেও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে নিয়ে বৈঠকের উদ্যোগ নেয়।

বর্জ্য পরিষ্কারের নৌকা ২ থেকে হবে ১০টি

লেক পরিষ্কারের সক্ষমতা বাড়াতে বর্তমানে ভাসমান বর্জ্য অপসারণে ব্যবহৃত যান্ত্রিক নৌকার সংখ্যা দুটি থেকে বাড়িয়ে ১০টি করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

শুধু পানির ওপরের ময়লা সরানো নয়, লেকের তলদেশে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা স্লাজ অপসারণেও জোর দেওয়া হয়েছে। এ কাজে ভাসমান এক্সক্যাভেটর ব্যবহারের পাশাপাশি নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনার নির্দেশনা দেওয়া হয়।

গুলশান লেকের দূষণের মাত্রা নিয়ে এর আগেও উদ্বেগের তথ্য এসেছে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে লেকের কিছু অংশে ঘন বর্জ্য ও দুর্গন্ধের পাশাপাশি বাসাবাড়ির পয়োবর্জ্য প্রবেশের অভিযোগ উঠে এসেছে।

ভবনে এসটিপি নিশ্চিত করার নির্দেশনা

ঢাকা মহানগর ইমারত বিধিমালা, ২০২৫ অনুযায়ী যেসব ভবনে এসটিপি স্থাপন বাধ্যতামূলক, সেগুলোতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তা নিশ্চিত করার ওপর বৈঠকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।

গুলশান-বনানী এলাকায় শর্তসাপেক্ষে স্যুয়ারেজ বিল আদায় এবং পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়নে ক্যাচমেন্ট এরিয়া তৈরির বিষয়টিও আলোচনায় আসে।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার ভবনের পয়োবর্জ্য ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিন ধরেই বড় ঘাটতি রয়েছে। এর আগে একটি জরিপে গুলশানের ৫২৪টি বাড়ির মধ্যে ৩৬৭টির পয়োবর্জ্যের সংযোগ সরাসরি নালায় পাওয়ার তথ্য প্রকাশিত হয়েছিল।

লেকের পানিতে অক্সিজেন বাড়ানোর পরিকল্পনা

শুধু দৃশ্যমান বর্জ্য পরিষ্কার নয়, লেকের পানির পরিবেশগত মান পুনরুদ্ধারের বিষয়েও বৈঠকে একাধিক প্রস্তাব এসেছে।

পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন বাড়াতে এরেটর স্থাপন, দুর্গন্ধ কমাতে জৈবিক ও রাসায়নিক পদ্ধতির সমন্বিত ব্যবহার এবং দীর্ঘমেয়াদে আধুনিক স্যানিটেশন নেটওয়ার্ক নির্মাণের প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়।

এর মাধ্যমে লেকগুলোর পানির মান উন্নত করার পাশাপাশি জলজ পরিবেশ পুনরুদ্ধারের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

পাঁচ বিশেষ টিমে ৪২ জন

রাজউকের আওতাধীন লেকগুলোর সংরক্ষণ, পরিচ্ছন্নতা ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ইতোমধ্যে ৪২ জন জনবলের সমন্বয়ে পাঁচটি বিশেষ টিম নিয়োজিত করা হয়েছে বলে বৈঠকে জানানো হয়।

এসব টিমকে নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা, বর্জ্য অপসারণ এবং লেকের সার্বিক অবস্থা পর্যবেক্ষণের কাজে যুক্ত রাখা হবে।

ধানমণ্ডি লেকের কাজও পর্যালোচনা

বৈঠকে ধানমণ্ডি লেকের পরিবেশ পুনরুদ্ধারের উদ্যোগও পর্যালোচনা করা হয়। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে লেক সংস্কার, তলদেশের স্লাজ অপসারণ এবং চলমান পাইলট কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা হয়।

ধানমণ্ডি লেকের পরিবেশগত উন্নয়ন ও অবকাঠামো সংস্কারে সাম্প্রতিক সময়ে প্রায় ৭৫ কোটি টাকার একটি পরিকল্পনার কথাও সামনে এসেছে।

এর আগে জুলাইয়ে প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত আরেক বৈঠকে গুলশান ও বারিধারা লেকে যুক্ত অবৈধ বর্জ্য নির্গমনের লাইন ছয় মাসের মধ্যে বন্ধ করার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। ওই বৈঠকেও ধানমণ্ডি ও গুলশান লেকের সংস্কার এবং পয়ঃশোধনাগার স্থাপনের বিষয়টি আলোচনায় ছিল।

সমন্বিতভাবে কাজ করবে সংশ্লিষ্ট সংস্থা

বৈঠকের আলোচনায় উঠে আসে, লেকের দূষণ শুধু পরিচ্ছন্নতার সমস্যা নয়; এর সঙ্গে রাজধানীর পয়ঃনিষ্কাশন, ভবনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, স্টর্ম ড্রেন এবং দীর্ঘমেয়াদি স্যানিটেশন অবকাঠামো সরাসরি যুক্ত।

এ কারণে রাজউক, ঢাকা ওয়াসা, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে বিচ্ছিন্নভাবে নয়, সমন্বিত পরিকল্পনার আওতায় কাজ করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

বৈঠকে গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আবদুস সালাম, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আবদুস সাত্তারসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন