মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

মেসিকে কাঁদিয়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেন: তোরেসের অতিরিক্ত সময়ের গোলে নতুন ইতিহাস

ফেরান তোরেসের অতিরিক্ত সময়ের একমাত্র মহাকাব্যিক গোলে আর্জেন্টিনাকে ১-০ ব্যবধানে হারিয়ে বিশ্বকাপের সোনালী ট্রফি নিজেদের ঘরে তুলেছে স্পেন। নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত এই ফাইনালের মাধ্যমে বিশ্ব ফুটবলের মহানায়ক লিওনেল মেসির আন্তর্জাতিক মঞ্চ থেকে বিদায়টা আর স্মরণীয় হতে পারল না। ৩৯ বছর বয়সী এই মহাতারকা পুরো ম্যাচ জুড়েই স্প্যানিশ প্রেসিংয়ের মুখে কার্যত নিষ্প্রভ ছিলেন, যা ছিল সম্ভবত তাঁর ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচ।

তোরেসের জাদু ও একপেশে ফাইনাল

ম্যাচের শুরু থেকেই কৌশলী ও আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখে স্পেন। পুরো ১২০ মিনিটের এই হাই-ভোল্টেজ ম্যাচে আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগ স্পেনের রক্ষণে কোনো সুবিধাই করতে পারেনি, এমনকি তারা একটি শটও টার্গেটে রাখতে ব্যর্থ হয়। মেটলাইফের ৮০ হাজারেরও বেশি দর্শকের গ্যালারিতে উপস্থিত থেকে এই ঐতিহাসিক ম্যাচ উপভোগ করেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

দীর্ঘ সময় ধরে আর্জেন্টিনার গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজ দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে ম্যাচটিকে টাইব্রেকারে নিয়ে যাওয়ার আভাস দিচ্ছিলেন। অতিরিক্ত সময়ে নিকো উইলিয়ামসের একটি গোল ফাউলের অভিযোগে বাতিল হলে স্পেনের অপেক্ষা আরও বাড়ে। তবে অবশেষে ১০৬তম মিনিটে ডেডলক ভাঙেন লা রোহারা। পেদ্রো পোরোর উঁচু করে বাড়ানো ক্রস থেকে নিকো উইলিয়ামস হেডের মাধ্যমে বল নামিয়ে দেন ফেরান তোরেসের সামনে। বার্সেলোনা স্ট্রাইকার তোরেস দারুণ এক জোরালো শটে বল জালে জড়িয়ে স্পেনকে ২০১০ সালের পর দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ শিরোপার স্বাদ এনে দেন।

ফাউলের ছড়াছড়ি ও এনজোর লাল কার্ড

পুরো ম্যাচ জুড়েই আর্জেন্টিনার ফুটবলাররা স্পেনের গতিময় আক্রমণ থামাতে ফাউলের আশ্রয় নেন। ম্যাচের ১৫তম মিনিটেই ডানি ওলমোকে বিপজ্জনক ট্যাকল করেন আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার, তবে স্লোভেনিয়ান রেফারি স্লাভকো ভিনচিচ কার্ড দেখানো থেকে বিরত থাকেন। কিছুক্ষণ পর স্পেনের আলে বায়েনা কনুই দিয়ে লিওনেল মেসির পিঠে আঘাত করলেও রেফারি কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেননি।

লামিন ইয়ামালকে ফাউল করেও নিকোলাস তাগলিয়াফিকো পার পেয়ে গেলেও ৪১ মিনিটে মিকেল ওয়ারজাবালকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ফাউল করে প্রথম হলুদ কার্ড দেখেন লিসান্দ্রো মার্টিনেজ। এর কিছুক্ষণ পরই চোটের কারণে লিসান্দ্রো মাঠ ছাড়লে ওটামেন্ডি রক্ষণভাগে স্থলাভিষিক্ত হন। আর্জেন্টিনার এই অসংযত খেলার চূড়ান্ত পরিণতি ঘটে অতিরিক্ত সময়ে। ৮২ মিনিটে প্রথম হলুদ কার্ড দেখা মিডফিল্ডার এনজো ফার্নান্দেজ ইনজুরি টাইমে স্প্যানিশ ডিফেন্ডার পাও কুবারসির ওপর ভয়ংকর ট্যাকল করে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড অর্থাৎ লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন। ১০ জনের দলে পরিণত হওয়া আর্জেন্টিনা শেষ পর্যন্ত আর ম্যাচে ফিরতে পারেনি।

মার্টিনেজের বীরত্ব ও স্পেনের একচ্ছত্র আধিপত্য

ম্যাডোনা, শাকিরা ও জাস্টিন বিবারের পারফরম্যান্সে ঠাসা দীর্ঘ ২৭ মিনিটের জমকালো হাফটাইম শোর পর দ্বিতীয়ার্ধে ম্যাচ পুরোপুরি একপেশে হয়ে ওঠে। স্পেনের কোচ লুইস ডি লা ফুয়েন্তে কৌশলগত কারণে ফাবিয়ান রুইজ ও ওয়ারজাবালের জায়গায় পেদ্রি ও ফেরান তোরেসকে মাঠে নামালে আক্রমণের ধার আরও বৃদ্ধি পায়।

তবে আর্জেন্টিনার হারের ব্যবধান বাড়তে দেননি গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজ। ৩৯তম মিনিটে ওয়ারজাবালের শট লুফে নেওয়ার পর দ্বিতীয়ার্ধে ইয়ামালের ক্রস থেকে তোরেসের হেড এবং পেদ্রি-কুবারসির দূরপাল্লার শট দুর্দান্ত দক্ষতায় প্রতিহত করেন তিনি。 এছাড়া ম্যাচের শেষ মুহূর্তে ইয়ামালের বাঁকানো ফ্রি-কিক এবং অতিরিক্ত সময়ে নিকো উইলিয়ামসের হেড এক হাতে ঠেকিয়ে আর্জেন্টিনাকে ম্যাচে টিকিয়ে রেখেছিলেন মার্টিনেজ।

ব্রাজিলের পর টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জয়ের হাতছানি থাকা আর্জেন্টিনা শেষ মুহূর্তে মরিয়া হয়ে সমতা ফেরানোর চেষ্টা করলেও স্পেনের ইস্পাতকঠিন রক্ষণভাগ তা নস্যাৎ করে দেয়। ফলে বিশ্বজয়ের উল্লাসে মাতে লুইস ডি লা ফুয়েন্তের শিষ্যরা।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন