শুক্রবার, ২১ আগস্ট ২০২৬

চ্যাটজিপিটি চালুর পর প্রকাশিত ওয়েবপেজের ৩৫ শতাংশে এআই ব্যবহারের ইঙ্গিত: পিউ গবেষণা

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এখন শুধু ইন্টারনেট থেকে তথ্য সংগ্রহ বা বিশ্লেষণ করছে না, ওয়েবের নতুন কনটেন্ট তৈরিতেও বড় ভূমিকা রাখতে শুরু করেছে। চ্যাটজিপিটি চালুর পর প্রকাশিত ইংরেজি ভাষার ওয়েবপেজগুলোর এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি বা প্রায় ৩৫ শতাংশে এআই দিয়ে লেখা অথবা উল্লেখযোগ্যভাবে সম্পাদনার লক্ষণ পাওয়া গেছে বলে নতুন এক গবেষণায় উঠে এসেছে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক পিউ রিসার্চ সেন্টারের বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) প্রকাশিত গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণাটি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইন্টারনেটে এআই-নির্ভর কনটেন্ট কত দ্রুত বাড়ছে, তার একটি চিত্র তুলে ধরেছে।

বিশ্লেষণ করা হয়েছে প্রায় পাঁচ লাখ ওয়েবপেজ

গবেষণার জন্য পিউ রিসার্চ সেন্টার ‘কমন ক্রল’ ওয়েব আর্কাইভ থেকে প্রায় পাঁচ লাখ ইংরেজি ওয়েবপেজ সংগ্রহ করে। নমুনাগুলো নেওয়া হয়েছে প্রায় পাঁচ বছরের সময়কাল থেকে—অর্থাৎ ২০২২ সালের নভেম্বরে চ্যাটজিপিটি চালুর কয়েক বছর আগে থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত।

ওয়েবপেজগুলোতে এআইয়ের মাধ্যমে লেখা বা উল্লেখযোগ্য সম্পাদনার সম্ভাবনা শনাক্ত করতে Open Pangram-এর প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়।

২০২৬ সালের জুলাইয়ে সংগ্রহ করা ১০ হাজার ওয়েবপেজের একটি দৈবচয়ন নমুনা বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা প্রথমে দেখতে পান, প্রায় ১০ শতাংশ পেজে এআই দিয়ে লেখা বা উল্লেখযোগ্যভাবে সম্পাদনার শক্তিশালী লক্ষণ রয়েছে।

তবে এই নমুনায় পুরোনো ওয়েবপেজও ছিল—যেগুলোর অনেকগুলো আধুনিক জেনারেটিভ এআই লেখার সরঞ্জাম ব্যাপকভাবে ব্যবহারের আগেই প্রকাশিত হয়েছিল।

চ্যাটজিপিটি-পরবর্তী ওয়েবপেজে হার ৩৫ শতাংশ

এ কারণে গবেষকেরা পুরোনো ওয়েবপেজ বাদ দিয়ে ২০২২ সালের নভেম্বরে চ্যাটজিপিটি প্রকাশের পর তৈরি ওয়েবপেজগুলো আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করেন।

এই বিশ্লেষণেই বড় পার্থক্য দেখা যায়। চ্যাটজিপিটি চালুর পর প্রকাশিত ওয়েবপেজগুলোর ৩৫ শতাংশে এআই দিয়ে লেখা বা উল্লেখযোগ্য সম্পাদনার লক্ষণ শনাক্ত হয়।

ফলে গবেষণাটি ইঙ্গিত করছে, জেনারেটিভ এআই সাধারণ মানুষের নাগালে আসার পর মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে অনলাইনে নতুন কনটেন্ট তৈরির প্রক্রিয়ায় প্রযুক্তিটির উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য মাত্রায় পৌঁছেছে।

‘ডটকম’ ওয়েবসাইটে এআইয়ের উপস্থিতি বেশি

ডোমেইনের ধরন অনুযায়ী বিশ্লেষণেও বড় পার্থক্য পেয়েছেন গবেষকেরা।

পিউয়ের গবেষণা অনুযায়ী, .com ডোমেইনের ওয়েবপেজে এআই-লেখার লক্ষণ .edu.gov ডোমেইনের তুলনায় প্রায় ১০ গুণ বেশি পাওয়া গেছে।

.edu এবং .gov ডোমেইনের ক্ষেত্রে এআই দিয়ে লেখা হিসেবে শনাক্ত হওয়ার হার ছিল প্রায় ১ শতাংশ। অন্যদিকে .org ডোমেইনে এ হার পাওয়া গেছে ৪ দশমিক ৬ শতাংশ।

এ থেকে বাণিজ্যিক ওয়েবসাইট ও সাধারণ অনলাইন প্রকাশনায় এআইভিত্তিক কনটেন্ট তৈরির ব্যবহার সরকারি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটের তুলনায় অনেক দ্রুত বাড়ছে বলে ধারণা পাওয়া যায়।

এআই শনাক্তকরণ শতভাগ নির্ভুল নয়

তবে গবেষণার ফলাফল ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার কথাও বলা হয়েছে। Open Pangram-সহ বর্তমানে ব্যবহৃত কোনো এআই-লেখা শনাক্তকরণ প্রযুক্তিই শতভাগ নির্ভুল নয়।

মানুষের লেখা কোনো কনটেন্টকে ভুলভাবে এআই-লিখিত হিসেবে শনাক্ত করা কিংবা এআই দিয়ে তৈরি লেখা শনাক্ত করতে ব্যর্থ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে কোনো নির্দিষ্ট ওয়েবপেজ সম্পর্কে শুধু এ ধরনের শনাক্তকরণ ব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়।

তবে বিপুলসংখ্যক ওয়েবপেজ একসঙ্গে বিশ্লেষণ করায় গবেষণাটি ইন্টারনেটে এআই-নির্ভর লেখার সামগ্রিক প্রবণতা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা দিচ্ছে।

লেখার ধরনেও পরিবর্তনের ইঙ্গিত

গবেষণায় শুধু এআই শনাক্তকরণ প্রযুক্তির ফল নয়, ওয়েবের লেখার ভাষাগত বৈশিষ্ট্যের পরিবর্তনও পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ওয়েব কনটেন্টে em dash, Oxford comma এবং ‘এটি X নয়, বরং Y’ ধরনের বাক্যগঠনের ব্যবহার বেড়েছে বলে গবেষকেরা দেখতে পেয়েছেন। এ ধরনের ভাষাশৈলী বিভিন্ন জেনারেটিভ এআই মডেলের লেখায় প্রায়ই দেখা যায়।

তবে এসব বৈশিষ্ট্যের কোনো একটিকে এককভাবে এআই দিয়ে লেখা শনাক্ত করার নির্ভরযোগ্য প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।

বটের লেখা পড়ছে বট—সামনে নতুন প্রশ্ন

পিউয়ের গবেষণাটি এমন সময়ে প্রকাশিত হলো, যখন ইন্টারনেটে মানুষের পাশাপাশি স্বয়ংক্রিয় বটের কার্যক্রমও দ্রুত বাড়ছে। সাম্প্রতিক আরেক বিশ্লেষণে ইন্টারনেট অবকাঠামো প্রতিষ্ঠান Cloudflare জানিয়েছে, তাদের পর্যবেক্ষণে বটের ওয়েব ট্রাফিক মানুষের ট্রাফিককে ছাড়িয়ে গেছে।

দুই প্রবণতা একসঙ্গে নতুন একটি বাস্তবতা সামনে আনছে—ইন্টারনেটে একদিকে এআই ও স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা বিপুল পরিমাণ কনটেন্ট তৈরি করছে, অন্যদিকে সেই কনটেন্টের উল্লেখযোগ্য অংশ আবার বট ও এআই সিস্টেমই সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করছে।

এর ফলে ভবিষ্যতে ওয়েবের তথ্যের মৌলিকতা, নির্ভরযোগ্যতা, সার্চ ফলাফলের মান এবং নতুন এআই মডেলের প্রশিক্ষণ ডেটার গুণগত মান নিয়েও নতুন প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।

বিশেষ করে এআই দিয়ে তৈরি তথ্য আবার ভবিষ্যতের এআই প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত হলে ভুল, পুনরাবৃত্ত বা নিম্নমানের তথ্য ক্রমাগত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি নিয়ে প্রযুক্তি খাতে ইতোমধ্যে আলোচনা চলছে।

পিউয়ের নতুন গবেষণা সেই বৃহত্তর পরিবর্তনের একটি পরিসংখ্যানভিত্তিক চিত্র তুলে ধরছে—মানুষের তৈরি ওয়েব থেকে ইন্টারনেট দ্রুত এমন এক পর্যায়ে যাচ্ছে, যেখানে অনলাইনে প্রকাশিত নতুন কনটেন্টের উল্লেখযোগ্য অংশ তৈরিতেই এআইয়ের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভূমিকা রয়েছে।

প্রান্তকাল/প্রযুক্তি ডেস্ক


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন