মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট ২০২৬

‘পার্সোনাল সুপারইন্টেলিজেন্স’ নিয়ে জাকারবার্গের স্বপ্ন, তবে বাড়ছে আস্থার সংকট

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ভবিষ্যৎ নিয়ে দীর্ঘ একটি ম্যানিফেস্টো প্রকাশ করেছেন মেটার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মার্ক জাকারবার্গ। প্রায় ৬ হাজার ৫০০ শব্দের ওই লেখায় তিনি ‘পার্সোনাল সুপারইন্টেলিজেন্স’ বা ব্যক্তিগত সুপারবুদ্ধিমত্তার সম্ভাবনা এবং এটি মানুষের জীবন ও সমাজে কী ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে, তা তুলে ধরেছেন।

সোমবার প্রকাশিত লেখাটিতে জাকারবার্গ মূলত এমন এক ভবিষ্যতের ধারণা দিয়েছেন, যেখানে প্রত্যেক মানুষ শক্তিশালী এআইয়ের ব্যক্তিগত সহকারী পাবেন। তার মতে, এ ধরনের প্রযুক্তি শিক্ষা, কর্মদক্ষতা, আইন, গবেষণা ও ব্যক্তিগত জীবনে মানুষের সক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে।

তবে জাকারবার্গের বক্তব্যকে শুধু ‘এআই-বিরোধী আশঙ্কার জবাব’ হিসেবে দেখছেন না প্রযুক্তি বিশ্লেষকেরা। বরং এটি এআইয়ের সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ নিয়ে তার ব্যক্তিগত আশাবাদ এবং মেটার পরিকল্পনার একটি বিস্তৃত ব্যাখ্যা হিসেবেই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। একই সঙ্গে লেখাটিতে প্রযুক্তির সম্ভাব্য নেতিবাচক দিক নিয়ে যথেষ্ট আলোচনা না থাকায় সমালোচনাও তৈরি হয়েছে।

‘সবার হাতে সুপারইন্টেলিজেন্স’

জাকারবার্গের যুক্তির কেন্দ্রবিন্দু হলো—শক্তিশালী এআই কেবল কিছু মানুষের হাতে সীমাবদ্ধ না থেকে ব্যাপকভাবে মানুষের কাছে পৌঁছানো উচিত। তার ধারণা, সমাজের বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের হাতে সমানভাবে শক্তিশালী প্রযুক্তি থাকলে পারস্পরিক ভারসাম্য তৈরি হবে এবং ইতিবাচক ফল পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে।

কিন্তু সমালোচকদের প্রশ্ন, প্রযুক্তি সবার কাছে পৌঁছে দিলেই কি তার নেতিবাচক ব্যবহার ঠেকানো সম্ভব হবে? অতীতে বিভিন্ন প্রযুক্তির ক্ষেত্রে দেখা গেছে, ভালো উদ্দেশ্যে তৈরি কোনো প্রযুক্তিও অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যবহার ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার জন্ম দিতে পারে।

এখানেই জাকারবার্গের বক্তব্য নিয়ে সংশয় তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যাপক প্রভাব ও এর নানা নেতিবাচক দিক নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্কের পর মেটার মতো প্রতিষ্ঠানের প্রধান যখন নতুন প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী বক্তব্য দেন, তখন মানুষের আস্থার বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

শিক্ষায় এআই: সম্ভাবনা ও ঝুঁকি দুটোই

জাকারবার্গ তার লেখায় শিক্ষাক্ষেত্রে এআইয়ের সম্ভাবনার একটি আশাবাদী চিত্র তুলে ধরেছেন। তার মতে, ভবিষ্যতে প্রত্যেক শিক্ষার্থী এমন একজন ব্যক্তিগত শিক্ষক বা কোচ পেতে পারে, যার বিভিন্ন বিষয়ে উচ্চতর জ্ঞান থাকবে এবং যে শিক্ষার্থীর প্রয়োজন অনুযায়ী শেখানোর পদ্ধতি ঠিক করতে পারবে।

এর ফলে বর্তমানে যেসব মানসম্মত শিক্ষা বা ব্যক্তিগত টিউটরিং কেবল সামর্থ্যবান পরিবারের সন্তানরা পেয়ে থাকে, তা আরও বেশি মানুষের নাগালে আসতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

তবে বাস্তব চিত্রে এআইয়ের ব্যবহার নিয়ে ভিন্ন অভিজ্ঞতাও দেখা যাচ্ছে। ChatGPT, Claude কিংবা Gemini-এর মতো চ্যাটবট ইতোমধ্যে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন বিষয়ে শেখাতে সহায়তা করছে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের একটি অংশ এসব প্রযুক্তি ব্যবহার করছে বাড়ির কাজ, অ্যাসাইনমেন্ট বা রচনা নিজেরা না লিখে এআই দিয়ে তৈরি করাতে।

ফলে এআই শিক্ষা সহজ করার পাশাপাশি শেখার প্রক্রিয়াকে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগও তৈরি করছে—এমন উদ্বেগ রয়েছে। এআই দিয়ে তৈরি লেখা শনাক্ত করার ক্ষেত্রেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এখনো পুরোপুরি নির্ভরযোগ্য সমাধান পায়নি।

আইনি ব্যবস্থায় এআইয়ের প্রভাব

আইন ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও জাকারবার্গ এআইয়ের সম্ভাব্য ইতিবাচক ভূমিকার কথা বলেছেন। তার যুক্তি, যদি একজন ব্যক্তির হাতে অত্যন্ত শক্তিশালী এআই আইনজীবী থাকে, তাহলে আদালতে তিনি অন্যদের তুলনায় বড় সুবিধা পেতে পারেন। কিন্তু একই প্রযুক্তি যদি সবার কাছে পৌঁছে যায়, তাহলে আইনি লড়াইয়ে দক্ষতা ও সম্পদের বৈষম্য কমতে পারে।

তবে এখানেও সম্ভাব্য ঝুঁকি রয়েছে। সহজলভ্য এআই আইনি পরামর্শ ও নথি তৈরির সুযোগ বাড়ালে আদালতে মামলার সংখ্যা বা অপ্রয়োজনীয় আইনি কার্যক্রমও বেড়ে যেতে পারে। ফলে প্রযুক্তি যেমন ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকার বাড়াতে পারে, তেমনি বিচারব্যবস্থার ওপর নতুন চাপও তৈরি করতে পারে।

সবার জন্য বিনামূল্যে বা সাশ্রয়ী এআই?

জাকারবার্গের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য হলো, মেটা ভবিষ্যতে বিলিয়ন মানুষের কাছে বিনামূল্যে বা তুলনামূলক কম খরচে এআই সেবা পৌঁছে দিতে চায়। যারা বেশি কম্পিউটিং ক্ষমতা ব্যবহার করতে চান, তাদের জন্য বাজারভিত্তিক মূল্য নির্ধারণের ব্যবস্থার কথাও তিনি উল্লেখ করেছেন।

ধারণাটির লক্ষ্য হলো শক্তিশালী এআইকে কেবল অর্থবান ব্যবহারকারীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে দেওয়া।

তবে প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের একটি প্রশ্ন হলো—কম্পিউটিংয়ের বাজারমূল্য যদি চাহিদার সঙ্গে ওঠানামা করে, তাহলে সাধারণ ব্যবহারকারীর জন্য সেবার খরচ কতটা পূর্বানুমানযোগ্য থাকবে? বিশেষ করে কাজ বা দৈনন্দিন প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত এআই সেবায় হঠাৎ মূল্যবৃদ্ধি ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

মূল প্রশ্ন আস্থার

জাকারবার্গের লেখাকে ঘিরে সবচেয়ে বড় বিতর্ক সম্ভবত প্রযুক্তির সক্ষমতা নয়, বরং আস্থা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব নিয়ে বিশ্বজুড়ে দীর্ঘদিন ধরে সমালোচনা রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম গণতন্ত্র, শিশুদের নিরাপত্তা ও সমাজে বিভাজনের ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলছে, তা নিয়েও ব্যাপক বিতর্ক চলছে।

এই প্রেক্ষাপটে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর শীর্ষ নির্বাহীরা যখন এআইয়ের সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলেন, তখন শুধু সম্ভাবনার কথা বললেই সাধারণ মানুষের উদ্বেগ দূর হচ্ছে না।

সমালোচকদের মতে, এআইয়ের সম্ভাব্য সুফলের পাশাপাশি এর অপব্যবহার, ভুল তথ্য, গোপনীয়তা, চাকরির বাজারে প্রভাব এবং অনাকাঙ্ক্ষিত সামাজিক পরিবর্তনের ঝুঁকিও স্পষ্টভাবে স্বীকার করা প্রয়োজন।

প্রযুক্তি খাতের অন্যান্য শীর্ষ নির্বাহীদের কেউ কেউ এআইয়ের সম্ভাবনা তুলে ধরার পাশাপাশি সম্ভাব্য ঝুঁকি এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েও জনসমক্ষে কথা বলেন। এতে প্রযুক্তি সম্পর্কে মানুষের আস্থা তৈরির সুযোগ তৈরি হয়।

শেষ পর্যন্ত এআইয়ের ভবিষ্যৎ শুধু কতটা শক্তিশালী প্রযুক্তি তৈরি করা যাবে, তার ওপর নির্ভর করবে না। বরং সেই প্রযুক্তি কতটা নিরাপদ, নিয়ন্ত্রিত এবং মানুষের আস্থার সঙ্গে ব্যবহার করা যায়—সেটিই হয়ে উঠতে পারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন