শুক্রবার, ২১ আগস্ট ২০২৬

৩৫ বছর পর প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন: ২৫৫ ভোটে বঙ্গভবনের পথে মির্জা ফখরুল

দীর্ঘ ৩৫ বছর পর প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ভোটের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। জাতীয় সংসদ সদস্যদের ভোটে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপির প্রবীণ নেতা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। দুই প্রার্থীর এই নির্বাচনে তিনি পেয়েছেন ২৫৫ ভোট। তার প্রতিদ্বন্দ্বী কর্নেল (অব.) অলি আহমদ পেয়েছেন ৮৮ ভোট।

বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) জাতীয় সংসদের অধিবেশন কক্ষে ভোটগ্রহণ ও গণনা শেষে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের নির্বাচনী কর্তা এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন ফল ঘোষণা করেন।

এই নির্বাচন শুধু নতুন রাষ্ট্রপ্রধান বেছে নেওয়ার আনুষ্ঠানিকতা ছিল না; প্রায় সাড়ে তিন দশক পর রাষ্ট্রপতি পদে একাধিক প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতিতে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হয়ে উঠেছে।

৩৪৯ ভোটারের মধ্যে ভোট দিলেন ৩৪৩ জন

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোটার ছিলেন জাতীয় সংসদের ৩৪৯ সদস্য। তাদের মধ্যে ৩৪৩ জন ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। ছয়জন সংসদ সদস্য ভোট দেননি। প্রদত্ত সব ভোটই বৈধ হয়।

গণনায় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পান ২৫৫ ভোট এবং অলি আহমদ পান ৮৮ ভোট। অর্থাৎ প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে ১৬৭ ভোট বেশি পেয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল।

সংসদে ক্ষমতাসীন বিএনপির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় ভোটের আগেই মির্জা ফখরুলের জয় অনেকটাই প্রত্যাশিত ছিল। তবে দুইজন বৈধ প্রার্থী থাকায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন অনুযায়ী ভোটগ্রহণের প্রয়োজন হয়।

মুখোমুখি ফখরুল ও অলি

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ক্ষমতাসীন বিএনপি ও সমমনা দলগুলোর প্রার্থী ছিলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্যের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ।

মির্জা ফখরুল নিজে সংসদ সদস্য হওয়ায় রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হওয়ার পাশাপাশি ভোটও দেন। অলি আহমদ সংসদ সদস্য না হওয়ায় ভোটার ছিলেন না।

যেভাবে হলো ভোট

বৃহস্পতিবার দুপুর ২টার পর জাতীয় সংসদের অধিবেশন কক্ষে ভোটগ্রহণ শুরু হয়। ভোটের আগে সংসদ সদস্যদের ভোট দেওয়ার নিয়ম বুঝিয়ে দেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন।

বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন না। সংবিধান অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।

এই নির্বাচনের ভোটও সাধারণ নির্বাচনের মতো গোপন ব্যালটে হয়নি। সংসদ সদস্যরা নির্ধারিত পদ্ধতিতে নিজেদের পছন্দের প্রার্থীর পক্ষে ভোট দেন।

প্রথম দিকে ভোট দেন রাষ্ট্রের শীর্ষ ব্যক্তিরা

ভোটগ্রহণের শুরুতেই রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ প্রথম দিকে ভোট দেন। এরপর ভারপ্রাপ্ত স্পিকার কায়সার কামাল ভোট দেন।

প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমানও ভোট দেন। তার সঙ্গে রাষ্ট্রপতি প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন।

বিরোধীদলীয় নেতাসহ অন্য সংসদ সদস্যরাও পর্যায়ক্রমে ভোট দেন।

১৯৯১ সালের পর আবার প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ভোট

এবারের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে এর প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ চরিত্র। ১৯৯১ সালের পর প্রায় ৩৫ বছর ধরে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে এমন ভোটাভুটির প্রয়োজন হয়নি।

১৯৯১ সালের ৮ অক্টোবর অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপির আবদুর রহমান বিশ্বাস এবং আওয়ামী লীগের বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। সেই নির্বাচনে আবদুর রহমান বিশ্বাস ১৭২ ভোট এবং বদরুল হায়দার চৌধুরী ৯২ ভোট পেয়েছিলেন।

এরপর দীর্ঘ সময় রাষ্ট্রপতি পদে একক প্রার্থী থাকায় সংসদে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ভোটের প্রয়োজন পড়েনি। ফলে ২০২৬ সালের নির্বাচন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ইতিহাসে নতুন একটি অধ্যায় যোগ করল।

সংখ্যার সমীকরণ ছিল ফখরুলের পক্ষে

ভোটের আগে থেকেই সংসদের দলীয় শক্তির হিসাব মির্জা ফখরুলের পক্ষে ছিল। ক্ষমতাসীন বিএনপির সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় দলটির মনোনীত প্রার্থীর জয় প্রত্যাশিত ছিল।

তারপরও বিরোধী জোট প্রার্থী দেওয়ায় নির্বাচনটি ভোট পর্যন্ত গড়ায়। ফলে সংসদ সদস্যদের আনুষ্ঠানিক ভোটের মাধ্যমেই রাষ্ট্রপতি নির্ধারিত হয়।

শেষ পর্যন্ত ২৫৫-৮৮ ভোটের ব্যবধান সংসদের রাজনৈতিক শক্তির সমীকরণেরই প্রতিফলন ঘটিয়েছে।

দীর্ঘ রাজনৈতিক পথ পেরিয়ে বঙ্গভবনে

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দীর্ঘ সময় বিএনপির অন্যতম শীর্ষ নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বিরোধী দলের রাজনীতি, আন্দোলন-সংগ্রাম ও দল পরিচালনার দীর্ঘ অভিজ্ঞতার পর এবার তিনি দেশের সাংবিধানিক রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন।

নির্বাচনের আগে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মির্জা ফখরুল একটি সুখী, সমৃদ্ধ ও কল্যাণমুখী বাংলাদেশ দেখার প্রত্যাশার কথা জানান। দীর্ঘদিনের দলীয় রাজনৈতিক জীবন থেকে নতুন সাংবিধানিক ভূমিকায় যাওয়ার মুহূর্তে আবেগের কথাও প্রকাশ করেন তিনি।

ফল ঘোষণার পর নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতিকে অভিনন্দন জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ রাজনৈতিক নেতারা।

শুক্রবার শপথ

নির্বাচনের মাধ্যমে মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলেও দায়িত্ব গ্রহণের জন্য তাকে শপথ নিতে হবে। বঙ্গভবনে শুক্রবার (২১ আগস্ট) সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় নতুন রাষ্ট্রপতির শপথ অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। (Ja

শপথ গ্রহণের পর মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন।

নতুন রাষ্ট্রপতির সামনে সাংবিধানিক দায়িত্ব

বাংলাদেশের সংসদীয় ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের প্রধান। সংবিধান রাষ্ট্রপতিকে রাষ্ট্রের ঐক্য ও ধারাবাহিকতার প্রতীকী অবস্থান দিয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করলেও সরকার গঠন, বিচার বিভাগসহ বিভিন্ন সাংবিধানিক পদে নিয়োগ এবং বিশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

দীর্ঘদিন সক্রিয় দলীয় রাজনীতির সামনের সারিতে থাকা মির্জা ফখরুলের জন্য তাই রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব হবে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের সাংবিধানিক ভূমিকা। দলীয় রাজনীতির পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে রাষ্ট্রের অভিভাবকসুলভ ও নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রাখা তার নতুন দায়িত্বের অন্যতম বড় প্রত্যাশা হয়ে থাকবে।

৩৫ বছর পর প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন, সংসদে প্রকাশ্য ভোট এবং দুই প্রবীণ রাজনীতিকের প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত এবারের নির্বাচন তাই শুধু একজন নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ঘটনা নয়—বাংলাদেশের সংসদীয় ও সাংবিধানিক রাজনীতিতেও এটি একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন