শুক্রবার, ২১ আগস্ট ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণ প্রথমবার ৪০ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়াল

পাঁচ মাসেই বেড়েছে এক ট্রিলিয়ন ডলার; সুদ, প্রতিরক্ষা ও সামাজিক কর্মসূচির ব্যয়ে বাড়ছে চাপ

ইতিহাসে প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণ ৪০ ট্রিলিয়ন বা ৪০ লাখ কোটি ডলারের সীমা অতিক্রম করেছে। বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতির ক্রমবর্ধমান বাজেট ঘাটতি, প্রতিরক্ষা ব্যয়, সামাজিক নিরাপত্তা ও মেডিকেয়ার কর্মসূচি এবং বিপুল ঋণের সুদ পরিশোধের চাপের মধ্যেই নতুন এ রেকর্ড তৈরি হলো।

যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগের হিসাবে, দেশটির মোট জাতীয় ঋণ ৪০ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। এই মাইলফলক এমন সময়ে এলো, যখন ওয়াশিংটনের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সক্ষমতা ও ঋণের স্থায়িত্ব নিয়ে অর্থনীতিবিদ এবং বাজেট বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ বাড়ছে।

ঋণ বৃদ্ধির গতিও নজিরবিহীন। চলতি বছরের মার্চে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণ ৩৯ ট্রিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছিল। তার মাত্র পাঁচ মাস আগে, গত বছরের অক্টোবরে ঋণ ৩৮ ট্রিলিয়ন ডলারের ঘর পার হয়। অর্থাৎ মাত্র ১০ মাসের ব্যবধানে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণে যুক্ত হয়েছে প্রায় দুই ট্রিলিয়ন ডলার।

কেন এত দ্রুত বাড়ছে ঋণ

যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল সরকার দীর্ঘদিন ধরেই কর ও অন্যান্য উৎস থেকে যে পরিমাণ রাজস্ব সংগ্রহ করছে, তার চেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় করছে। প্রতি বছরের এই ঘাটতি মেটাতে সরকারকে নতুন করে ঋণ নিতে হচ্ছে। ফলে সময়ের সঙ্গে মোট জাতীয় ঋণের পরিমাণ বাড়ছে।

বর্তমানে ফেডারেল ব্যয়ের বড় অংশ যাচ্ছে সামাজিক নিরাপত্তা, মেডিকেয়ার, প্রতিরক্ষা এবং বিদ্যমান ঋণের সুদ পরিশোধে।

বিশেষ করে ক্রমবর্ধমান ঋণের সুদ এখন মার্কিন সরকারের জন্য অন্যতম বড় ব্যয়ের খাতে পরিণত হয়েছে। ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধির পাশাপাশি তুলনামূলক উচ্চ সুদহার সরকারের নতুন ঋণ গ্রহণ এবং পুরোনো ঋণের অর্থায়ন আরও ব্যয়বহুল করে তুলছে।

চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসেই যুক্তরাষ্ট্রের বাজেট ঘাটতি প্রায় ১ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। শুধু জুলাইয়ে ঘাটতি ছিল ৪৩২ বিলিয়ন ডলার।

ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে বড় আর্থিক চ্যালেঞ্জ

৪০ ট্রিলিয়ন ডলারের ঋণের মাইলফলক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের জন্যও বড় আর্থিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে এসেছে।

একদিকে প্রতিরক্ষা খাতে বিপুল ব্যয় বজায় রাখা হচ্ছে, অন্যদিকে জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে করনীতি ও সরকারি ব্যয়ের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ভবিষ্যৎ বাজেট ঘাটতির ওপর কী প্রভাব ফেলবে, তা নিয়েও বিতর্ক চলছে।

হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র কুশ দেশাইয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, ট্রাম্প প্রশাসন সরকারি ব্যয়ের অপচয়, প্রতারণা ও অনিয়ম কমানোর পাশাপাশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার চেষ্টা করছে। প্রশাসনের লক্ষ্য অর্থনীতির আকারের তুলনায় ঋণের অনুপাতকে একটি টেকসই পথে নিয়ে আসা।

তবে অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন, শুধু প্রবৃদ্ধি বাড়ানো বা অপচয় কমানোর মাধ্যমে বর্তমান ঋণ পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হতে পারে।

সাধারণ মানুষের ওপর কী প্রভাব

জাতীয় ঋণের অঙ্ক অনেক বড় হলেও এর প্রভাব শুধু সরকারের হিসাবের খাতায় সীমাবদ্ধ থাকে না। দীর্ঘমেয়াদে অতিরিক্ত সরকারি ঋণ অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের ব্যয় বাড়াতে পারে।

সরকারকে বিপুল পরিমাণ অর্থ ঋণ নিতে হলে বাজারে ঋণের চাহিদা বাড়তে পারে। এর সঙ্গে উচ্চ সুদহার যুক্ত হলে বাড়ি কেনার মর্টগেজ, গাড়ির ঋণসহ বিভিন্ন ধরনের ঋণের খরচ বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।

একই সঙ্গে সরকারের সুদ পরিশোধে বেশি অর্থ ব্যয় হলে অবকাঠামো, শিক্ষা কিংবা অন্যান্য খাতে বিনিয়োগের সুযোগ সংকুচিত হতে পারে।

ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য ঋণ গ্রহণ ব্যয়বহুল হয়ে পড়লে নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে সতর্ক করছেন অর্থনীতিবিদরা।

ঋণ বাড়িয়েছে একাধিক প্রশাসন

বর্তমান ঋণ পরিস্থিতির জন্য কোনো একক প্রেসিডেন্ট বা প্রশাসনকে দায়ী করছেন না অর্থনীতিবিদদের বড় একটি অংশ। কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারগুলো রাজস্বের তুলনায় বেশি ব্যয় করায় ঋণ ক্রমাগত বেড়েছে।

বিশেষ করে কোভিড-১৯ মহামারির সময় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বড় অংশ স্থবির হয়ে পড়ায় নাগরিক ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে সহায়তা এবং অর্থনীতিকে সচল রাখতে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদ ও পরবর্তী জো বাইডেন প্রশাসন বিপুল অর্থ ব্যয় করে।

এর একটি বড় অংশ ঋণের মাধ্যমে অর্থায়ন করা হয়। পরবর্তী সময়েও বাজেট ঘাটতি উচ্চ পর্যায়ে থাকায় জাতীয় ঋণ দ্রুত বাড়তে থাকে।

ঋণের সুদই এখন বড় উদ্বেগ

৪০ ট্রিলিয়ন ডলারের ঋণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের একটি হলো সুদ পরিশোধের ব্যয়।

ঋণের পরিমাণ যত বাড়ছে, সরকারের বার্ষিক সুদ ব্যয়ও তত বাড়ছে। ফলে নতুন রাজস্বের একটি বড় অংশ শুধু অতীতে নেওয়া ঋণের সুদ মেটাতেই ব্যয় করতে হচ্ছে।

এ পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে ভবিষ্যতে সরকারকে কর বৃদ্ধি, ব্যয় হ্রাস অথবা আরও বেশি ঋণ গ্রহণের মতো কঠিন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হতে হতে পারে।

পিটার জি পিটারসন ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী মাইকেল এ পিটারসন সতর্ক করে বলেছেন, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবনযাত্রার মান উন্নত রাখতে যুক্তরাষ্ট্রকে আরও সাশ্রয়ী ও দীর্ঘমেয়াদে টেকসই আর্থিক পথে নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ এখনই প্রয়োজন।

‘বর্তমান গতিপথ টেকসই নয়’

বাইপার্টিজান পলিসি সেন্টারের প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী মার্গারেট স্পেলিংসও যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান আর্থিক গতিপথ নিয়ে সতর্ক করেছেন।

তার মতে, ফেডারেল ঋণের চাপ ইতোমধ্যে জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়াচ্ছে এবং অন্যান্য সরকারি ব্যয় ও বিনিয়োগের সুযোগ সংকুচিত করছে। দীর্ঘমেয়াদে এটি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ও নাগরিকদের সমৃদ্ধির জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

অর্থনৈতিক মন্দা, বড় ধরনের বৈশ্বিক সংঘাত কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে শ্রমবাজারে ব্যাপক পরিবর্তনের মতো অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি দেখা দিলে ঋণের বর্তমান চাপ আরও গুরুতর সংকটে রূপ নিতে পারে বলেও সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

সামনে ৪১ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলারের ঋণসীমা

যুক্তরাষ্ট্রে কেন্দ্রীয় সরকারের ঋণ গ্রহণের একটি আইনগত সর্বোচ্চ সীমা রয়েছে, যা ‘ডেট লিমিট’ বা ঋণসীমা নামে পরিচিত। কংগ্রেস প্রয়োজন অনুযায়ী এই সীমা বাড়াতে, স্থগিত করতে বা পরিবর্তন করতে পারে।

বাইপার্টিজান পলিসি সেন্টারের হিসাবে, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০২৭ সালের শীতের শেষ ভাগ থেকে গ্রীষ্মের মাঝামাঝি কোনো এক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ৪১ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলারের ঋণসীমায় পৌঁছে যেতে পারে।

সেক্ষেত্রে নতুন করে ঋণ নেওয়ার সক্ষমতা ধরে রাখতে কংগ্রেসকে আবার ঋণসীমা বাড়ানো বা স্থগিত করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

সামনে কঠিন সমীকরণ

৪০ ট্রিলিয়ন ডলারের সীমা অতিক্রম যুক্তরাষ্ট্রের জন্য শুধু একটি পরিসংখ্যানগত রেকর্ড নয়; এটি দেশটির দীর্ঘমেয়াদি রাজস্ব ও ব্যয়নীতির সামনে ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জের প্রতিফলন।

সামাজিক নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যসেবা অব্যাহত রাখা, প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বজায় রাখা, করের বোঝা নিয়ন্ত্রণ এবং একই সঙ্গে ঋণ ও সুদের ব্যয় কমানো—এই চারটি লক্ষ্য একসঙ্গে অর্জন করাই এখন ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকদের সামনে বড় পরীক্ষা।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, কার্যকর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া না হলে পরবর্তী মাইলফলকগুলো আরও দ্রুত আসতে পারে এবং ঋণের বোঝা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কঠিন আর্থিক বাস্তবতা তৈরি করতে পারে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন