শুক্রবার, ২১ আগস্ট ২০২৬

হরমুজে যুক্তরাষ্ট্রের ‘গোপন নৌপথ’, দিনে এক কোটি ব্যারেল তেল পরিবহনের দাবি

ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাত ও হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ে তীব্র অনিশ্চয়তার মধ্যে ওমানের উপকূলঘেঁষা একটি নৌপথ ব্যবহার করে তেলবাহী জাহাজ চলাচলে গোপনে সমন্বয় ও নিরাপত্তা সহায়তা দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, এই ব্যবস্থার মাধ্যমে বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় এক কোটি ব্যারেল তেল পারস্য উপসাগর থেকে বিশ্ববাজারে পাঠানো হচ্ছে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম Axios বুধবার (১৯ আগস্ট) দুই মার্কিন কর্মকর্তার বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েক সপ্তাহ ধরে বিশেষ এই কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে এবং প্রতি রাতে প্রায় ১৫ থেকে ২০টি ট্যাংকার হরমুজ প্রণালির দক্ষিণাংশে ওমানের কাছাকাছি নৌপথ ব্যবহার করছে।

তবে মার্কিন কর্মকর্তাদের এই হিসাব স্বাধীনভাবে পুরোপুরি যাচাই করা সম্ভব হয়নি। সাম্প্রতিক জাহাজ-ট্র্যাকিং তথ্যেও হরমুজে দৃশ্যমান জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক কম দেখা যাচ্ছে।

শুধু তেলবাহী জাহাজ নয়, খালি ট্যাংকারও পাচ্ছে সহায়তা

Axios-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন সামরিক বাহিনীর কার্যক্রম কেবল তেলবোঝাই ট্যাংকারকে হরমুজ পার করে দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আরব সাগর থেকে খালি ট্যাংকারগুলোকে নিরাপদে পারস্য উপসাগরে প্রবেশেও সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।

এসব ট্যাংকার উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে অপরিশোধিত তেল সংগ্রহের পর আবার হরমুজের দক্ষিণাঞ্চলীয় পথ ব্যবহার করে আরব সাগরের দিকে যাচ্ছে।

মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি অনুযায়ী, এই পথে বর্তমানে দৈনিক প্রায় এক কোটি ব্যারেল তেল পরিবহন সম্ভব হচ্ছে। তবে যুদ্ধের আগে হরমুজ দিয়ে যে পরিমাণ জ্বালানি পরিবহন হতো, বর্তমান প্রবাহ তার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। হরমুজ ঐতিহাসিকভাবে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথগুলোর একটি।

যুদ্ধবিমান দিয়ে আকাশ থেকেও নিরাপত্তা

গোপন কার্যক্রমের সঙ্গে পরিচিত এক মার্কিন কর্মকর্তা Axios-কে জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র প্রায় দুই মাস ধরে প্রণালির দক্ষিণাঞ্চলের এই পথের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে।

জাহাজগুলোকে সম্ভাব্য ড্রোন ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা থেকে রক্ষায় মার্কিন সামরিক বিমানও ব্যবহার করা হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের সাম্প্রতিক দুই সপ্তাহব্যাপী সামরিক অভিযানে ইরানের রাডার ও সামুদ্রিক নজরদারি সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর দক্ষিণের এই নৌপথে জাহাজ চলাচল সহজ হয়েছে।

ইরানের নজরদারি দুর্বল হওয়ার দাবি যুক্তরাষ্ট্রের

মার্কিন কর্মকর্তাদের ভাষ্য, ইরানের সামুদ্রিক নজরদারি সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় কোন জাহাজ ঠিক কোন পথ দিয়ে চলাচল করছে, তা শনাক্ত করার ক্ষেত্রে তেহরানের সক্ষমতা কমেছে।

তাদের দাবি, এ কারণে ইরান সম্ভাব্য জাহাজ চলাচলের এলাকা লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করছে। কয়েকটি জাহাজ হামলার শিকার হলেও একাধিক হামলা মার্কিন বাহিনী প্রতিহত করেছে বলেও দাবি করা হয়েছে।

এসব সামরিক দাবির সবগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ইরানের পক্ষ থেকেও Axios-এর প্রতিবেদনে উত্থাপিত নির্দিষ্ট দাবিগুলোর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

ট্র্যাকিং তথ্যে ভিন্ন চিত্র

মার্কিন কর্মকর্তারা বিপুল পরিমাণ তেল পরিবহনের কথা বললেও প্রকাশ্য জাহাজ-ট্র্যাকিং তথ্যে হরমুজে চলাচল এখনো সীমিত দেখা যাচ্ছে।

Reuters-এর প্রতিবেদনে Kpler-এর তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ১৯ আগস্ট প্রকাশিত হিসাবে মঙ্গলবার প্রণালিটি দিয়ে ছয়টি পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল করেছে। আগের দিন এ সংখ্যা ছিল নয়টি। সাম্প্রতিক ১০ দিনের দৈনিক গড় ছিল প্রায় ১১টি জাহাজ।

তবে জাহাজের স্বয়ংক্রিয় শনাক্তকরণ ব্যবস্থা বা AIS transponder বন্ধ রেখে চলাচল করা জাহাজ সাধারণ ট্র্যাকিং ব্যবস্থায় ধরা না-ও পড়তে পারে। ফলে প্রকাশ্য ট্র্যাকিংয়ের সংখ্যা দিয়ে প্রকৃত মোট চলাচলের পূর্ণ চিত্র পাওয়া কঠিন।

Lloyd’s List Intelligence-এর ১৯ আগস্টের হিসাবেও দেখা যায়, ১০ থেকে ১৬ আগস্ট পর্যন্ত হরমুজ দিয়ে ৭৩টি জাহাজ চলাচল করেছে, যা আগের সপ্তাহের ৯১টির তুলনায় কম। সংস্থাটি বলেছে, পরবর্তীতে শনাক্ত হওয়া ‘dark transit’ যুক্ত হলে সংখ্যাটি বাড়তে পারে।

বিশ্ব জ্বালানি বাজারের জন্য কেন এত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ

পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করা সরু হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। যুদ্ধের আগে বৈশ্বিক অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে যেত।

ফলে হরমুজে দীর্ঘমেয়াদি অচলাবস্থা তৈরি হলে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ ও মূল্য—দুটির ওপরই বড় ধরনের প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এরই মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা ও হরমুজ দিয়ে তেল পরিবহন নিয়ে অনিশ্চয়তার প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়েছে। ১৯ আগস্ট Brent crude-এর দাম ব্যারেলপ্রতি ৯১ দশমিক ৬২ ডলারে এবং মার্কিন WTI ৮৫ দশমিক ৮৩ ডলারে লেনদেন শেষ করে।

সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কথিত গোপন নৌপথটি হরমুজে জ্বালানি সরবরাহ সচল রাখার গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও অর্থনৈতিক কৌশল হিসেবে সামনে এলেও, প্রতিদিন ঠিক কত তেল এই পথে যাচ্ছে এবং প্রণালিটির ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ কার হাতে—তা নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য অব্যাহত রয়েছে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন