শুক্রবার, ২১ আগস্ট ২০২৬

প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে মাকে হত্যার অভিযোগ, পিবিআইয়ের তদন্তে মামলার বাদীই আসামি

কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জে ৬৫ বছর বয়সী হালিমা হত্যা মামলার তদন্তে নাটকীয় মোড় নেওয়ার দাবি করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। জমি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধের জেরে প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে সহযোগীদের দিয়ে নিজের মাকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিলেন মামলার বাদী ও নিহতের মেয়ে চাম্পা (৪৮)—এমন তথ্য তদন্তে পাওয়ার কথা জানিয়েছে সংস্থাটি।

পিবিআই জানিয়েছে, চাম্পাকে গ্রেপ্তারের পর তিনি আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। মামলায় অন্য কারও সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

পতিত জমিতে মাটিতে পোঁতা ছিল মরদেহ

পিবিআই কিশোরগঞ্জ জেলার সংবাদ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ১৪ মার্চ করিমগঞ্জ উপজেলার একটি পতিত জমি থেকে হালিমার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। মরদেহের মাথার অংশ মাটিতে পুঁতে রাখা অবস্থায় ছিল। তার নাক-মুখে রক্তাক্ত জখম এবং গলায় সাদা রশি পেঁচানো ছিল বলে জানিয়েছে তদন্ত সংস্থা।

মরদেহ উদ্ধারের পর হালিমার মেয়ে চাম্পা বাদী হয়ে পাঁচজনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাত আরও চার থেকে পাঁচজনকে আসামি করে করিমগঞ্জ থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় দণ্ডবিধির ৩০২, ২০১ ও ৩৪ ধারা যুক্ত করা হয়।

মামলা হওয়ার দুই দিন পর, ১৭ মার্চ, পিবিআই কিশোরগঞ্জ জেলা স্ব-উদ্যোগে তদন্তভার গ্রহণ করে। বর্তমানে পিবিআইয়ের পুলিশ পরিদর্শক আশরাফুল আলম মামলাটি তদন্ত করছেন।

তিন বছরের বেশি সময় পর বাদীর ওপর সন্দেহ

পিবিআই জানায়, দীর্ঘ তদন্তে সাক্ষ্য ও অন্যান্য তথ্য-প্রমাণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তদন্ত কর্মকর্তার সন্দেহের কেন্দ্রে আসেন মামলার বাদী চাম্পা।

এর ধারাবাহিকতায় গত ১৮ আগস্ট কিশোরগঞ্জ সদর থানা এলাকা থেকে তাকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়। পরে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

পিবিআইয়ের দাবি, জিজ্ঞাসাবাদে চাম্পা জমি নিয়ে বিরোধের কারণে প্রতিপক্ষের ওপর প্রতিশোধ নিতে সহযোগীদের মাধ্যমে নিজের মাকে হত্যার পরিকল্পনার কথা জানান।

একই দিন তিনি আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন বলে জানিয়েছে পিবিআই।

সাড়ে তিন শতাংশ জমি ঘিরে দীর্ঘদিনের বিরোধ

পিবিআইয়ের তদন্ত ও চাম্পার জবানবন্দির বরাতে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, প্রায় ৩০ বছর আগে হালিমা তার প্রতিবেশী বিল্লালের কাছ থেকে সাড়ে তিন শতাংশ বাড়ির জায়গা কিনেছিলেন বলে দাবি করতেন। তবে ওই জমি কেনার কোনো দলিল ছিল না বলে পিবিআই জানিয়েছে।

এই জমিকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। বিরোধের জেরে উভয় পক্ষের মধ্যে মারামারি এবং ধর্ষণের অভিযোগসহ একাধিক পাল্টাপাল্টি মামলা হয়েছিল বলেও তদন্তে উঠে এসেছে।

হত্যাকাণ্ডের প্রায় ১৫ দিন আগে একটি মারামারির ঘটনায় হালিমা আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন।

‘সমঝোতার কথা বলে বাড়ি থেকে ডেকে নেওয়া হয়’

পিবিআইয়ের দাবি অনুযায়ী, চলমান বিরোধে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়ায় তাদের ফাঁসানোর পরিকল্পনা করেন চাম্পা। এ উদ্দেশ্যে নিজের মাকে হত্যার জন্য সহযোগীদের সঙ্গে পরিকল্পনা করেন তিনি।

তদন্ত সংস্থাটির ভাষ্য, ২০২৩ সালের ১৩ মার্চ রাত আনুমানিক ১১টার দিকে সমঝোতার কথা বলে চাম্পার দুই সহযোগী হালিমাকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে যান। পরে তাকে হত্যা করে মরদেহ পতিত জমিতে ফেলে রাখা হয়।

পরদিন মরদেহ উদ্ধারের পর পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী চাম্পা নিজেই বাদী হয়ে প্রতিবেশী বিল্লালসহ পাঁচজনের নাম উল্লেখ করে হত্যা মামলা করেন—এমনটাই দাবি পিবিআইয়ের।

মামলায় আরও কেউ জড়িত কি না তদন্ত

পিবিআই জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে আর কারা জড়িত ছিলেন, তা শনাক্ত করতে তদন্ত চলছে। চাম্পার জবানবন্দিতে উঠে আসা তথ্যের পাশাপাশি অন্যান্য সাক্ষ্য ও প্রমাণও যাচাই করছেন তদন্ত কর্মকর্তারা।

তবে চাম্পার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ এবং তার কথিত সম্পৃক্ততার বিষয়টি বিচারাধীন। আদালতের চূড়ান্ত রায় না হওয়া পর্যন্ত তাকে আইনগতভাবে দোষী বলা যাবে না।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন