শুক্রবার, ২১ আগস্ট ২০২৬

সামিটের প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা কর ফাঁকির অভিযোগ, ৭ পরিচালকের বিরুদ্ধে মামলার প্রস্তুতি

দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের অন্যতম বড় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান সামিট গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা কর ফাঁকির অভিযোগ উঠেছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) অনুসন্ধানে এ-সংক্রান্ত তথ্য পাওয়ার দাবি করা হয়েছে। করসংক্রান্ত বিরোধের মধ্যেই সামিট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আজিজ খানসহ সাত পরিচালকের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন এনবিআরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

সম্ভাব্য মামলায় যাদের অভিযুক্ত করা হতে পারে তারা হলেন—মোহাম্মদ আজিজ খান, আঞ্জুমান আজিজ খান, আদিবা আজিজ খান, মোহাম্মদ ফয়সাল করিম খান, মোহাম্মদ লতিফ খান, মোহাম্মদ ফরিদ খান ও জাফর উমেদ খান।

তবে সামিট গ্রুপ কর ফাঁকির অভিযোগ অস্বীকার করেছে। প্রতিষ্ঠানটির বক্তব্য, তারা দেশের প্রচলিত আইন ও করবিধি মেনেই কর পরিশোধ করে আসছে। এনবিআরের সঙ্গে করসংক্রান্ত বিরোধের বিষয়গুলো আদালত ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নিষ্পত্তির চেষ্টা করা হচ্ছে।

দুই খাতে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার দাবি

এনবিআর-সংশ্লিষ্ট নথির বরাতে প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়েছে, সামিটের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের লভ্যাংশ বা ডিভিডেন্ড দেওয়ার ক্ষেত্রে উৎসে কর এবং কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কর নথি পুনঃউন্মোচনের পর পাওয়া দাবিসহ মোট অঙ্ক প্রায় দুই হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে।

ডিভিডেন্ডের ওপর উৎসে কর বাবদ সাতটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মোট প্রায় ৯৬৩ কোটি টাকা কর ফাঁকির অভিযোগ রয়েছে।

প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সামিট পাওয়ার লিমিটেডের বিরুদ্ধে সাত বছরে ৩৮৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা, সামিট গাজীপুর-২ লিমিটেডের বিরুদ্ধে তিন বছরে ১৭৬ কোটি ৫৭ লাখ টাকা, সামিট বরিশাল পাওয়ার লিমিটেডের বিরুদ্ধে চার বছরে ৫৬ কোটি ২৬ লাখ টাকা এবং সামিট মেঘনাঘাট পাওয়ার লিমিটেডের বিরুদ্ধে ছয় বছরে ৯২ কোটি ৮০ লাখ টাকা কর ফাঁকির অভিযোগ করা হয়েছে।

এ ছাড়া সামিট নারায়ণগঞ্জ পাওয়ার ইউনিট-২-এর বিরুদ্ধে তিন বছরে ২০ কোটি ৯ লাখ টাকা, সামিট এলএনজি টার্মিনাল প্রাইভেট লিমিটেডের বিরুদ্ধে তিন বছরে ১০০ কোটি ৬০ লাখ টাকা এবং সামিট বিবিয়ানা পাওয়ার লিমিটেডের বিরুদ্ধে ছয় বছরে ১২৯ কোটি ৮৯ লাখ টাকা কর ফাঁকির অভিযোগ রয়েছে।

আরও তিন প্রতিষ্ঠানে ১ হাজার ১৯ কোটি টাকার বেশি দাবি

ডিভিডেন্ড-সংক্রান্ত করের পাশাপাশি সামিট গ্রুপের আরও তিন প্রতিষ্ঠানের কর নথি পুনরায় পরীক্ষা করেছে এনবিআর। আয় গোপনসহ বিভিন্ন অভিযোগে এসব নথি পুনঃউন্মোচন করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

এনবিআরের হিসাবে, সামিট মেঘনাঘাট পাওয়ার লিমিটেডের চার বছরের হিসাবে ৭৬০ কোটি ১৮ লাখ টাকা, সামিট বিবিয়ানা পাওয়ার লিমিটেডের পাঁচ বছরের হিসাবে ২৫১ কোটি ৯৫ লাখ টাকা এবং সামিট বরিশাল পাওয়ার লিমিটেডের নয় বছরের হিসাবে ৭ কোটি ৫৭ লাখ টাকা করের দাবি উঠেছে।

এই তিন প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে মোট অঙ্ক দাঁড়ায় ১ হাজার ১৯ কোটি ৬৯ লাখ টাকা

ডিভিডেন্ডের ওপর উৎসে করের ৯৬৩ কোটি টাকার সঙ্গে এই অঙ্ক যোগ করলে এনবিআরের দাবির পরিমাণ প্রায় দুই হাজার কোটি টাকায় পৌঁছায়।

বিরোধের কেন্দ্রে ডিভিডেন্ডের উৎসে কর

সামিট ও এনবিআরের বিরোধের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান থেকে অন্য কোম্পানিতে দেওয়া ডিভিডেন্ডের ওপর উৎসে কর প্রযোজ্য হবে কি না।

এনবিআরের দাবি, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে একটি কোম্পানি অন্য কোম্পানিকে ডিভিডেন্ড দিলে উৎসে কর কেটে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

অন্যদিকে সামিটের অবস্থান হচ্ছে, বিদ্যুৎ খাতের সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর আয় করমুক্ত সুবিধার আওতায় থাকায় ওই ডিভিডেন্ডের ক্ষেত্রে এনবিআরের দাবি করা উৎসে কর প্রযোজ্য নয়।

এই আইনি ব্যাখ্যার পার্থক্যই বিরোধের একটি বড় অংশ।

আগে এনবিআরের ব্যাখ্যা ছিল ভিন্ন

প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ডিভিডেন্ডের ওপর উৎসে করের বিষয়টি প্রথম উল্লেখযোগ্যভাবে সামনে আসে ২০২৩ সালে। সে সময় এনবিআরের একটি কর অঞ্চলের কর্মকর্তা সামিট পাওয়ার থেকে সামিট করপোরেশনে দেওয়া ডিভিডেন্ডে উৎসে কর প্রযোজ্য বলে মত দিয়েছিলেন।

পরবর্তী সময়ে এনবিআরের পক্ষ থেকে আইনের ব্যাখ্যা দিয়ে ওই ডিভিডেন্ডে উৎসে কর প্রযোজ্য হবে না বলে জানানো হয়েছিল। ফলে সে সময় বিষয়টি আর এগোয়নি।

পরবর্তীতে নতুন করে অনুসন্ধান শুরু হলে এনবিআরের অবস্থান পরিবর্তন হয় এবং ডিভিডেন্ডের ওপর উৎসে কর প্রযোজ্য বলে দাবি করা হয়।

ফলে বিষয়টি শুধু করের পরিমাণ নিয়ে বিরোধ নয়; সংশ্লিষ্ট আইনের প্রয়োগ ও ব্যাখ্যাও আদালতের বিবেচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।

উচ্চ আদালতে ২০ রিট

এনবিআরের কর দাবি ও বিভিন্ন সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে গত দুই বছরে উচ্চ আদালতে ২০টি রিট করেছে সামিটের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো।

প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এর মধ্যে সাতটি রিটে আয়কর আইনের ১৪৩(৫) ধারার অধীনে নেওয়া পদক্ষেপ বা জরিমানার বিষয় এবং বাকি ১৩টিতে ২১২ ধারার অধীনে কর নথি পুনঃউন্মোচনের সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে।

এসব বিরোধের উল্লেখযোগ্য অংশ এখনো বিচারাধীন।

আইন অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের এনবিআরের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আদালতের শরণাপন্ন হওয়ার অধিকার রয়েছে। ফলে রিট দায়েরের বিষয়টি নিজে কোনো অপরাধ বা কর ফাঁকির প্রমাণ নয়।

এবার ফৌজদারি মামলার প্রস্তুতি

এনবিআর-সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়েছে, কর আদায়ের প্রশাসনিক ও বিচারিক প্রক্রিয়ার পাশাপাশি এবার সাত পরিচালকের বিরুদ্ধে ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।

করসংক্রান্ত নথি জাল করা, ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা তথ্য দেওয়া বা প্রতারণার মাধ্যমে কর ফাঁকির মতো অভিযোগ প্রমাণের মতো উপাদান পাওয়া গেলে আয়কর আইনের সংশ্লিষ্ট বিধানের অধীনে ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

তবে সামিটের সাত পরিচালকের বিরুদ্ধে এখনো আদালতে অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। এমনকি প্রস্তুতির কথা বলা হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত মামলার চূড়ান্ত ফল বা বিচারিক সিদ্ধান্ত হয়নি।

সামিটের বক্তব্য—আইন মেনেই কর দেওয়া হয়েছে

কর ফাঁকির অভিযোগের বিপরীতে সামিট করপোরেশনের জনসংযোগ বিভাগের জেনারেল ম্যানেজার মোহসেনা হাসানের বক্তব্যও প্রকাশিত হয়েছে।

সামিটের দাবি, প্রতিষ্ঠানটি সব সময় দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী কর পরিশোধ করে আসছে। করপোরেট জবাবদিহি ও আর্থিক হিসাব পরিচালনায় আন্তর্জাতিক মানের পেশাদার প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করা হয়েছে বলেও জানিয়েছে তারা।

সামিটের ভাষ্য, বাংলাদেশসহ যেসব দেশে তাদের কার্যক্রম রয়েছে, সংশ্লিষ্ট দেশের আইন ও করবিধি অনুসরণ করেই কর পরিশোধ করা হয়। এনবিআরের সঙ্গে কোনো বিষয়ে মতবিরোধ দেখা দিলে আদালত ও সংশ্লিষ্ট কর কর্তৃপক্ষের মাধ্যমেই তা নিষ্পত্তির চেষ্টা করা হচ্ছে।

বিষয়গুলো বিচারাধীন থাকায় এ নিয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করতে চায়নি প্রতিষ্ঠানটি।

২০২৪ সাল থেকেই এনবিআরের নজরদারিতে

সামিট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আজিজ খানের আর্থিক তথ্য নিয়ে এনবিআরের অনুসন্ধানের বিষয়টি নতুন নয়। ২০২৪ সালের আগস্টে এনবিআরের সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল (সিআইসি) আজিজ খানসহ কয়েকজন শীর্ষ ব্যবসায়ী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের ব্যাংক হিসাবের তথ্য চেয়েছিল।

কর ফাঁকির সন্দেহে আয়কর আইন, ২০২৩-এর ক্ষমতাবলে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে এসব তথ্য চাওয়া হয়েছিল।

পরবর্তী সময়ে সামিটের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর নথি ও আর্থিক লেনদেন আরও বিস্তারিতভাবে পরীক্ষা করা হয়।

এদিকে সামিট গ্রুপের চেয়ারম্যান ও তার পরিবারের সদস্যদের সম্পদ ও অর্থপাচারসংক্রান্ত পৃথক অভিযোগ অনুসন্ধান করছে দুর্নীতি দমন কমিশনও (দুদক)। তবে দুদকের অনুসন্ধান এবং এনবিআরের বর্তমান করসংক্রান্ত কার্যক্রম পৃথক প্রক্রিয়া।

সামনে আইনি লড়াই

এনবিআর শেষ পর্যন্ত ফৌজদারি মামলা করলে সামিটের সঙ্গে কর কর্তৃপক্ষের চলমান বিরোধ নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করবে। একদিকে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার কর দাবি, অন্যদিকে সেই দাবির আইনি ভিত্তি চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে সামিটের একাধিক রিট—দুই পক্ষের বিরোধের চূড়ান্ত নিষ্পত্তিতে আদালতের সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

এ কারণে এনবিআরের অনুসন্ধানে উঠে আসা অঙ্কগুলোকে এখন পর্যন্ত কর ফাঁকির অভিযোগ ও কর কর্তৃপক্ষের দাবি হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে। বিচারিক প্রক্রিয়ায় অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে কর ফাঁকিতে দোষী হিসেবে উপস্থাপনের সুযোগ নেই।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন