শুক্রবার, ২১ আগস্ট ২০২৬

পদ্মা ব্যারাজে বদলে যেতে পারে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল, সুফল পাবে ২৬ জেলার ১৬৩ উপজেলা

দেশের নদী ব্যবস্থায় পানিপ্রবাহ পুনরুদ্ধার, শুষ্ক মৌসুমে পানি সংরক্ষণ, সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে লবণাক্ততার আগ্রাসন ঠেকাতে সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার প্রকল্প হিসেবে বাস্তবায়িত হচ্ছে ‘পদ্মা ব্যারাজ’। প্রকল্পটি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে দেশের চার বিভাগের ২৬ জেলার ১৬৩টি উপজেলার মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এর সুফল পাবে। প্রকল্পসংশ্লিষ্ট এলাকার পরিমাণ দেশের মোট ভূখণ্ডের প্রায় ৩৭ শতাংশ।

গত ১৩ মে প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারপারসন তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প অনুমোদন পায়। প্রকল্পটি দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে আলোচনা, সমীক্ষা ও পরিকল্পনার মধ্যে থাকলেও এবার তা বাস্তবায়নের পর্যায়ে যাচ্ছে।

প্রথম পর্যায়ে ১৯ জেলার ১২০ উপজেলা

পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন, পদ্মা ব্যারাজ পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে ২৬ জেলার ১৬৩টি উপজেলা এবং দেশের প্রায় ৩৭ শতাংশ মানুষ এর সুফল পাবে। তবে প্রথম পর্যায়ের কার্যক্রমে চার বিভাগের ১৯ জেলার ১২০টি উপজেলা সরাসরি সুবিধার আওতায় আসবে।

প্রথম পর্যায়ের আওতায় খুলনা বিভাগের কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, মাগুরা, যশোর, নড়াইল, বাগেরহাট, খুলনা ও সাতক্ষীরা; ঢাকা বিভাগের রাজবাড়ী, ফরিদপুর ও গোপালগঞ্জ; রাজশাহী বিভাগের পাবনা, রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ এবং বরিশাল বিভাগের পিরোজপুর অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

কোথায় হবে ব্যারাজ

পরিকল্পনা অনুযায়ী, রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলার হাবাসপুর এলাকায় পদ্মা নদীর ওপর প্রায় ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ ব্যারাজ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে পদ্মার পানি ধরে রেখে তা সংশ্লিষ্ট নদী ও সেচব্যবস্থায় সরবরাহের সুযোগ তৈরি হবে।

ম‍্যাপে পদ্মা ব‍্যারেজের অবস্থান

প্রকল্পের প্রথম পর্যায় বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) মাধ্যমে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। বাস্তবায়নকাল নির্ধারণ করা হয়েছে জুলাই ২০২৬ থেকে জুন ২০৩৩ পর্যন্ত। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যায়ের অর্থায়ন সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে করার পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রাণ ফিরে পাওয়ার আশা নদীগুলোতে

পদ্মার সঙ্গে যুক্ত দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বেশ কয়েকটি নদী ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে শুষ্ক মৌসুমে পানির স্বল্পতা, নাব্যতা হ্রাস ও লবণাক্ততার মতো সমস্যার মুখে রয়েছে।

শুস্ক মৌসুমে পদ্মা নদীর চিত্র

পদ্মা ব্যারাজের প্রথম পর্যায়ের মাধ্যমে হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতি, চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতীসহ প্রধান নদী ব্যবস্থার প্রবাহ ও নাব্যতা পুনরুদ্ধারের লক্ষ্য রয়েছে। এর ফলে মৃতপ্রায় ও পানিসংকটে থাকা বিভিন্ন নদী-খাল নতুন করে প্রবাহ ফিরে পেতে পারে বলে সরকারের প্রত্যাশা।

সেচের আওতায় প্রায় ২৮ লাখ ৮০ হাজার হেক্টর

প্রকল্পের অন্যতম বড় লক্ষ্য কৃষিতে পানির নিশ্চয়তা তৈরি করা। সরকারি তথ্যে বলা হয়েছে, প্রকল্পের মাধ্যমে বৃহত্তর কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, যশোর, খুলনা, বরিশাল, পাবনা ও রাজশাহী অঞ্চলের প্রায় ২৮ লাখ ৮০ হাজার হেক্টর কৃষিজমিতে সেচ সুবিধা নিশ্চিত করার লক্ষ্য রয়েছে।

একই সঙ্গে পদ্মা নদীতে প্রায় ২ হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি সংরক্ষণের সক্ষমতা তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে এই পানি কৃষি ও নদীর প্রবাহ ধরে রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বাড়তে পারে ধান ও মাছের উৎপাদন

প্রকল্প প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় পানি ও সেচ সুবিধা নিশ্চিত হলে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে কৃষি উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিভিন্ন প্রকল্প-সংক্রান্ত তথ্যে বছরে প্রায় ২৩ লাখ ৯০ হাজার টন অতিরিক্ত ধান এবং প্রায় ২ লাখ ৩৪ হাজার টন অতিরিক্ত মাছ উৎপাদনের সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে।

নদী ও জলাশয়ে স্বাদুপানির প্রবাহ বাড়লে মাছের প্রাকৃতিক আবাসস্থল এবং জলজ জীববৈচিত্র্যের ওপরও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।

লবণাক্ততা ঠেকানো ও সুন্দরবনের পরিবেশ রক্ষার লক্ষ্য

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বড় একটি সমস্যা শুষ্ক মৌসুমে স্বাদুপানির প্রবাহ কমে যাওয়া এবং লবণাক্ত পানি ভেতরের দিকে প্রবেশ করা। পদ্মার পানি সংরক্ষণ করে সংশ্লিষ্ট নদীগুলোতে স্বাদুপানির প্রবাহ বাড়ানোর মাধ্যমে লবণাক্ততার বিস্তার কমানো প্রকল্পটির অন্যতম উদ্দেশ্য।

এর ফলে কৃষিজমি ও মৎস্যসম্পদের পাশাপাশি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সামগ্রিক প্রতিবেশ এবং সুন্দরবনের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে সরকারের প্রত্যাশা।

জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনাও

পদ্মা ব্যারাজকে শুধু পানি ব্যবস্থাপনা অবকাঠামো হিসেবে সীমাবদ্ধ না রেখে বহুমুখী প্রকল্প হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারি তথ্যে প্রকল্পের আওতায় মোট ১১৩ মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতার দুটি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে।

ব্যারাজের ওপর সড়ক এবং বিদ্যুৎ ও গ্যাস সঞ্চালন অবকাঠামোর সুযোগ রেখে এটিকে একটি বহুমুখী করিডর হিসেবে ব্যবহারের পরিকল্পনাও প্রকল্প প্রস্তাবে রয়েছে।

পদ্মা সেতুর পর আরেক বড় অবকাঠামো উদ্যোগ

পদ্মা সেতু চালুর মাধ্যমে দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানীসহ অন্যান্য অঞ্চলের সরাসরি সড়ক যোগাযোগে বড় পরিবর্তন এসেছে। অন্যদিকে পদ্মা ব্যারাজের মূল লক্ষ্য যোগাযোগ নয়; পানি ব্যবস্থাপনা, কৃষি, মৎস্য, নদী পুনরুদ্ধার এবং পরিবেশগত ভারসাম্য।

ফলে পদ্মা সেতু যেখানে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি দিয়েছে, সেখানে পদ্মা ব্যারাজ বাস্তবায়িত হলে একই অঞ্চলের পানি ও কৃষিনির্ভর অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তি শক্তিশালী হওয়ার প্রত্যাশা রয়েছে।

ছয় দশকের বেশি সময় ধরে আলোচনা ও বিভিন্ন পর্যায়ের সমীক্ষার পর বাস্তবায়নের পথে আসা পদ্মা ব্যারাজ তাই শুধু একটি ব্যারাজ নির্মাণের প্রকল্প নয়; সরকারের পরিকল্পনায় এটি দেশের একটি বড় অংশের নদী, কৃষি, মৎস্য, পানি ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশ পুনরুদ্ধারের দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন