অনুসরণ করুন:
সোমবার, ১৭ আগস্ট ২০২৬

দখলদারিত্বের বিস্তার: ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের আরও ভেতরে নতুন ইসরাইলি বসতি স্থাপনের উদ্যোগ

অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের আরও ভেতরে ঢুকে নতুন বসতি-আউটপোস্ট স্থাপনের চেষ্টা চালিয়েছে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা। রামাল্লার উত্তর-পশ্চিমে উম্ম সাফা গ্রামের কাছে ওয়াদি জেইতুন এলাকায় তাঁবু স্থাপন করে নতুন বসতি গড়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই দিনে বুরকা গ্রামেও পৃথক একটি আউটপোস্ট স্থাপনের চেষ্টা শুরু হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রের বরাতে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে।

নতুন এসব আউটপোস্ট গড়ে উঠলে ওই দুই প্রতিবেশী গ্রামের আশপাশে ইসরায়েলি বসতি-আউটপোস্টের সংখ্যা ছয়টিতে পৌঁছাবে বলে ফিলিস্তিনি বার্তা সংস্থা ওয়াফা জানিয়েছে।

ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটল, যখন অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ, ভূমি দখল এবং ফিলিস্তিনিদের ওপর বসতি স্থাপনকারীদের হামলা নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে নাবলুস ও রামাল্লা অঞ্চলের একাধিক গ্রামে বসতি স্থাপনকারীদের তৎপরতা ও ফিলিস্তিনি পরিবারগুলোকে ঘিরে রাখার ঘটনাও সামনে এসেছে। 

ফিলিস্তিনি জমিতে নতুন আউটপোস্ট

রোববার উম্ম সাফার কাছে ওয়াদি জেইতুন এলাকায় বসতি স্থাপনকারীরা তাঁবু খাটিয়ে সেখানে স্থায়ী অবকাঠামো গড়ে তোলার প্রস্তুতি নেয়। স্থানীয়দের আশঙ্কা, প্রাথমিকভাবে অস্থায়ী তাঁবু দিয়ে শুরু হলেও পরবর্তী সময়ে এসব স্থানে রাস্তা, ঘরবাড়ি ও অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণের মাধ্যমে বসতি সম্প্রসারণ করা হতে পারে।

ফিলিস্তিনি সূত্রের দাবি, উম্ম সাফা ও বুরকা—দুই গ্রামের বড় অংশের জমি ইতোমধ্যে বসতি স্থাপনকারীদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। নতুন আউটপোস্ট স্থাপনের উদ্যোগ সফল হলে স্থানীয় ফিলিস্তিনিদের কৃষিজমি ও চলাচলের ওপর আরও চাপ তৈরি হতে পারে।

এ ধরনের ছোট আউটপোস্টকে অনেক সময় বড় ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণের প্রাথমিক ধাপ হিসেবে দেখা হয়। চলতি বছর পশ্চিম তীরে নতুন বসতি অনুমোদন ও বিদ্যমান আউটপোস্ট সম্প্রসারণ নিয়ে ইসরায়েলি সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্তও আন্তর্জাতিক মহলে সমালোচিত হয়েছে। 

কুসরায় তিন পরিবারের ওপর অবরোধ

এদিকে নাবলুসের দক্ষিণে কুসরা গ্রামে তিনটি ফিলিস্তিনি পরিবারের বাড়ির সামনে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের অবস্থান ও অবরোধ দ্বিতীয় সপ্তাহে গড়িয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই তিন বাড়িতে ১৫ জন ফিলিস্তিনি অবস্থান করছেন, যাদের মধ্যে দুই শিশু রয়েছে। বসতি স্থাপনকারীদের অবস্থানের কারণে পরিবারগুলোর স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।

এর আগে কুসরায় ফিলিস্তিনি বাড়ির ঠিক সামনে একটি নতুন আউটপোস্ট স্থাপনের চেষ্টা নিয়ে ইসরায়েলি সেনাদের সঙ্গে বসতি স্থাপনকারীদের সংঘর্ষও হয়। সেনারা তাঁবু সরানোর চেষ্টা করলেও পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি বলে রয়টার্স জানিয়েছে। 

পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ নিয়ে উদ্বেগ

পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দীর্ঘদিন ধরেই আপত্তি রয়েছে। জাতিসংঘ ও অধিকাংশ রাষ্ট্রের অবস্থান অনুযায়ী, ১৯৬৭ সাল থেকে অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলি বসতি স্থাপন আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী। ২০২৬ সালেও জাতিসংঘের বিভিন্ন নথিতে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন এবং পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণ আরও স্থায়ী করার পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। 

জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসও সম্প্রতি অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণকে আন্তর্জাতিক আইনের ‘স্পষ্ট লঙ্ঘন’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। 

‘ভূমি দখল ও বাস্তুচ্যুতির আশঙ্কা’

ফিলিস্তিনি অধিকারকর্মী ও কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন আউটপোস্ট স্থাপনের পাশাপাশি বসতি স্থাপনকারীদের হামলা এবং ফিলিস্তিনি পরিবারগুলোর চলাচলে বাধা দেওয়ার ঘটনা একই বৃহত্তর প্রবণতার অংশ। তাঁদের আশঙ্কা, এভাবে ধাপে ধাপে ফিলিস্তিনিদের কৃষিজমি ও বসতভূমি থেকে সরিয়ে দিয়ে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণ আরও বিস্তৃত করা হচ্ছে।

অন্যদিকে ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিম তীরের ভূখণ্ডের চূড়ান্ত মর্যাদাকে বিতর্কিত বলে দাবি করে আসছে এবং বসতি সম্প্রসারণকে তাদের নিরাপত্তা ও ঐতিহাসিক অধিকারের সঙ্গে যুক্ত করে থাকে।

তবে আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনের বৈধতা নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অবস্থান স্পষ্ট। ২০২৪ সালের আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের পরামর্শমূলক মতামতের পরও বসতি সম্প্রসারণ অব্যাহত থাকায় বিষয়টি নিয়ে কূটনৈতিক চাপও বাড়ছে। 

এদিকে পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা ও ভূমি দখলের ঘটনা বাড়তে থাকায় অঞ্চলটিতে নতুন করে সংঘাত ও ফিলিস্তিনিদের বাস্তুচ্যুতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কুসরা, উম্ম সাফা, বুরকা ও আশপাশের এলাকায় নতুন আউটপোস্ট স্থাপনের উদ্যোগ সেই উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে তুলেছে। 

তথ্য সূত্র আন্তর্জাতিক সংবাদসংস্থা


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন