রবিবার, ১৬ আগস্ট ২০২৬

মৎস্য খাতে নতুন বাজার খুঁজে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

মৎস্য খাতকে আরও সমৃদ্ধ করার মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে নতুন নতুন আন্তর্জাতিক বাজার খুঁজে বের করতে দেশের উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

তিনি বলেছেন, দেশের নদী-নালা, খাল-বিল, পুকুর ও হাওরের মতো জলাশয়গুলোকে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগিয়ে মৎস্য উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব। এ লক্ষ্যে সরকার বিভিন্ন জলাশয় সংস্কার করে সেখানে মৎস্য পোনা ছাড়ার উদ্যোগ নিয়েছে। এসব জলাশয় সংশ্লিষ্ট এলাকার বেকার তরুণদের মধ্যে ব্যবহারের সুযোগ বণ্টন করা হবে, যাতে তারা কর্মসংস্থান ও স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ পান।

রোববার (১৬ আগস্ট) দুপুরে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীর আচমিতা জর্জ ইনস্টিটিউটের মিনি স্টেডিয়ামে জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ-২০২৬-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী ১৩টি ক্যাটাগরিতে ১৪ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে জাতীয় মৎস্য পদক-২০২৬ (স্বর্ণ পদক) প্রদান করেন। এবারের জাতীয় মৎস্য সপ্তাহের প্রতিপাদ্য—‘রুপালী মৎস্য স্বনির্ভর দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’।

জলাশয় ও পরিবেশ রক্ষার আহ্বান

দেশের মৎস্যসম্পদ রক্ষায় হাওর, নদী ও জলাশয়ের পরিবেশ সংরক্ষণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, মাছের উৎপাদন ও মৎস্যসম্পদের টেকসই উন্নয়নের জন্য পরিবেশ সুরক্ষা জরুরি। পরিবেশ রক্ষা করা গেলে মানুষ যেমন সুস্থ পরিবেশে বসবাসের সুযোগ পাবে, তেমনি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও একটি নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

প্লাস্টিকের বোতল, টিস্যু পেপারসহ বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য যত্রতত্র ফেলার কারণে দেশের খাল-বিল, নদী-নালা ও হাওর-জলাশয়ের পরিবেশ ক্রমেই দূষিত হচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

পরিবেশ দূষণ রোধে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রত্যেককে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পরিবেশ, পানি ও মৎস্যসম্পদ রক্ষায় সম্মিলিতভাবে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।

৫২ দেশে মৎস্যপণ্য রপ্তানি

মৎস্য খাতের অর্থনৈতিক অবদানের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী জানান, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ বিশ্বের প্রায় ৫২টি দেশে মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্য রপ্তানি করে ৬ হাজার কোটি টাকার বেশি সমমূল্যের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করেছে।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) সাম্প্রতিক প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, মোট জলজ প্রাণী উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে পঞ্চম এবং অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয় থেকে মাছ আহরণে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে।

মৎস্য খাতে উৎপাদন বাড়াতে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি জানান, খুলনা অঞ্চলে ৩০০টি ক্লাস্টার গঠনের মাধ্যমে ইতোমধ্যে ৭ হাজার ৫০০টি ঘেরে উৎপাদন বৃদ্ধি করা হয়েছে। পাশাপাশি কক্সবাজারের চকরিয়ায় ৭ হাজার একর জমিতে ‘শ্রিম্প সিটি’ বাস্তবায়নে মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন ও অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ চলছে।

ইলিশ উৎপাদনে গুরুত্ব

দেশের মৎস্য উৎপাদনে ইলিশের গুরুত্বপূর্ণ অবদানের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মোট মৎস্য উৎপাদনে ইলিশের অবদান প্রায় ১০ শতাংশ এবং জাতীয় জিডিপিতে এর অবদান ১ শতাংশের বেশি।

ইলিশ উৎপাদন বৃদ্ধিতে বিভিন্ন ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণ কার্যক্রমের ধারাবাহিকতার কথাও তুলে ধরেন তিনি।

মৎস্য খাতের ওপর নির্ভরশীল ২ কোটি মানুষ

দেশের প্রায় ২ কোটি মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মৎস্য খাতের ওপর নির্ভরশীল বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।

মৎস্যজীবী ও চাষিদের সহায়তায় সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, মৎস্য চাষিদের কৃষক কার্ড প্রদান এবং জেলেদের নিবন্ধন ও পরিচয়পত্র দেওয়ার কার্যক্রম চলছে।

এ ছাড়া ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রথমবারের মতো সুন্দরবন ও হাওর অঞ্চলে মাছ ধরার নিষিদ্ধকালীন সময়ে জেলেদের ভিজিএফ সহায়তার আওতায় আনা হয়েছে বলে জানান তিনি।

৫০০ কোটি টাকার স্টার্টআপ ফান্ড

প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থান সৃষ্টি, গবেষণা ও উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করতে সরকার ৫০০ কোটি টাকার স্টার্টআপ ফান্ড গঠন করেছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।

এই ফান্ড থেকে সম্ভাবনাময় স্টার্টআপ ও নতুন শিল্প উদ্যোক্তাদের ৫ লাখ থেকে ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত অনুদান দেওয়ার সুযোগ রয়েছে উল্লেখ করে তিনি নতুন উদ্যোক্তাদের এ সুযোগ কাজে লাগানোর আহ্বান জানান।

নতুন বিদেশি বাজার খুঁজতে উদ্যোক্তাদের আহ্বান

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাত দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিদেশে নতুন নতুন পণ্যের বাজার তৈরির জন্য উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের সক্রিয় হতে হবে।

তিনি জানান, বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো গত জুনে নাইজেরিয়ায় হ্যাচিং ডিম রপ্তানি করা হয়েছে। এ ধরনের নতুন রপ্তানি বাজার অনুসন্ধানে উদ্যোক্তাদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে সরকার সর্বোচ্চ সহযোগিতা করবে।

অনুষ্ঠানে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী আমিন উর রশীদের সভাপতিত্বে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী শাহে আলম, বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী শরীফুল আলম, কিশোরগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য জালাল উদ্দীন, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ সচিব দেলোয়ার হোসেন এবং মৎস্য অধিদফতরের মহাপরিচালক মো. খালেদ কনক বক্তব্য দেন।

জাতীয় মৎস্য সপ্তাহের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে প্রধানমন্ত্রী শোলাকিয়া মাঠে বৃক্ষরোপণ এবং কিশোরগঞ্জ স্টেডিয়ামে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।

ছবি: প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় (পিএমও)


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন