অনুসরণ করুন:
সোমবার, ১৭ আগস্ট ২০২৬

জাকারবার্গের ‘সবার জন্য এআই’ ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন, অতীতের মেটা অভিজ্ঞতায় সংশয়

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ঘিরে ভবিষ্যতের একটি আশাবাদী চিত্র তুলে ধরে দীর্ঘ এক প্রবন্ধ প্রকাশ করেছেন মেটার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মার্ক জাকারবার্গ। প্রায় ৬ হাজার ৫০০ শব্দের ওই লেখায় তিনি এমন এক ভবিষ্যতের কথা বলেছেন, যেখানে প্রত্যেক মানুষের নিজস্ব সক্ষম এআই এজেন্ট থাকবে—যে ব্যবহারকারীর লক্ষ্য, প্রয়োজন ও পছন্দ বুঝে ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে কাজ করবে।

তবে জাকারবার্গের এই দৃষ্টিভঙ্গি প্রযুক্তি মহলে সর্বত্র আশাবাদ তৈরি করতে পারেনি। বরং মেটার অতীত অভিজ্ঞতা, এআই প্রযুক্তির সম্ভাব্য সামাজিক মূল্য এবং প্রযুক্তিনির্ভর ভবিষ্যৎ নিয়ে অতিরিক্ত আশাবাদী বক্তব্য—সব মিলিয়ে তাঁর ঘোষণাকে ঘিরে তৈরি হয়েছে সমালোচনা।

টেকক্রাঞ্চের Equity পডকাস্টের সাম্প্রতিক পর্বে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন সাংবাদিক অ্যান্থনি হা, রেবেকা বেলান ও কার্স্টেন কোরোসেক। তাঁদের আলোচনায় উঠে আসে, জাকারবার্গের এআই-ভবিষ্যতের সঙ্গে মেটার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবসার আগের প্রতিশ্রুতিগুলোর একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈপরীত্য।

ব্যক্তিগত এআইকে কেন্দ্র করে মেটার নতুন অবস্থান

জাকারবার্গ তাঁর প্রবন্ধে এমন একটি ভবিষ্যতের কথা বলেছেন, যেখানে এআই মানুষের ব্যক্তিগত ক্ষমতা বাড়াবে। ব্যক্তিগত এআই এজেন্ট ব্যবহারকারীর সময়সূচি ব্যবস্থাপনা, বার্তা তৈরি, ফাইল গোছানোসহ দৈনন্দিন নানা কাজে সহায়তা করবে এবং প্রয়োজনে সবসময় সক্রিয় থাকবে।

রেবেকা বেলানের মতে, এ ধরনের ব্যক্তিগত সক্ষমতার জায়গাটিকেই মেটা এআই প্রতিযোগিতায় নিজেদের জন্য নতুন ক্ষেত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে।

তাঁর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এআইয়ের সবচেয়ে শক্তিশালী বা ‘ফ্রন্টিয়ার’ মডেল তৈরির প্রতিযোগিতায় মেটাকে সবসময় শীর্ষ সারির প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখা হয় না। একইভাবে জনপ্রিয় ভোক্তা এআই সহকারী হিসেবেও মেটার অবস্থান এখনো শীর্ষে নয়। ফলে ব্যক্তিগত এআইকে কেন্দ্র করে জাকারবার্গের নতুন বক্তব্যকে মেটার জন্য বাজারে নতুন অবস্থান তৈরির প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা যেতে পারে।

‘সবার জন্য’ এআই কতটা সবার নাগালে?

জাকারবার্গের বক্তব্যের অন্যতম মূল বিষয় হলো এআইকে সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত ক্ষমতায়নের হাতিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু বেলানের প্রশ্ন, বাস্তবে মেটার প্রস্তাবিত প্রযুক্তি কতটা সাধারণ মানুষের নাগালে থাকবে।

তিনি উল্লেখ করেন, মেটার নতুন এআই প্রযুক্তির কিছু সুবিধা ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট হার্ডওয়্যারের প্রয়োজন হতে পারে। ফলে ‘সবার জন্য এআই’ বলা হলেও বাস্তব ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রযুক্তিটি সবার জন্য সমানভাবে সহজলভ্য কি না, সে প্রশ্ন থেকেই যায়।

এই বৈপরীত্যই জাকারবার্গের ঘোষিত ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয়ের একটি কারণ হয়ে উঠেছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পুরোনো প্রতিশ্রুতির প্রসঙ্গ

আলোচনায় মেটার অতীতও উঠে আসে। বেলানের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের শুরুর সময়ে জাকারবার্গও এমন একটি ভবিষ্যতের কথা বলেছিলেন, যেখানে মানুষ বন্ধু ও পরিচিতদের সঙ্গে আরও সহজে যোগাযোগ করতে পারবে এবং সামাজিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হবে।

কিন্তু বাস্তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিজ্ঞাপন, বিভ্রান্তিকর বা উত্তেজনাপূর্ণ কনটেন্ট এবং ব্যবহারকারীর মনোযোগ ধরে রাখার প্রতিযোগিতা বড় ভূমিকা নিয়েছে। ফলে জাকারবার্গের নতুন এআই-ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতিকে অনেকেই মেটার আগের অভিজ্ঞতার আলোকে বিচার করছেন।

বেলানের বক্তব্যের সারকথা, জাকারবার্গ ব্যক্তিগত ক্ষমতায়নের যে ভবিষ্যৎ তুলে ধরছেন, সেটি আকর্ষণীয় হলেও সেই ভবিষ্যৎ বাস্তবে কীভাবে কাজ করবে—তা নিয়ে মানুষের আস্থার সংকট রয়েছে।

‘অ্যান্টি-ডারিও’ হিসেবে জাকারবার্গ?

আলোচনায় অ্যান্থ্রপিকের প্রধান নির্বাহী দারিও আমোদেইয়ের সঙ্গেও জাকারবার্গের অবস্থানের তুলনা করা হয়।

রেবেকা বেলানের ভাষায়, জাকারবার্গ যেন নিজেকে অনেকটা ‘অ্যান্টি-ডারিও’ হিসেবে উপস্থাপন করছেন। এআইয়ের নিরাপত্তা, ঝুঁকি ও উন্নয়নের গতি নিয়ে প্রযুক্তি খাতের একাংশ যখন সতর্কতার কথা বলছে, জাকারবার্গ সেখানে দ্রুত অগ্রসর হওয়ার পক্ষে অবস্থান নিচ্ছেন।

জাকারবার্গের যুক্তি হলো, এআই উন্নয়নের গতি কমিয়ে দিলে ব্যক্তি ও সমাজ এর সম্ভাব্য সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতে পারে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিগত নেতৃত্ব ধরে রাখার বিষয়টিও তিনি গুরুত্ব দিচ্ছেন।

অন্যদিকে সমালোচকদের প্রশ্ন, এআইয়ের সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদী হওয়ার পাশাপাশি এর সামাজিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত ঝুঁকিগুলোকে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

‘এআই সবার জন্য’—কিন্তু মানুষ কি তা চায়?

টেকক্রাঞ্চের আলোচনায় বলা হয়, এআই নিয়ে সাধারণ মানুষের সংশয়ের একটি বড় কারণ হলো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে দেওয়া অনেক প্রতিশ্রুতি অত্যন্ত বিমূর্ত।

‘এআই আরও সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবন তৈরি করবে’—এ ধরনের বক্তব্য সাধারণ মানুষের কাছে আকর্ষণীয় হলেও এর বাস্তব উপকার কী হবে, তা সবসময় পরিষ্কার নয়।

আর যখন ব্যক্তিগত কোচ, সহকারী বা সবসময় সক্রিয় এআইয়ের মতো নির্দিষ্ট ব্যবহারের কথা বলা হয়, তখন মানুষের মধ্যে উল্টো প্রশ্ন তৈরি হতে পারে—এসব সুবিধা সত্যিই কি প্রয়োজন?

আলোচনায় উদাহরণ হিসেবে এমন একটি ধারণার কথা আসে, যেখানে শিশুদের আগ্রহ অনুযায়ী এআই দিয়ে পডকাস্ট তৈরি করে গাড়িতে শোনানো যেতে পারে। এর বিপরীতে স্বাভাবিক প্রশ্ন উঠতে পারে—শিশুর সঙ্গে সরাসরি কথা বলার পরিবর্তে এআই কেন ব্যবহার করতে হবে?

জাকারবার্গের বক্তব্যের একটি প্রশ্ন

দীর্ঘ প্রবন্ধটির একটি বক্তব্য অবশ্য আলোচকদের কাছেও তুলনামূলকভাবে যুক্তিসংগত মনে হয়েছে। জাকারবার্গ প্রশ্ন তুলেছেন—যারা মনে করেন এআই ভবিষ্যতে ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনবে, তারা তাহলে এআই প্রযুক্তি তৈরি করছেন কেন?

টেকক্রাঞ্চের আলোচনায় বলা হয়, প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এআই নিয়ে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে গভীর আশঙ্কা প্রকাশ করার পাশাপাশি একই প্রযুক্তির উন্নয়ন অব্যাহত রাখার মধ্যে একটি আপাত বৈপরীত্য রয়েছে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে এআইয়ের ভবিষ্যৎ অবশ্যই ইতিবাচক হবে। বরং প্রযুক্তি তৈরির পাশাপাশি সম্ভাব্য ঝুঁকি, নিয়ন্ত্রণ ও সামাজিক প্রভাব নিয়েও সমানভাবে আলোচনা প্রয়োজন—এমন মত উঠে এসেছে আলোচনায়।

মেটার জন্য আস্থার পরীক্ষা

জাকারবার্গের ঘোষিত ‘সবার জন্য এআই’ ভবিষ্যৎ শেষ পর্যন্ত কতটা বাস্তব হবে, তা নির্ভর করবে প্রযুক্তিটি কতটা সহজলভ্য, কার্যকর ও মানুষের প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় তার ওপর।

তবে তার চেয়েও বড় বিষয় হতে পারে আস্থা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে মেটার ভূমিকা নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, সেটিই এখন এআইয়ের ক্ষেত্রেও জাকারবার্গের প্রতিশ্রুতিকে প্রভাবিত করছে।

ফলে জাকারবার্গের ৬ হাজার ৫০০ শব্দের আশাবাদী ভবিষ্যৎচিত্র শুধু এআইয়ের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা নয়; এটি একই সঙ্গে মেটার জন্য মানুষের আস্থা পুনর্গঠনের একটি বড় পরীক্ষাও হয়ে উঠতে পারে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন