সোমবার, ১৭ আগস্ট ২০২৬

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিশু: কনটেন্টের দর্শক, নাকি বাণিজ্যের উপকরণ?

বর্তমান প্রজন্মের অধিকাংশ শিশুই কোনো না কোনোভাবে স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সংস্পর্শে আসছে। কখনো বাবা-মায়ের অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে, কখনো আবার তাদের নামে খোলা আলাদা অ্যাকাউন্টে। ফলে বয়স ও মানসিক পরিপক্বতা বিবেচনায় নেওয়ার আগেই অনেক শিশু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নানা ধরনের কনটেন্টের মুখোমুখি হচ্ছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিক্ষামূলক, সৃজনশীল ও ইতিবাচক কনটেন্ট যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে সহিংসতা, অশালীনতা, সাইবার বুলিং, আত্মক্ষতির প্ররোচনা, শরীর নিয়ে নেতিবাচক ধারণা এবং বয়স-অনুপযোগী নানা বিষয়। এসব কনটেন্ট শিশুর চিন্তা, আচরণ ও মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো—শিশুরা এত সহজে এসব কনটেন্টের নাগালে পৌঁছে যাচ্ছে কেন?

এর অন্যতম কারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ঘিরে তৈরি হওয়া কনটেন্ট ও মনিটাইজেশন সংস্কৃতি। ফেসবুক রিলস, ইউটিউব শর্টস কিংবা অন্যান্য প্ল্যাটফর্মে ভিউ, ফলোয়ার ও আয়কে কেন্দ্র করে কনটেন্ট তৈরির প্রবণতা দ্রুত বাড়ছে। গণমাধ্যমেও নিয়মিতভাবে এসব প্ল্যাটফর্ম থেকে আয় এবং মনিটাইজেশনের বিভিন্ন কৌশল নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হচ্ছে।

তথ্য হিসেবে এসব প্রতিবেদন গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর একটি অনাকাঙ্ক্ষিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও রয়েছে—অনেকের কাছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন শুধু বিনোদনের জায়গা নয়, আয়ের সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র। আর সেই প্রতিযোগিতায় কখনো কখনো শিশুকেও কনটেন্টের ‘উপকরণ’ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

শিশুর শৈশব যখন কনটেন্ট

শিশুর স্বাভাবিক জীবন, ব্যক্তিগত পরিসর ও মানসিক বিকাশের কথা না ভেবেই অনেক সময় তাদের দিয়ে ভিডিও বানানো হচ্ছে। কখনো শিশুর হাসি-কান্না, কখনো পারিবারিক ঘটনা, আবার কখনো তার পোশাক, কথাবার্তা কিংবা ব্যক্তিগত মুহূর্তকে দর্শক আকর্ষণের উপাদান হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে।

অভিভাবকের কাছে এটি হয়তো নিছক বিনোদন বা অতিরিক্ত আয়ের সুযোগ। কিন্তু শিশুর দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি ভিন্ন।

একটি শিশু নিজের ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিও ইন্টারনেটে চিরস্থায়ীভাবে ছড়িয়ে দেওয়ার অর্থ কী—তা বোঝার মতো বয়সে নাও থাকতে পারে।

আজ যে ভিডিওতে হাজারো মানুষ হাসছে, কয়েক বছর পর সেই ভিডিওই শিশুটির জন্য বিব্রতকর বা ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে। ডিজিটাল জগতে একবার কোনো কনটেন্ট ছড়িয়ে পড়লে সেটি সম্পূর্ণভাবে মুছে ফেলা প্রায় অসম্ভব।

শিশুর অধিকার বনাম কনটেন্টের বাজার

ইউনিসেফসহ আন্তর্জাতিক শিশু অধিকার সংস্থাগুলো ডিজিটাল পরিবেশে শিশুদের নিরাপত্তা, গোপনীয়তা, মতপ্রকাশ এবং সুস্থ বিকাশের অধিকার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছে।

তাই শিশুকে শুধু ‘ভিউ আনার উপকরণ’ কিংবা ‘কনটেন্ট ক্রিয়েটরের অংশ’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তার রয়েছে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও মর্যাদার অধিকার।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে বয়সসীমা, অভিভাবকের সম্মতি, বয়স যাচাই এবং অন্যান্য সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা নিয়ে বিভিন্ন দেশে আলোচনা ও নীতিগত উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

ক্ষতিকর কনটেন্ট দেখলে কী করবেন অভিভাবক?

শিশু কোনো ক্ষতিকর বা অস্বস্তিকর কনটেন্ট দেখে ফেললে প্রথম কাজ হওয়া উচিত তাকে বকাঝকা না করা।

কারণ ভয় দেখালে শিশু পরবর্তী সময়ে এমন ঘটনা ঘটলেও তা অভিভাবকের কাছে গোপন করতে পারে।

বরং শান্তভাবে জানতে হবে—সে কী দেখেছে, কোথায় দেখেছে এবং সেটি দেখে তার কেমন লেগেছে। শিশুকে বোঝাতে হবে, অনলাইনে কোনো ভয়ংকর, অস্বস্তিকর বা বিভ্রান্তিকর কিছু দেখলে সে নির্ভয়ে বাবা-মাকে জানাতে পারবে।

পাশাপাশি—

  • বয়স উপযোগী Parental Control ব্যবহার করা;
  • নিরাপদ সার্চ ও কনটেন্ট ফিল্টার চালু রাখা;
  • ব্যক্তিগত তথ্য, ছবি, ঠিকানা বা পাসওয়ার্ড অনলাইনে না দেওয়ার শিক্ষা দেওয়া;
  • সাইবার বুলিং হলে প্রমাণ সংরক্ষণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া;
  • ক্ষতিকর অ্যাকাউন্ট বা কনটেন্ট ব্লক ও রিপোর্ট করা;
  • ঘুম, পড়াশোনা, খাবার ও পারিবারিক সময়কে যথাসম্ভব স্ক্রিনমুক্ত রাখা;
  • খেলাধুলা, বই পড়া, ছবি আঁকা ও পরিবারের সঙ্গে সরাসরি সময় কাটানোর সুযোগ বাড়ানো—এসব অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি।

সমাধান নিষেধাজ্ঞা নয়, সচেতনতা

শিশুকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে রাখাই সব ক্ষেত্রে একমাত্র সমাধান নয়। কারণ ডিজিটাল প্রযুক্তি ভবিষ্যতের শিক্ষা, যোগাযোগ ও কর্মজগতের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

প্রয়োজন হলো বয়স, মানসিক পরিপক্বতা ও প্রয়োজন অনুযায়ী নিরাপদ ডিজিটাল অভ্যাস তৈরি করা।

আর এখানে শুধু অভিভাবকের দায়িত্ব নয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্র—সবারই ভূমিকা রয়েছে।

শিশুর হাতে স্মার্টফোন তুলে দেওয়া সহজ; কিন্তু সেই স্মার্টফোন কীভাবে নিরাপদে ব্যবহার করতে হবে, সেটি শেখানোই প্রকৃত দায়িত্ব।

ভিউ, লাইক কিংবা মনিটাইজেশনের প্রতিযোগিতায় যেন কোনো শিশুর শৈশব, গোপনীয়তা ও ভবিষ্যৎ বিসর্জন না যায়—এই সচেতনতাই এখন সবচেয়ে জরুরি।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন