অনুসরণ করুন:
বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬

হেপাটাইটিস: নীরব ঘাতকের বিরুদ্ধে সচেতনতার লড়াই

বিশেষ প্রতিবেদন | প্রান্তকাল

মানবদেহের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোর একটি হলো যকৃত বা লিভার। শরীরের বিপাকক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ, বিষাক্ত উপাদান অপসারণ, পুষ্টি সংরক্ষণ, রক্ত জমাট বাঁধার উপাদান তৈরি থেকে শুরু করে শতাধিক গুরুত্বপূর্ণ কাজের সঙ্গে জড়িত এই অঙ্গটি। অথচ নীরবে, ধীরে ধীরে এই অঙ্গটিকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে এমন একটি রোগের নাম—হেপাটাইটিস

হেপাটাইটিসকে চিকিৎসকরা প্রায়ই ‘সাইলেন্ট কিলার’ বা নীরব ঘাতক বলে অভিহিত করেন। কারণ, অনেক ক্ষেত্রে বছরের পর বছর শরীরে ভাইরাস বহন করলেও আক্রান্ত ব্যক্তি কোনো উপসর্গ অনুভব করেন না। যখন রোগ ধরা পড়ে, তখন অনেকেরই লিভারে স্থায়ী ক্ষতি হয়ে যায়; কারও ক্ষেত্রে দেখা দেয় সিরোসিস, আবার কারও ক্ষেত্রে লিভার ক্যানসার।

এই নীরব কিন্তু প্রাণঘাতী রোগ সম্পর্কে বিশ্ববাসীকে সচেতন করতে প্রতি বছর ২৮ জুলাই বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস পালন করা হয়। এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘চলুন সহজভাবে বুঝি’—যা শুধু একটি স্লোগান নয়; বরং হেপাটাইটিস নিয়ে ভয়, ভুল ধারণা ও সামাজিক কলঙ্ক দূর করার একটি বৈশ্বিক আহ্বান।

বাংলাদেশের জন্য কেন উদ্বেগের বিষয়?

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রায় এক কোটি মানুষ হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাসে আক্রান্ত। বিভিন্ন বেসরকারি গবেষণা বলছে, প্রতিবছর ২০ হাজারের বেশি মানুষ হেপাটাইটিসজনিত জটিলতায় প্রাণ হারান।

তবে সংখ্যার চেয়েও উদ্বেগের বিষয় হলো—আক্রান্ত অধিকাংশ মানুষ জানেনই না যে তারা এই ভাইরাস বহন করছেন। অর্থাৎ, রোগটি শুধু ব্যক্তির শরীরেই নয়, অজান্তেই পরিবার ও সমাজেও সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি করে।

হেপাটাইটিস আসলে কী?

হেপাটাইটিস অর্থ লিভারের প্রদাহ। এটি বিভিন্ন কারণে হতে পারে, তবে জনস্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হলো ভাইরাসজনিত হেপাটাইটিস। এর মধ্যে হেপাটাইটিস বি ও সি দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকর।

হেপাটাইটিস এ ও ই সাধারণত দূষিত খাবার ও পানির মাধ্যমে ছড়ায় এবং অধিকাংশ রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠেন। কিন্তু হেপাটাইটিস বি ও সি দীর্ঘদিন শরীরে থেকে লিভারের কোষ ধ্বংস করতে থাকে। চিকিৎসা না হলে শেষ পর্যন্ত লিভার অকেজো হয়ে যেতে পারে।

কীভাবে ছড়ায়?

বিশেষজ্ঞদের মতে, হেপাটাইটিস বি ও সি মূলত সংক্রমিত রক্ত ও শরীরের তরলের মাধ্যমে ছড়ায়।

এর মধ্যে রয়েছে—

  • অনিরাপদ রক্ত সঞ্চালন,
  • একই সিরিঞ্জ একাধিক ব্যক্তির ক্ষেত্রে ব্যবহার,
  • অপরিষ্কার অস্ত্রোপচার বা ডেন্টাল যন্ত্রপাতি,
  • অনিরাপদ যৌন সম্পর্ক,
  • সংক্রমিত মা থেকে নবজাতকের শরীরে ভাইরাস সংক্রমণ,
  • জীবাণুমুক্ত নয় এমন যন্ত্র দিয়ে ট্যাটু বা পিয়ার্সিং।

অন্যদিকে, করমর্দন, আলিঙ্গন, একসঙ্গে বসে খাওয়া, একই অফিসে কাজ করা কিংবা কাশি-হাঁচির মাধ্যমে হেপাটাইটিস বি বা সি ছড়ায় না। অথচ এই ভুল ধারণার কারণে এখনও অনেক আক্রান্ত ব্যক্তি সামাজিক বৈষম্যের শিকার হন।

লক্ষণ না থাকাই সবচেয়ে বড় বিপদ

হেপাটাইটিসের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দিক হলো—এটি অনেক বছর পর্যন্ত কোনো লক্ষণ সৃষ্টি নাও করতে পারে।

যখন উপসর্গ দেখা দেয়, তখন রোগী দুর্বলতা, ক্ষুধামন্দা, বমিভাব, জ্বর, ডান পাশে পেটব্যথা, গাঢ় প্রস্রাব কিংবা চোখ-মুখ হলুদ হয়ে যাওয়ার মতো সমস্যায় ভুগতে পারেন।

কিন্তু চিকিৎসকদের মতে, জন্ডিস দেখা দেওয়ার আগেই যদি রোগ শনাক্ত করা যায়, তাহলে অধিকাংশ জটিলতা প্রতিরোধ করা সম্ভব।

আধুনিক চিকিৎসায় আশার আলো

একসময় হেপাটাইটিস সি-কে প্রায় দুরারোগ্য মনে করা হতো। কিন্তু বর্তমানে আধুনিক অ্যান্টিভাইরাল ওষুধের মাধ্যমে অধিকাংশ রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠছেন।

হেপাটাইটিস বি-এর ক্ষেত্রেও কার্যকর ওষুধ রয়েছে, যা ভাইরাসের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে রেখে লিভারের ক্ষতি অনেকাংশে কমিয়ে দিতে পারে। তবে রোগীকে অবশ্যই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত চিকিৎসা ও ফলোআপে থাকতে হয়।

প্রতিরোধই সবচেয়ে বড় অস্ত্র

বিশেষজ্ঞদের মতে, হেপাটাইটিস প্রতিরোধ করা চিকিৎসার চেয়ে অনেক সহজ।

হেপাটাইটিস বি-এর নিরাপদ ও কার্যকর টিকা বহু বছর ধরে ব্যবহৃত হচ্ছে। জন্মের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নবজাতককে এই টিকা প্রদান করলে ভবিষ্যতে সংক্রমণের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।

এছাড়া—

  • নিরাপদ রক্ত সঞ্চালন নিশ্চিত করা,
  • একবার ব্যবহারযোগ্য সিরিঞ্জ ব্যবহার,
  • জীবাণুমুক্ত অস্ত্রোপচার ও চিকিৎসা সরঞ্জাম ব্যবহার,
  • ব্যক্তিগত রেজর, নখ কাটার যন্ত্র ও টুথব্রাশ আলাদা রাখা,
  • ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের নিয়মিত পরীক্ষা করা এবং
  • নিরাপদ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা—

এসব পদক্ষেপ হেপাটাইটিস প্রতিরোধে অত্যন্ত কার্যকর।

সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০৩০ সালের মধ্যে ভাইরাল হেপাটাইটিসকে জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হিসেবে নির্মূল করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এই লক্ষ্য অর্জনে শুধু সরকারের উদ্যোগই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন চিকিৎসক, গণমাধ্যম, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণ।

হেপাটাইটিস নিয়ে লজ্জা বা গোপনীয়তা নয়—প্রয়োজন সঠিক তথ্য, সময়মতো পরীক্ষা এবং যথাযথ চিকিৎসা। কারণ একজন আক্রান্ত ব্যক্তি যত দ্রুত শনাক্ত হবেন, তত দ্রুত তিনি চিকিৎসার আওতায় আসবেন এবং অন্যদের সংক্রমণের ঝুঁকিও কমবে।

উপসংহার

হেপাটাইটিস এমন একটি রোগ, যা সচেতনতার অভাবে প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে; আবার সচেতনতা থাকলে সহজেই নিয়ন্ত্রণ করা যায়। তাই আজকের দিনে সবচেয়ে জরুরি বার্তা একটাই—হেপাটাইটিসকে ভয় নয়, জানতে হবে; লুকিয়ে নয়, পরীক্ষা করতে হবে; অবহেলা নয়, সময়মতো চিকিৎসা নিতে হবে।

একটি সচেতন পরিবার, একটি দায়িত্বশীল সমাজ এবং কার্যকর জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাই পারে বাংলাদেশকে হেপাটাইটিসমুক্ত ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নিতে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন