বুধবার, ১৯ আগস্ট ২০২৬

AI বিশ্বে নেতৃত্বের দৌড়ে তুরস্ক, ২০৩০ সালের মধ্যে ১ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগের লক্ষ্য

৫০ লাখ মানুষকে এআই প্রশিক্ষণের লক্ষ্য; তৈরি হবে ১ লাখ ১০ হাজার বিশেষজ্ঞ ও পেশাজীবী, ডেটা সেন্টারের সক্ষমতা পৌঁছাবে ১ গিগাওয়াটে

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে বৈশ্বিক অবস্থান শক্তিশালী করতে ২০২৬ থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত নতুন একটি জাতীয় কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে তুরস্ক। প্রযুক্তিগত স্বনির্ভরতা, দক্ষ জনশক্তি তৈরি, শক্তিশালী কম্পিউটিং অবকাঠামো এবং স্বাস্থ্য, জ্বালানি ও উৎপাদনসহ গুরুত্বপূর্ণ খাতে এআইয়ের ব্যবহার বাড়ানোকে এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে।

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান ‘২০২৬–২০৩০ Türkiye AI Action Plan’ সংক্রান্ত সার্কুলারে স্বাক্ষর করেছেন। মঙ্গলবার দেশটির সরকারি গেজেটে এটি প্রকাশ করা হয়। শিল্প ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে তৈরি এই রোডম্যাপে প্রযুক্তিগত সার্বভৌমত্ব ও টেকসই ডিজিটাল রূপান্তরকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

কর্মপরিকল্পনাটি মূলত সচেতনতা তৈরি, ব্যবহার, উৎপাদন এবং ব্যবস্থাপনা—এই চার ধাপকে কেন্দ্র করে সাজানো হয়েছে। এর মাধ্যমে দেশে একটি নিরাপদ, নির্ভরযোগ্য ও উদ্ভাবনবান্ধব এআই ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।

৫০ লাখ মানুষকে এআই বিষয়ে দক্ষ করার লক্ষ্য

পরিকল্পনার অন্যতম বড় অংশ হচ্ছে এআই-সম্পর্কিত জনদক্ষতা বৃদ্ধি। আগামী দুই বছরের মধ্যে তুরস্কের ৮১টি প্রদেশে মোট ৫০ লাখ নাগরিককে এআই লিটারেসি বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ে প্রাথমিক দক্ষতা প্রশিক্ষণ দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

একই সঙ্গে জাতীয় প্রতিভা উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় ১০ হাজার উচ্চপর্যায়ের এআই বিশেষজ্ঞ এবং আরও ১ লাখ অ্যাপ্লিকেশন পেশাজীবী তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থাৎ বিশেষজ্ঞ ও পেশাজীবী মিলিয়ে মোট ১ লাখ ১০ হাজার দক্ষ জনবল তৈরির লক্ষ্য নিয়েছে দেশটি।

এআই গবেষণা ও উদ্ভাবনের জন্য সরকারি তথ্যভান্ডারের ব্যবহারও বাড়ানো হবে। এ লক্ষ্যে অন্তত ২ হাজার সরকারি ডেটাসেট প্রস্তুত করার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি এআই ব্যবহারে নাগরিক ও ব্যবহারকারীদের অধিকার সুরক্ষায় আইনি ও নৈতিক কাঠামো গড়ে তোলা হবে।

ডেটা সেন্টারের সক্ষমতা ১ গিগাওয়াটে নেওয়ার পরিকল্পনা

এআই খাতে প্রয়োজনীয় কম্পিউটিং অবকাঠামো তৈরিতে বড় বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছে তুরস্ক। ২০৩০ সালের মধ্যে দেশটির ডেটা সেন্টারগুলোর মোট স্থাপিত কম্পিউটিং সক্ষমতা ১ গিগাওয়াটে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

গবেষক, স্টার্টআপ এবং ক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান যেন উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটিং সুবিধা ব্যবহার করতে পারে, সে জন্য ২ কোটি GPU-hour বরাদ্দের পরিকল্পনাও রাখা হয়েছে।

একই সঙ্গে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের বিনিয়োগ বাজেটের কমপক্ষে ২ শতাংশ এআই প্রকল্পে ব্যয় করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

স্বাস্থ্য, জ্বালানি ও স্মার্ট ম্যানুফ্যাকচারিংয়ে অগ্রাধিকার

স্বাস্থ্যসেবা, জ্বালানি এবং স্মার্ট ম্যানুফ্যাকচারিংকে অগ্রাধিকার দিয়ে বিভিন্ন খাতে পরীক্ষামূলক এআই কর্মসূচি চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ ও অবকাঠামো সুবিধাসম্পন্ন ক্যাম্পাসগুলোতে বিশেষ ‘AI Growth Zone’ প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্তও রয়েছে।

দেশীয় এআই উদ্যোগে অর্থায়নের জন্য একটি এআই গবেষণা তহবিলের পাশাপাশি গ্রোথ ফান্ড তৈরির পরিকল্পনা করা হয়েছে। তুরস্কে তৈরি খাতভিত্তিক ভাষা মডেল এবং রোবোটিক প্রযুক্তি উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানিতেও উৎসাহ দেওয়া হবে।

বেসরকারি বিনিয়োগের লক্ষ্য ১ হাজার কোটি ডলার

এআই ও ডেটা সেন্টার খাতে বেসরকারি উদ্যোগে অন্তত ১০ বিলিয়ন বা ১ হাজার কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে তুরস্ক।

শুধু অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা নয়, আন্তর্জাতিক এআই নীতি নির্ধারণেও সক্রিয় ভূমিকা নিতে চায় দেশটি। এ জন্য OECD, G20 ও জাতিসংঘের মতো আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে তুরস্কের অংশগ্রহণ ও ভূমিকা আরও জোরদার করার পরিকল্পনা রয়েছে।

আঞ্চলিক সহযোগিতার অংশ হিসেবে তুর্কি ভাষাগোষ্ঠীর জন্য একটি অভিন্ন বৃহৎ ভাষা মডেল বা Large Language Model (LLM) তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি অন্তত পাঁচটি অগ্রাধিকার খাতে নতুন এআই প্রযুক্তি ও নীতিমালা পরীক্ষার জন্য ‘রেগুলেটরি স্যান্ডবক্স’ পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে।

তুরস্কের শিল্প ও প্রযুক্তিমন্ত্রী মেহমেত ফাতিহ কাচির এআইকে ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও প্রযুক্তিগত সার্বভৌমত্বের গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, চলমান বৈশ্বিক এআই রূপান্তরে তুরস্ক শুধু দর্শক হয়ে থাকতে চায় না; বরং নিজস্ব সক্ষমতা ও মূল্যবোধের ভিত্তিতে প্রযুক্তি তৈরি করে অগ্রণী ভূমিকা নিতে চায়।

নতুন কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি, কম্পিউটিং অবকাঠামো, গবেষণা, বিনিয়োগ ও নিজস্ব প্রযুক্তি উন্নয়ন—এই ক্ষেত্রগুলো একসঙ্গে এগিয়ে নিয়ে ২০৩০ সালের মধ্যে তুরস্ককে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক এআই কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়েছে দেশটির সরকার।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন