শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

প্রবাসীদের সঞ্চয় ও বিনিয়োগে নতুন সুযোগ, চালু হয়েছে ‘এনআরসিটিএ’

বিদেশ থেকে পাঠানো অর্থ রাখা যাবে টাকায়; সঞ্চয়ী, চলতি ও মেয়াদি আমানত হিসাবের সুযোগ—মূল অর্থ ও অর্জিত আয় শর্তসাপেক্ষে বৈদেশিক মুদ্রায় রূপান্তর করে বিদেশে নেওয়ার সুবিধা

প্রবাসী বাংলাদেশিদের বৈধ পথে পাঠানো অর্থ দেশে সঞ্চয় ও বিনিয়োগে আরও কার্যকরভাবে ব্যবহারের সুযোগ দিতে ‘নন-রেসিডেন্ট কনভার্টিবল টাকা অ্যাকাউন্ট’ বা NRCTA চালু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন ব্যবস্থায় প্রবাসীরা বাংলাদেশের তফসিলি ব্যাংকের অফশোর ব্যাংকিং ইউনিটের (OBU) মাধ্যমে এই হিসাব খুলে দেশে টাকা সঞ্চয়, অনুমোদিত খাতে বিনিয়োগ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থ বৈদেশিক মুদ্রায় রূপান্তরের সুবিধা নিতে পারবেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রানীতি বিভাগ গত ২৩ জুন ‘Opening and Operation of Non-Resident Convertible Taka Accounts (NRCTA)’ শীর্ষক FEPD-1 Circular No. 14 জারি করে নতুন ব্যবস্থাটি চালু করে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এ উদ্যোগের উদ্দেশ্য প্রবাসী আয়ের সঙ্গে দেশের বিনিয়োগের সংযোগ বাড়ানো, আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং চ্যানেলে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ উৎসাহিত করা এবং তফসিলি ব্যাংকগুলোর অফশোর ব্যাংকিং কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা।

কী এই NRCTA

NRCTA মূলত অনিবাসী বাংলাদেশিদের জন্য বাংলাদেশি টাকায় পরিচালিত একটি কনভার্টিবল ব্যাংক হিসাব। প্রবাসী বাংলাদেশিরা বিদেশ থেকে বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রার বিপরীতে এই হিসাবে টাকা রাখতে পারবেন।

এই হিসাবের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, এটি স্থানীয় মুদ্রা অর্থাৎ টাকায় পরিচালিত হলেও এর অর্থ নির্ধারিত নিয়মে বৈদেশিক মুদ্রায় রূপান্তর এবং বিদেশে প্রত্যাবাসনের সুযোগ রয়েছে। ফলে প্রবাসীদের দেশে অর্থ রাখার পাশাপাশি প্রয়োজনে সেই অর্থ বিদেশে ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

তিন ধরনের হিসাব খোলার সুযোগ

প্রবাসীরা NRCTA-কে সঞ্চয়ী হিসাব (Savings Account), চলতি হিসাব (Current Account) অথবা মেয়াদি আমানত (Fixed Deposit Account) হিসেবে পরিচালনা করতে পারবেন।

এসব হিসাবে সুদ বা মুনাফার হার বাজারভিত্তিক হতে পারে। অর্থাৎ ব্যাংকগুলোর প্রযোজ্য নীতি ও বাজার পরিস্থিতি অনুযায়ী আমানতের ওপর রিটার্ন নির্ধারিত হবে।

কোথায় খোলা যাবে হিসাব

NRCTA সুবিধা তফসিলি ব্যাংকের Offshore Banking Unit (OBU)-এর মাধ্যমে পরিচালিত হবে। ফলে কোনো প্রবাসী এই সুবিধা নিতে চাইলে সংশ্লিষ্ট তফসিলি ব্যাংকের NRCTA/Offshore Banking সেবা সম্পর্কে তথ্য নিয়ে প্রয়োজনীয় হিসাব খুলতে পারবেন।

হিসাব খোলার ক্ষেত্রে ব্যাংকের Know Your Customer (KYC), অর্থের উৎস যাচাই, বৈদেশিক মুদ্রা ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধসংক্রান্ত প্রচলিত বিধিবিধান প্রযোজ্য থাকবে।

যেসব উৎস থেকে NRCTA-তে অর্থ আসতে পারবে

প্রধানত বিদেশ থেকে বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে পাঠানো রেমিট্যান্সের অর্থ এই হিসাবে জমা করা যাবে। এছাড়া অন্য NRCTA থেকে স্থানান্তরিত অর্থ, হিসাবের সুদ বা মুনাফা, অনুমোদিত বিনিয়োগ থেকে পাওয়া অর্থ এবং শেয়ার সাবস্ক্রিপশন ফেরতসহ বাংলাদেশ ব্যাংক অনুমোদিত অন্যান্য বৈদেশিক মুদ্রাসংশ্লিষ্ট অর্থও হিসাবে জমা হওয়ার সুযোগ রয়েছে।

ফলে এটি শুধু রেমিট্যান্স জমা রাখার হিসাব নয়; প্রবাসীদের অর্থ সঞ্চয় ও বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনার একটি বিস্তৃত প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করছে।

দেশে বিনিয়োগের সুযোগ

NRCTA-তে থাকা অর্থ অনুমোদিত বিভিন্ন বিনিয়োগ ও আর্থিক কার্যক্রমে ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। এর মাধ্যমে প্রবাসীদের অর্থ দেশের অর্থনীতির উৎপাদনশীল খাতে যুক্ত করার পথ আরও সহজ করার লক্ষ্য রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের বিদ্যমান ব্যবস্থায় অনিবাসী বাংলাদেশিসহ বিদেশে বসবাসরত বিনিয়োগকারীদের জন্য দেশের শেয়ার ও সিকিউরিটিজ, সরকারি ট্রেজারি বন্ড, অনুমোদিত অলটারনেটিভ ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড এবং ওপেন-এন্ড মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগের আলাদা কাঠামোও রয়েছে। এসব বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিধি ও নির্ধারিত হিসাবব্যবস্থা অনুসরণ করতে হয়।

মূলধন ও আয় বিদেশে নেওয়ার সুবিধা

NRCTA-এর অন্যতম আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে অর্থের repatriability বা বিদেশে প্রত্যাবাসনের সুবিধা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন কাঠামোয় NRCTA-তে থাকা মূল অর্থের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সুদ বা অনুমোদিত বিনিয়োগ থেকে অর্জিত আয়ও প্রযোজ্য নিয়ম মেনে বৈদেশিক মুদ্রায় রূপান্তর করে বিদেশে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

এই বৈশিষ্ট্যটি প্রবাসীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দেশে অর্থ রাখার পর ভবিষ্যতে তা বিদেশে ফিরিয়ে নেওয়ার সুযোগ নিয়ে যে অনিশ্চয়তা থাকতে পারে, কনভার্টিবল কাঠামো সেটি কমাতে সহায়তা করতে পারে।

রেমিট্যান্স থেকে বিনিয়োগ—নতুন সংযোগ

বাংলাদেশে প্রবাসী আয় অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈদেশিক মুদ্রার উৎস। তবে রেমিট্যান্সের বড় অংশই পারিবারিক ও দৈনন্দিন ব্যয়ে ব্যবহৃত হয়। NRCTA-এর মাধ্যমে প্রবাসীদের বৈধ পথে পাঠানো অর্থের একটি অংশ দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয় ও বিনিয়োগে নিয়ে আসার সুযোগ বাড়তে পারে।

একই সঙ্গে অর্থ প্রয়োজন হলে বিদেশে প্রত্যাবাসনের সুযোগ থাকায় প্রবাসীদের কাছে দেশে টাকা রাখা তুলনামূলকভাবে আরও নমনীয় হতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, প্রবাসীদের অর্থ আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থায় আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করা, বিনিয়োগের সঙ্গে রেমিট্যান্সের সম্পর্ক শক্তিশালী করা এবং অফশোর ব্যাংকিং কার্যক্রম সম্প্রসারণ নতুন হিসাবব্যবস্থা চালুর অন্যতম লক্ষ্য।

NRCTA ও NITA এক নয়

প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের জন্য আগে থেকেই Non-Resident Investor’s Taka Account (NITA) রয়েছে। তবে NRCTA এবং NITA-এর উদ্দেশ্য ও ব্যবহার পুরোপুরি এক নয়।

NITA মূলত অনিবাসীদের বাংলাদেশের পুঁজিবাজার ও নির্দিষ্ট সিকিউরিটিজে পোর্টফোলিও বিনিয়োগের জন্য ব্যবহৃত হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, NITA-এর মাধ্যমে তালিকাভুক্ত শেয়ার ও সিকিউরিটিজ, সরকারি ট্রেজারি বন্ড, অলটারনেটিভ ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড এবং ওপেন-এন্ড মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগ করা যায়।

অন্যদিকে NRCTA প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সঞ্চয়, আমানত ও অনুমোদিত বিনিয়োগের আরও বিস্তৃত কনভার্টিবল টাকা হিসাব হিসেবে তৈরি করা হয়েছে।

প্রবাসীদের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ

NRCTA-এর মাধ্যমে একজন প্রবাসী বাংলাদেশি তাঁর বৈধ বৈদেশিক আয় দেশে এনে টাকায় সঞ্চয় করতে পারবেন, বাজারভিত্তিক সুদ বা মুনাফার সুযোগ নিতে পারবেন এবং অনুমোদিত খাতে বিনিয়োগ করতে পারবেন। একই সঙ্গে প্রযোজ্য বিধি অনুসরণ করে মূলধন ও অর্জিত অর্থ বিদেশে প্রত্যাবাসনের সুযোগও থাকবে।

ফলে প্রবাসীদের অর্থ শুধু রেমিট্যান্স হিসেবে দেশে পাঠানোর পরিবর্তে ‘রেমিট্যান্স–সঞ্চয়–বিনিয়োগ’—এই তিনটি ক্ষেত্রকে একই আর্থিক কাঠামোর মধ্যে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ব্যাংকগুলো সহজ হিসাব খোলার ব্যবস্থা, প্রতিযোগিতামূলক রিটার্ন এবং ডিজিটাল ব্যাংকিং সুবিধার মাধ্যমে NRCTA কার্যকরভাবে প্রবাসীদের কাছে পৌঁছে দিতে পারলে এটি বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ানোর পাশাপাশি দেশের বিনিয়োগ ও বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন