অনুসরণ করুন:
বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬

অনলাইনে ‘তান্ত্রিক’ সেজে প্রতারণা: রাসায়নিক কৌশলে ভয় দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎ, পিবিআইয়ের অভিযানে গ্রেপ্তার ৩

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া ‘তান্ত্রিক’ পরিচয়ে নারীদের টার্গেট করে রাসায়নিক কৌশলে ভয় সৃষ্টি এবং অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট বিশ্লেষণের মাধ্যমে সংঘবদ্ধ এই প্রতারক চক্রের রহস্য উদ্ঘাটন করেছে সংস্থাটি। গ্রেপ্তারদের মধ্যে দুজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছেন।

পিবিআই জানিয়েছে, মামলার বাদী মোছা. সালমা আক্তার ফেসবুকে ‘রহমত আলী কবিরাজ’ নামে একটি আইডির মাধ্যমে কথিত এক তান্ত্রিকের সঙ্গে পরিচিত হন। স্বামীর পরকীয়া সম্পর্ক দূর করার প্রলোভন দেখিয়ে প্রথমে ‘হাদিয়া’ বাবদ ১ হাজার ৫০০ টাকা এবং পরে ‘জালালী কবুতর’ কেনার কথা বলে আরও ৩ হাজার ৫০০ টাকা বিকাশে নেওয়া হয়।

এরপর ‘জ্বীনের মাধ্যমে সমস্যা সমাধান’ করার কথা বলে ভুক্তভোগীকে পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট ও রসালো মিষ্টি কিনে ইমু ভিডিও কলে নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবহার করতে বলা হয়। নির্দেশনা অনুসরণ করলে রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফলে তার বাম হাতের তালুতে গুরুতর ক্ষত সৃষ্টি হয়। পরে সেই ক্ষত সারিয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিকাশ ও নগদের মাধ্যমে আরও ১৬ হাজার টাকা আদায় করা হয়। সব মিলিয়ে প্রতারণার মাধ্যমে ২১ হাজার টাকা আত্মসাৎ করা হয়।

এ ঘটনায় গত ২১ জুন ২০২৬ খিলক্ষেত থানায় সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর ২২(২) ধারায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। পরে পিবিআই এসআইঅ্যান্ডও (উত্তর) স্বপ্রণোদিত হয়ে মামলার তদন্তভার গ্রহণ করে এবং এসআই (নিরস্ত্র) মো. নাজমুল হককে তদন্তকারী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়।

পিবিআই প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মো. মোস্তফা কামালের সার্বিক দিকনির্দেশনায়, এসআইঅ্যান্ডও-এর বিশেষ পুলিশ সুপার মো. ফজলে এলাহীর তত্ত্বাবধানে এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. শিবলী নোমানের সহযোগিতায় তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ করে অভিযুক্তদের অবস্থান শনাক্ত করা হয়।

তদন্তের ধারাবাহিকতায় গত ২৪ জুলাই রাত ১২টার দিকে কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার হাড়িখোলা বিলের বাড়ি এলাকায় অভিযান চালিয়ে অহিদ মিয়া ওরফে কুয়েত (২৪) ও মাহে আলম (২৭)-কে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের কাছ থেকে প্রতারণায় ব্যবহৃত মোবাইল ফোন ও সিম কার্ড জব্দ করা হয়। একই দিন সকাল ৭টা ৪০ মিনিটে নোয়াখালীর সুধারাম উপজেলার পূর্ব এওজবালিয়া গ্রাম থেকে মো. হাসান আলীকে (২০) গ্রেপ্তার করা হয়। তার কাছ থেকেও একটি মোবাইল ফোন ও একাধিক সিম কার্ড উদ্ধার করা হয়।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনজনই প্রতারণার বিষয়টি স্বীকার করেন। পরে অহিদ মিয়া ওরফে কুয়েত এবং মো. হাসান আলী আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।

পিবিআইর তদন্তে জানা যায়, গ্রেপ্তাররা একটি সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্রের সদস্য। তারা ‘তান্ত্রিক কবিরাজ’, ‘হোসেন কবিরাজ’, ‘আসমা কবিরাজ’ ও ‘রহমত আলী কবিরাজ’ নামে ভুয়া ফেসবুক আইডি ও ইমু অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে বিশেষ করে নারীদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করত। এরপর পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট ও রসালো মিষ্টি হাতের তালু বা নাভিতে কিছুক্ষণ ধরে রাখতে নির্দেশ দিত। এতে রাসায়নিক বিক্রিয়ায় শরীরে গুরুতর ক্ষত সৃষ্টি হলে ‘জ্বীনের ভয়’ দেখিয়ে এবং অলৌকিকভাবে ক্ষত সারিয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে বিকাশ ও নগদের মাধ্যমে অর্থ আদায় করত। টাকা আদায়ের পর ভুক্তভোগীদের সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিত।

আর্থিক লেনদেন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রতারণার মাধ্যমে আদায়কৃত অর্থের একটি অংশ অহিদ মিয়ার ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরে স্থানান্তর করা হয়েছে। এছাড়া মাহে আলম নিজের জাতীয় পরিচয়পত্রে নিবন্ধিত বিকাশ সিম ব্যবহার করে প্রধান অভিযুক্তকে সহযোগিতা করতেন।

তদন্তে আরও উঠে এসেছে, চক্রটি পার্শ্ববর্তী ভারতেও একই ধরনের ভুয়া ফেসবুক পেজ পরিচালনা করত এবং ভারতীয় মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করত। বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের নামে অর্থ গুগল পে (Google Pay)-এর মাধ্যমে গ্রহণ করে পরে হুন্ডির মাধ্যমে বাংলাদেশে এনে আত্মসাৎ করা হতো। ভুয়া তান্ত্রিক সেবার প্রচারণা আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে বিভিন্ন অ্যাড এজেন্সির মাধ্যমে নিয়মিত ফেসবুক পেজ বুস্টও করা হতো।

পিবিআই আরও জানিয়েছে, জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক মাসে একই ধরনের রাসায়নিক ক্ষত নিয়ে অন্তত ২০০ জন ভুক্তভোগী চিকিৎসা নিয়েছেন।

এ বিষয়ে পিবিআই এসআইঅ্যান্ডও-এর বিশেষ পুলিশ সুপার মো. ফজলে এলাহী বলেন, প্রযুক্তির অপব্যবহার করে ধর্মীয় বিশ্বাস, কুসংস্কার ও মানুষের আবেগকে পুঁজি করে প্রতারণাকারী সংঘবদ্ধ চক্রের বিরুদ্ধে পিবিআই জিরো টলারেন্স নীতিতে কাজ করছে। এ ধরনের অপরাধ দমনে অভিযান অব্যাহত থাকবে এবং জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে। তিনি সাধারণ মানুষকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কথিত তান্ত্রিক, কবিরাজ বা অলৌকিক সমস্যা সমাধানের প্রলোভনে বিভ্রান্ত না হয়ে সচেতন থাকার এবং প্রতারণার শিকার হলে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানাতে আহ্বান জানান।

পিবিআই জানিয়েছে, মামলার সঙ্গে জড়িত অন্য সহযোগীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং মামলার তদন্ত চলমান আছে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন