অনুসরণ করুন:
মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

প্রকৃত পাসপোর্টধারীর পরিবর্তে অন্য নারীকে ইতালিতে পাচার: ৫৬টি পাসপোর্টসহ সংঘবদ্ধ চক্রের ৭ সদস্য গ্রেপ্তার

ঢাকা, ২১ জুলাই ২০২৬: প্রকৃত পাসপোর্টধারীর পরিবর্তে অন্য নারীকে ইতালিতে পাঠিয়ে মানবপাচার এবং ভিসা জালিয়াতির অভিযোগে সংঘবদ্ধ একটি চক্রের সাত সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। অভিযানে তাদের কাছ থেকে ৫৬টি পাসপোর্ট, ১৫৩টি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সিল, একটি এম্বোস সিল, তিনটি সিপিইউ, একটি ল্যাপটপ এবং নগদ ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা জব্দ করা হয়েছে।

সিআইডির মানবপাচার শাখা (টিএইচবি) গত ২০ জুলাই রাজধানীর গুলশান-১ এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করে। এ ঘটনায় গুলশান থানায় মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০২৬ এবং দণ্ডবিধির বিভিন্ন ধারায় মামলা দায়ের করা হয়েছে।

গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন মো. বেলায়েত হোসেন, নাজমুল হাসান, মেহেদী হাসান, মো. সোলাইমান সুমন, ফজলে রাব্বী, মো. তৌহিদুর রহমান এবং কাওসার হোসেন।

সিআইডি জানায়, ভুক্তভোগী এক নারী দীর্ঘদিন ধরে ইতালিতে অবস্থানরত স্বামী ও সন্তানদের সঙ্গে যোগ দিতে ভিসার চেষ্টা করছিলেন। ইতালির দূতাবাসে পাসপোর্ট জমা দেওয়ার পর মেয়াদ শেষ হওয়ায় নবায়নের প্রয়োজন হলে অভিযুক্ত নাজমুল হাসান তার সঙ্গে পরিচিত হন এবং দ্রুত পাসপোর্ট নবায়ন ও ভিসা করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে তাকে একটি ট্রাভেল এজেন্সিতে নিয়ে যান। সেখানে চক্রের মূলহোতা বেলায়েত হোসেনের সঙ্গে তার পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়।

অভিযুক্তরা ইতালির ভিসা পাইয়ে দেওয়ার নামে ভুক্তভোগীর কাছ থেকে ধাপে ধাপে মোট ৪ লাখ ৪০ হাজার টাকা আদায় করে। একপর্যায়ে তারা তার পাসপোর্ট নিজেদের হেফাজতে নিয়ে যায় এবং পরে ফেরত দেয়।

পরবর্তীতে ভুক্তভোগী সন্তানদের নিয়ে ইতালি যাওয়ার জন্য বিমানবন্দরে গেলে ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ তাকে জানায়, তার পাসপোর্টে সংযুক্ত ইতালির ভিসা ব্যবহার করে তার পরিবর্তে অন্য এক নারী ইতোমধ্যে ২৪ এপ্রিল ২০২৬ ইতালি চলে গেছেন। তখন তিনি বুঝতে পারেন, তার পাসপোর্ট ও ভিসা জালিয়াতির মাধ্যমে অন্য ব্যক্তিকে বিদেশে পাঠানো হয়েছে এবং তার কাছ থেকে নেওয়া অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে। পরে ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের পরামর্শে তিনি সিআইডির মানবপাচার শাখায় অভিযোগ করেন।

অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত শুরু করে সিআইডি। প্রাথমিক তদন্তে অভিযোগের সত্যতা এবং গ্রেপ্তারকৃতদের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়ার পর অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করা হয়। তদন্তে আরও জানা যায়, চক্রটি বিদেশে যাওয়ার আগ্রহী ব্যক্তিদের ইতালির ভিসা ও উন্নত জীবনের প্রলোভন দেখিয়ে পাসপোর্ট নিজেদের কাছে রেখে জালিয়াতির মাধ্যমে প্রকৃত পাসপোর্টধারীর পরিবর্তে অন্য ব্যক্তিকে বিদেশে পাঠাতো।

সিআইডির ভাষ্য অনুযায়ী, জব্দ করা ৫৬টি পাসপোর্ট এবং ১৫৩টি বিভিন্ন ধরনের সিল থেকে ধারণা করা হচ্ছে, চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পিতভাবে ভিসা জালিয়াতি ও মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত ছিল।

প্রাথমিক তদন্তে আরও জানা গেছে, চক্রটির মূলহোতা মো. বেলায়েত হোসেন ২০১৬ সাল থেকে একই কৌশলে প্রায় ৩০ জনকে ইতালিতে পাঠানোর সঙ্গে জড়িত ছিলেন এবং তাদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ নিয়েছেন। একই ধরনের অপরাধে তার বিরুদ্ধে ২০২৪ সালে বিমানবন্দর থানায় দায়ের হওয়া একটি মামলাও বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।

সিআইডি জানিয়েছে, জব্দ করা পাসপোর্ট, সিল, কম্পিউটার ও অন্যান্য আলামতের ফরেনসিক পরীক্ষা, অভিযুক্তদের আর্থিক লেনদেন অনুসন্ধান এবং দেশি-বিদেশি সহযোগী ও সম্ভাব্য অন্যান্য ভুক্তভোগীদের শনাক্তে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।

একই সঙ্গে বিদেশে কর্মসংস্থান, অভিবাসন বা ভ্রমণের ক্ষেত্রে যাচাই-বাছাই ছাড়া কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে অর্থ বা পাসপোর্ট হস্তান্তর না করার আহ্বান জানিয়েছে সিআইডি। পাশাপাশি সরকার অনুমোদিত বৈধ প্রক্রিয়ায় বিদেশ যাওয়ার এবং ভিসা জালিয়াতি বা মানবপাচারের সন্দেহ দেখা দিলে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা সিআইডিকে অবহিত করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন