শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬

হরমুজ প্রণালীতে চার তেলবাহী জাহাজে আগুন, মাইন বিস্ফোরণের দাবি ইরানের

কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীতে সমুদ্রের মাইনে আঘাত লেগে চারটি তেলবাহী জাহাজে আগুন ধরেছে বলে দাবি করেছে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী। বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) দেওয়া পৃথক বিবৃতিতে দেশটির ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) ও সেনাবাহিনী এ তথ্য জানায়। তবে ইরানের এ দাবির স্বাধীন কোনো নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, প্রণালীটির প্রধান জাহাজ চলাচলের পথ থেকে মাইন অপসারণ করা হয়েছে।

বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়, আইআরজিসির এক বিবৃতিতে দাবি করা হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় অনুমোদনহীন দক্ষিণাঞ্চলীয় নৌপথ দিয়ে হরমুজ প্রণালী অতিক্রমের চেষ্টা করার সময় তিনটি তেলবাহী জাহাজ সমুদ্রের মাইনে আঘাত পেয়ে বিস্ফোরিত হয় এবং সেগুলোতে আগুন ধরে যায়। পরে ইরানের সেনাবাহিনী জানায়, প্রণালীর পূর্ব দিকে একটি নিষিদ্ধ ও বিপজ্জনক এলাকায় চলাচলের সময় আরও একটি তেলবাহী জাহাজ মাইনে আঘাত পেয়ে আগুনের কবলে পড়ে।

আইআরজিসির দাবি, প্রথম তিনটি জাহাজ তাদের রাডার ও নৌ-চলাচলসংক্রান্ত যন্ত্রপাতি বন্ধ করে দিয়েছিল এবং আইআরজিসি নৌবাহিনীর সতর্কবার্তা উপেক্ষা করেছিল। তবে এসব ঘটনার সুনির্দিষ্ট সময় এবং জাহাজগুলোর পতাকাবাহী দেশ তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।

এদিকে, যুক্তরাজ্যভিত্তিক সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা ইউকেএমটিও বৃহস্পতিবার রাতে ওমানের খাসাব উপকূল থেকে প্রায় ২৫ নটিক্যাল মাইল বা ৪৬ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে হরমুজ প্রণালীতে একটি জাহাজে আগুন লাগার খবর পায়। সংস্থাটির পরবর্তী হালনাগাদ তথ্যে জানানো হয়, একটি ছোট নৌযান জাহাজটির কাছে গিয়ে পানির ওপরের অংশে দুটি বিস্ফোরক যন্ত্র সংযুক্ত করে। বিস্ফোরণের ফলে জাহাজটির ইঞ্জিনকক্ষে আগুন ধরে যায় এবং সাময়িকভাবে সেটির চলাচল বন্ধ হয়ে পড়ে। পরে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে এবং জাহাজের নাবিকেরা নিরাপদে রয়েছেন বলে জানানো হয়।

এর আগে একই এলাকায় আরও দুটি সামুদ্রিক নিরাপত্তা ঘটনার কথা জানায় ইউকেএমটিও। এর মধ্যে একটি ছোট পালতোলা নৌযান আগুন ধরে ডুবে যায়; স্থানীয় কর্তৃপক্ষ নৌযানটির আরোহীদের উদ্ধার করে। অন্য একটি তেলবাহী জাহাজ হরমুজ প্রণালী অতিক্রমের সময় অজ্ঞাত বস্তু বা অস্ত্রের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

তবে ইউকেএমটিওর এসব প্রতিবেদনে জাহাজগুলোর আগুন লাগার কারণ হিসেবে সমুদ্রের মাইনের কথা নিশ্চিত করা হয়নি। ফলে ইরানের দাবি করা চারটি জাহাজের ঘটনার সঙ্গে সংস্থাটির নথিভুক্ত ঘটনাগুলোর সরাসরি সম্পর্কও এখনো নিশ্চিত নয়।

এদিকে, হরমুজ প্রণালীর প্রধান নৌপথগুলো মাইনমুক্ত করার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) দাবিকে চ্যালেঞ্জ করেছে ইরান। আইআরজিসির মুখপাত্র হোসেইন মোহেবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে বলেন, শুধু বিবৃতি দিয়ে নয়, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ প্রমাণের মাধ্যমে হরমুজ প্রণালী থেকে মাইন অপসারণের দাবি প্রমাণ করতে হবে।

বৃহস্পতিবারের বিবৃতিতে আইআরজিসি আরও দাবি করে, ওমানের উপকূলঘেঁষা দক্ষিণাঞ্চলীয় নৌপথ দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলো তাদের অনুমোদনহীন পথ ব্যবহার করছে। এসব পথে চলাচলের দায় জাহাজের মালিক ও নাবিকদের নিতে হবে বলেও সতর্ক করে বাহিনীটি।

পৃথক এক বিবৃতিতে হরমুজ প্রণালীর পশ্চিমাঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের একটি এমকিউএম-১৭০ গোয়েন্দা ড্রোন আটক করার দাবিও করেছে আইআরজিসি। তাদের ভাষ্য, নৌবাহিনীর ইলেকট্রনিক যুদ্ধ ইউনিট অভিযান চালিয়ে ড্রোনটি আটক করেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী এ দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে বলে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল কঠোরভাবে সীমিত করেছে ইরান। বিশ্বের মোট তেল ব্যবহারের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ স্বাভাবিক সময়ে এ নৌপথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। ফলে প্রণালীটিতে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ও সমুদ্রপথের বাণিজ্য নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোতে অবরোধ আরোপ করেছে এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেলবাহী জাহাজ চলাচলে সহায়তা করছে। রোববার সেন্টকম জানায়, গ্রীষ্মকাল থেকে তাদের সহায়তায় উপসাগরীয় দেশগুলো হরমুজ প্রণালী ব্যবহার করে ১৫০ কোটি ব্যারেল তেল রপ্তানি করেছে।

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টাপাল্টি দাবির মধ্যে হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তা অব্যাহত রয়েছে। সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থাগুলোও এ অঞ্চলে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে সতর্কতার সঙ্গে নৌপথ ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন