মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬

জাপানি গণমাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফর: গুরুত্ব পাচ্ছে বিনিয়োগ ও কৌশলগত সম্পর্ক

এক ট্রিলিয়ন ইয়েন বিনিয়োগের সম্ভাবনা, জ্বালানি সহযোগিতা ও অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব নিয়ে আলোচনা

প্রান্তকাল ডেস্ক | ২৬ অক্টোবর ২০২৬

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চার দিনের জাপান সফর দেশটির সংবাদমাধ্যমে গুরুত্ব পেয়েছে। জাপানের সংবাদ সংস্থা কিয়োদো, কোবে শিম্বুন, টিবিএস নিউজ ও নিহন জিজি শিম্বুনের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, জ্বালানি নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং দুই দেশের কৌশলগত সম্পর্ক আরও জোরদারের সম্ভাবনা।

জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে সোমবার (২৬ অক্টোবর) সকালে টোকিওর নারিতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সফরে তাঁর সঙ্গে রয়েছেন সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান। বিমানবন্দরে তাঁদের স্বাগত জানান জাপানের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ইয়াসুতাকা নাকাসোনে।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর এটি তারেক রহমানের প্রথম জাপান সফর। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে তাঁর আনুষ্ঠানিক দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।

এক ট্রিলিয়ন ইয়েন বিনিয়োগের সম্ভাবনা

জাপানের সংবাদ সংস্থা কিয়োদোর বরাতে ২৫ অক্টোবর প্রকাশিত কোবে শিম্বুনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ও জাপানের শীর্ষ বৈঠকে আগামী কয়েক বছরে বাংলাদেশে প্রায় এক ট্রিলিয়ন ইয়েন বেসরকারি বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হতে পারে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুই দেশের নেতারা জ্বালানি সহযোগিতা সম্প্রসারণের পাশাপাশি অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার বিষয়ে আলোচনা করবেন। বৈঠক শেষে একটি যৌথ বিবৃতি প্রকাশের পরিকল্পনাও রয়েছে।

কিয়োদোর প্রতিবেদনে আরও জানানো হয়, সফরকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাপানের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। এর মধ্যে জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা জাইকার প্রেসিডেন্ট আকিহিকো তানাকা এবং পোশাক ব্র্যান্ড ইউনিক্লোর মূল প্রতিষ্ঠান ফাস্ট রিটেইলিংয়ের শীর্ষ নির্বাহীদের সঙ্গে বৈঠকের পরিকল্পনা রয়েছে।

এ ছাড়া ২৮ অক্টোবর জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশন (জেট্রো) আয়োজিত একটি অর্থনৈতিক ফোরামে অংশ নিয়ে বাংলাদেশে বিনিয়োগের সম্ভাবনা তুলে ধরার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর।

তবে এক ট্রিলিয়ন ইয়েন বিনিয়োগের বিষয়টি এখনো আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে। এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি।

কৌশলগত অংশীদারত্বে গুরুত্ব টিবিএস নিউজের

জাপানের টিবিএস নিউজ ২০ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদনে তারেক রহমানের সফরকে দুই দেশের কৌশলগত সম্পর্ক জোরদারের গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে তুলে ধরে।

প্রতিবেদনে জাপানের মন্ত্রিপরিষদ সচিব মিনোরু কিহারার বক্তব্য উল্লেখ করে বলা হয়, বাংলাদেশ জাপানের একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক অংশীদার। গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও আইনের শাসনের মতো অভিন্ন মূল্যবোধের ভিত্তিতে দুই দেশের সম্পর্ক আরও গভীর করার প্রত্যাশা করছে টোকিও।

বিশেষ করে একটি মুক্ত ও অবাধ ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সঙ্গে সহযোগিতা সম্প্রসারণকে গুরুত্ব দিচ্ছে জাপান।

টিবিএসের প্রতিবেদনে দুই প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন শীর্ষ বৈঠককে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন নিয়ে জাপানি সংবাদমাধ্যমের পর্যবেক্ষণ

২৩ অক্টোবর প্রকাশিত নিহন জিজি শিম্বুনের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের জাপান সফরের তাৎপর্য তুলে ধরা হয়।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে প্রায় দুই দশক পর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ক্ষমতায় ফিরে আসে। নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের প্রথম জাপান সফর দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে।

সংবাদমাধ্যমটি বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তির (ইপিএ) বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরে।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে স্বাক্ষরিত এ চুক্তির বাস্তবায়ন ও সংশ্লিষ্ট অনুমোদন প্রক্রিয়ার অগ্রগতি দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

চুক্তিটি কার্যকর হলে পণ্য ও সেবাবাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং ব্যবসায়িক সহযোগিতার নতুন সুযোগ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

সম্পর্ক জোরদারের প্রত্যাশা জাপান সরকারের

জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ২০ অক্টোবর প্রকাশিত আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তাঁর সহধর্মিণীর ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর জাপান সফরের বিষয়টি নিশ্চিত করে।

বিবৃতিতে বাংলাদেশকে জাপানের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে উল্লেখ করে বলা হয়, এই সফরের মাধ্যমে দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারত্ব আরও শক্তিশালী হবে বলে আশা করছে টোকিও।

জাপান সরকারের পক্ষ থেকে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার পাশাপাশি আঞ্চলিক শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

নজর মঙ্গলবারের শীর্ষ বৈঠকে

জাপানি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোর মূল আলোচনায় রয়েছে বাংলাদেশের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সম্পর্ক সম্প্রসারণ এবং জাপানি বিনিয়োগ বৃদ্ধির সম্ভাবনা।

বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্পায়ন, জ্বালানি নিরাপত্তা ও বাণিজ্যিক সহযোগিতায় জাপান দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। এবারের সফরে বিদ্যমান সম্পর্ক আরও বিস্তৃত করার সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

বিশেষ করে সম্ভাব্য এক ট্রিলিয়ন ইয়েন বেসরকারি বিনিয়োগ, জ্বালানি খাতে নতুন সহযোগিতা এবং অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তির বাস্তবায়ন কতটা অগ্রসর হয়, সেদিকে নজর থাকবে।

মঙ্গলবারের শীর্ষ বৈঠক শেষে সম্ভাব্য যৌথ ঘোষণা এবং পরবর্তী অর্থনৈতিক আলোচনার ফলাফলেই স্পষ্ট হবে দুই দেশের সম্পর্ক নতুন কোনো পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে কি না।

জাপানি সংবাদমাধ্যমের প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো থেকে প্রতীয়মান হচ্ছে, তারেক রহমানের এই সফরে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্কের পাশাপাশি অর্থনৈতিক স্বার্থ ও আঞ্চলিক কৌশলগত সহযোগিতাই বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন