এআই অবকাঠামোয় বিপুল বিনিয়োগের চাপের মধ্যে ব্যয় কমানোর উদ্যোগ; চার প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত বিনিয়োগ প্রায় ৭০০ বিলিয়ন ডলার
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে বিপুল বিনিয়োগের ব্যয় সামাল দিতে কর্মীদের স্বেচ্ছায় চাকরি ছাড়ার বিনিময়ে আর্থিক সুবিধা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান মাইক্রোসফট। প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ৬০ হাজার কর্মী এ প্রস্তাবের আওতায় আসতে পারেন, যা মোট কর্মীসংখ্যার প্রায় ২৭ শতাংশ। গতকাল সোমবার প্রতিষ্ঠানটির এক মুখপাত্র এ তথ্য জানিয়েছেন বলে বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে।
স্বেচ্ছায় চাকরি ছাড়ার প্রস্তাব যাঁদের জন্য
মাইক্রোসফটের এ উদ্যোগের আওতায় যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ভারত ও যুক্তরাজ্যে প্রতিষ্ঠানটির নির্বাচিত কয়েকটি বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট পদমর্যাদা পর্যন্ত এবং এর নিচের পর্যায়ের কর্মীরা থাকবেন। তবে ডেটা সেন্টার, বিক্রয় ও বিপণন বিভাগের কিছু কর্মীসহ নির্দিষ্ট কয়েকটি দলের সদস্যরা এ সুবিধা পাবেন না।
কর্মীদের কাছে পাঠানো এক স্মারকে মাইক্রোসফটের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ও প্রধান মানবসম্পদ কর্মকর্তা অ্যামি কোলম্যান বলেন, স্বেচ্ছায় চাকরি ছাড়ার এ প্রস্তাব কর্মীদের পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটির নতুন দৃষ্টিভঙ্গির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এর মাধ্যমে কর্মীদের জন্য আরও নমনীয়তা তৈরি হবে এবং সম্ভব হলে ভবিষ্যৎ কর্মজীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ বাড়বে।
চলতি বছরে কর্মীদের স্বেচ্ছায় চাকরি ছাড়ার সুযোগ দিয়ে এটি মাইক্রোসফটের দ্বিতীয় উদ্যোগ। এর আগে গত এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ৭ শতাংশ কর্মীকে আগাম অবসরের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়। সিএনবিসির তথ্য অনুযায়ী, ওই কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার যোগ্য কর্মীদের প্রায় ৩০ শতাংশ স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণ করেছিলেন।
মাইক্রোসফটের কর্মীসংখ্যা কমছে
নিয়ন্ত্রক সংস্থায় জমা দেওয়া নথি অনুযায়ী, গত জুনের শেষে মাইক্রোসফটের বিশ্বজুড়ে কর্মীসংখ্যা ছিল ২ লাখ ২৩ হাজার। ২০২৫ সালের শেষ দিকে এ সংখ্যা ছিল ২ লাখ ২৮ হাজার। অর্থাৎ, এ সময়ের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটির কর্মীসংখ্যা পাঁচ হাজার কমেছে।
চলতি সপ্তাহের শেষ দিকে মাইক্রোসফটের ত্রৈমাসিক আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশের কথা রয়েছে। এতে প্রতিষ্ঠানটির আয়, ব্যয় এবং এআই অবকাঠামোয় বিনিয়োগের পরিস্থিতি সম্পর্কে আরও তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
এআইয়ের প্রসারে চাকরি হারানোর উদ্বেগ
বিশ্বের বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এআই প্রযুক্তি, ডেটা সেন্টার ও কম্পিউটিং অবকাঠামো গড়ে তুলতে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করছে। একই সময়ে এআইয়ের প্রসারের কারণে কর্মসংস্থান কমে যাওয়ার আশঙ্কাও বাড়ছে। প্রযুক্তি খাতের বিশেষজ্ঞদের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানগুলোর শীর্ষ কর্মকর্তারাও এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা দারিও আমোদেই সতর্ক করে বলেছেন, এআইয়ের প্রভাবে বিপুলসংখ্যক মানুষ চাকরি হারাতে পারেন।
সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে কর্মী ছাঁটাইয়ের খবর সামনে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, নেটফ্লিক্স তাদের মোট কর্মীর প্রায় ৬ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় এক হাজার কর্মী ছাঁটাইয়ের পরিকল্পনা করছে।
অনলাইন নিলাম ও বাণিজ্যিক প্ল্যাটফর্ম ইবে চলতি মাসের শুরুতে এক হাজার কর্মী ছাঁটাই করেছে। এর আগে চলতি বছরের আরেক দফা ছাঁটাইয়ে প্রতিষ্ঠানটির ৮০০ কর্মী চাকরি হারিয়েছিলেন।
গত মে মাসে ফেসবুকের মূল প্রতিষ্ঠান মেটা তাদের বৈশ্বিক কর্মীসংখ্যার প্রায় ১০ শতাংশ ছাঁটাই করে। এতে প্রায় আট হাজার কর্মী চাকরি হারান। এপ্রিলে মেটা জানায়, নতুন করে ছয় হাজার কর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা বাতিল করা হয়েছে। পাশাপাশি, আরও সাত হাজার কর্মীকে এআইনির্ভর কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দায়িত্বে স্থানান্তর করা হবে।
যাত্রী পরিবহনসেবা প্রতিষ্ঠান উবার গত সেপ্টেম্বরে প্রায় ১০ শতাংশ কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘোষণা দেয়। এতে আনুমানিক তিন হাজার বা তারও বেশি কর্মী চাকরি হারাতে পারেন। অন্যদিকে, ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান অ্যামাজন চলতি বছরের জানুয়ারিতে বিশ্বজুড়ে ১৬ হাজার কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘোষণা দিয়েছিল।
মাইক্রোসফটও এর আগে গত জুলাইয়ে প্রায় পাঁচ হাজার কর্মী ছাঁটাই করে। ওই ছাঁটাইয়ের বড় অংশ ছিল প্রতিষ্ঠানটির এক্সবক্স গেমিং বিভাগের কর্মী।
এআই অবকাঠামোয় চার প্রতিষ্ঠানের ৭০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ
এআই খাতে ব্যয়ের ব্যাপকতা স্পষ্ট হয়েছে অ্যামাজন, মাইক্রোসফট, অ্যালফাবেট ও মেটার বিনিয়োগ পরিকল্পনায়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছর এই চার প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান সম্মিলিতভাবে এআই ডেটা সেন্টার, চিপ ও কম্পিউটিং অবকাঠামো গড়ে তুলতে প্রায় ৭০০ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করতে যাচ্ছে।
মাইক্রোসফট জানিয়েছে, চলতি বছরের এপ্রিল থেকে জুন—এই তিন মাসে প্রতিষ্ঠানটির মোট ব্যয় ছিল ৪১ বিলিয়ন ডলার। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে ব্যয় বেড়ে ৫০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল।
তবে ২০২৬ সালের পুরো বছরের জন্য মূলধনী ব্যয়ের পূর্বাভাস কমিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। আগে ব্যয় ১৯০ বিলিয়ন ডলার হতে পারে বলে ধারণা করা হলেও এখন তা কমিয়ে ১৭৫ বিলিয়ন ডলার নির্ধারণ করা হয়েছে।
ব্যয়ের বড় অংশ যাচ্ছে চিপ কেনায়
মাইক্রোসফটের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) অ্যামি হুড বিশ্লেষকদের সঙ্গে এক আলোচনায় জানান, প্রতিষ্ঠানটির মোট ব্যয়ের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ যাচ্ছে ‘স্বল্পমেয়াদি সম্পদ’ কেনার পেছনে, বিশেষ করে কম্পিউটার চিপ সংগ্রহে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, এআই ও প্রচলিত—উভয় ধরনের কম্পিউটিং অবকাঠামোর জন্য গ্রাহকদের চাহিদা থাকায় এ খাতে ব্যয় বাড়ছে।
প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর সামনে এখন একদিকে এআই সেবা ও অবকাঠামোর চাহিদা মেটাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর চাপ, অন্যদিকে ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও কর্মীসংখ্যা ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জ। মাইক্রোসফটের স্বেচ্ছায় চাকরি ছাড়ার নতুন প্রস্তাব এ দুই চাপের মধ্যে ভারসাম্য তৈরির উদ্যোগ হিসেবে সামনে এসেছে।

