বিদ্যুৎবিহীন ১৫ কিলোমিটার এলাকা, নিরাপত্তার স্বার্থে ২০০ মিটারে চলাচলে সতর্কতা
কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে গভীর নলকূপ খননের সময় ভূগর্ভ থেকে বের হওয়া গ্যাসে লাগা আগুন ৩২ ঘণ্টা পেরিয়েও নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। গ্যাসের উৎস, প্রকৃতি ও আগুন লাগার কারণ অনুসন্ধানে কাজ শুরু করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি (বাপেক্স)। ঘটনাস্থলে গ্যাসের কূপ বা মজুত থাকার সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
আগুনের শিখা বিদ্যুতের তারে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় মনখালী থেকে পাটুয়ারটেক পর্যন্ত প্রায় ১৫ কিলোমিটার এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে। ঝুঁকি এড়াতে ঘটনাস্থলের চারপাশের ২০০ মিটার এলাকায় সাধারণ মানুষের চলাচলে সতর্কতা জারি করেছে প্রশাসন।
গ্যাসের উৎস অনুসন্ধানে বাপেক্সের বিশেষজ্ঞ দল
গ্যাসের উৎস, প্রকৃতি ও আগুন লাগার কারণ অনুসন্ধানে আজ সকালে কাজ শুরু করেছে বাপেক্সের বিশেষজ্ঞ দল। এর আগে মঙ্গলবার রাতে দলটি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে।
পরিদর্শন শেষে বাপেক্সের ব্যবস্থাপক (ভূতত্ত্ব) ও ভূতাত্ত্বিক জরিপ দলের প্রধান এস এম নাফিফুন আরহাম বলেন, নলকূপ খননের সময় প্রায় এক হাজার ফুট গভীরে গ্যাসের স্তরের কাছাকাছি পৌঁছানো হয়েছিল। সেখান থেকে ভূগর্ভের ফাটল বা ভূতাত্ত্বিক চ্যুতির মধ্য দিয়ে গ্যাস ওপরে উঠে নলকূপের গর্ত দিয়ে বেরিয়ে এসে থাকতে পারে।
তিনি বলেন, গ্যাসের স্তরের ওপরের অংশ উন্মুক্ত হয়ে গেলে উচ্চচাপের গ্যাস ভূগর্ভের বিভিন্ন ফাটল দিয়ে পথ তৈরি করে কয়েক দিন পরও ভূপৃষ্ঠে উঠে আসতে পারে। গ্যাসের সংস্পর্শে কোনো উৎস থেকে স্ফুলিঙ্গ তৈরি হয়ে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। মানুষের কর্মকাণ্ড কিংবা বৈদ্যুতিক স্ফুলিঙ্গ থেকেও আগুন লাগতে পারে।
গ্যাসের প্রকৃতি ও মজুত এখনো নিশ্চিত নয়
আগুনের রং ও ধোঁয়া পর্যবেক্ষণ করে গ্যাসে তুলনামূলক ভারী হাইড্রোকার্বন থাকতে পারে বলে ধারণা করছেন বাপেক্সের এই কর্মকর্তা। তবে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণ না করা পর্যন্ত গ্যাসের প্রকৃতি ও উপাদান সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে না। একই কারণে সেখানে কী পরিমাণ গ্যাসের মজুত রয়েছে, সে বিষয়েও এখনই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
নাফিফুন আরহাম আরও বলেন, গ্যাসের নির্গমন বন্ধ করতে বা এর চাপ আটকে দেওয়ার চেষ্টা করা হলে ভূগর্ভের অন্য কোনো দুর্বল স্থান দিয়ে গ্যাস বেরিয়ে আসতে পারে। এতে ঝুঁকি আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তাই আপাতত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং মানুষকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে দূরে রাখাই প্রধান অগ্রাধিকার। গ্যাসের উৎস ও প্রকৃতি জানতে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণ করা হবে।
ফায়ার সার্ভিস ও সেনাবাহিনীর চেষ্টা
কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক সৈয়দ মুহাম্মদ মোরশেদ হোসেন বলেন, খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের চারটি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা শুরু করে। পরে আগুন নেভানোর কাজে সেনাবাহিনীও যোগ দেয়।
তবে গ্যাসের নির্গমন অব্যাহত থাকায় আগুন নেভানো সম্ভব হয়নি। জনবল ও কারিগরি সরঞ্জামের সীমাবদ্ধতার কারণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হয়ে পড়ে। পরে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়। বাপেক্স, পেট্রোবাংলাসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকেও অবহিত করা হয়েছে।
কক্সবাজার অঞ্চলে গ্যাসক্ষেত্রের সম্ভাবনা
নলকূপ থেকে গ্যাস বের হওয়া এবং দীর্ঘ সময় ধরে আগুন জ্বলতে থাকায় ইনানীতে প্রাকৃতিক গ্যাসের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের পরীক্ষার ফল না পাওয়া পর্যন্ত সেখানে গ্যাসক্ষেত্র বা উল্লেখযোগ্য মজুত থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
স্থানীয়দের ধারণা, ভূগর্ভে গ্যাসের কোনো পকেট থাকতে পারে। কক্সবাজার অঞ্চলে এর আগে গ্যাসকূপের সন্ধান পাওয়া যায়নি বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলে খাগড়াছড়ির সেমুতাংয়ে একটি গ্যাসক্ষেত্র এবং চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের সলিমপুর থেকে সাগরের দিকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে সাঙ্গু গ্যাসক্ষেত্র পাওয়া গিয়েছিল। এই দুটি ছাড়া চট্টগ্রাম বেল্টে আর কোনো গ্যাসক্ষেত্র নেই বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। বাঁশখালীতে দুটি কূপ খনন করা হলেও সেখানে গ্যাস পাওয়া যায়নি।
কম গভীরতার গ্যাস নিয়ে বাপেক্সের ব্যাখ্যা
ইনানীর ঘটনা সম্পর্কে বাপেক্সের অনুসন্ধান বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জেবুন নাহার বলেন, বাপেক্সের একটি প্রতিনিধিদল মঙ্গলবার রাতেই ঘটনাস্থলে পৌঁছেছে। দলটি নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকায় ফিরবে। পরীক্ষাগারে নমুনা বিশ্লেষণের পর সেখানে কী ধরনের গ্যাস রয়েছে এবং গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা কতটা, তা বোঝা যাবে।
তিনি বলেন, ‘নলকূপ খননে অনেক সময় এ ধরনের ঘটনা ঘটে। সাধারণত মাটির কম গভীরতায় বায়োজেনিক গ্যাস থাকে। এগুলো মাটির কম গভীরতায় থাকা পকেট গ্যাস।’
জেবুন নাহার আরও বলেন, বাপেক্স সাধারণত যে ভূতাত্ত্বিক স্তর থেকে গ্যাস উত্তোলন করে, তার গভীরতা কমপক্ষে ২ হাজার ৫০০ মিটার থেকে সাড়ে ৩ হাজার মিটারের বেশি। কিন্তু ইনানীতে প্রায় ৮০০ ফুট গভীরতার স্তর থেকে গ্যাস উঠছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ইনানীতে অঞ্চলভিত্তিক ভূতাত্ত্বিক জরিপ করা হলেও সেখানে গভীর অনুসন্ধান চালানো হয়নি।
নলকূপ খননের সময় আগুনের সূত্রপাত
স্থানীয় সূত্র জানায়, ঢাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ সম্প্রতি ইনানী গ্রামের ছোট সেতু এলাকায় মোস্তফা সিকদারের বাড়ির কিছু জমি কিনে সেখানে একটি খামারবাড়ি নির্মাণ করছিলেন। ওই বাড়িতে নলকূপ বসানোর সময় এ ঘটনা ঘটে।
নলকূপ খননকারী আবদুল্লাহ বলেন, ১০ থেকে ১৫ দিন আগে সেখানে একটি গভীর নলকূপ খনন করা হয়েছিল। তবে ৭০০ ফুট গভীরে গিয়েও পান করার উপযোগী পানি পাওয়া যায়নি। পরে গত সোমবার থেকে পাশের আরেকটি জায়গায় নলকূপ বসানোর কাজ শুরু করেন শ্রমিকেরা।
তিনি জানান, মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ৭টা থেকে হঠাৎ নলকূপ বসানোর স্থান থেকে আগুন বের হতে শুরু করে।
এলাকায় আতঙ্ক, নিরাপত্তা বলয়ে ঘটনাস্থল
স্থানীয় জালিয়া পালং ইউনিয়ন পরিষদের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য শামশুল আলম বলেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আগুনের তীব্রতা বাড়ছে। ওই এলাকায় মাটির নিচে গ্যাসের কোনো পাইপলাইন নেই উল্লেখ করে তিনি ধারণা করেন, এটি প্রাকৃতিক গ্যাস হতে পারে।
আগুন জ্বলতে থাকায় স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। তবে আশপাশে ঘরবাড়ি কিংবা হোটেল-রিসোর্ট না থাকায় হতাহতের আশঙ্কা নেই বলে জানান তিনি।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, প্রাথমিকভাবে সেখানে প্রাকৃতিক গ্যাস থাকার ধারণা থেকে এলাকাটিকে নিরাপত্তাবলয়ের আওতায় আনা হয়েছে এবং বাপেক্সকে খবর দেওয়া হয়েছে। ঢাকা থেকে দুই সদস্যের একটি দল এসে কাজ করছে।
গ্যাসের নমুনা পরীক্ষার ফল পাওয়ার পরই ইনানীতে গ্যাসের প্রকৃতি ও সম্ভাব্য মজুত সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

