বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬

ট্রাম্পের অভিবাসন নীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের স্বপ্ন ছেড়ে মেক্সিকোয় বসতি

ট্রাম্পের কঠোর অভিবাসন নীতিতে তিজুয়ানায় নতুন জীবন গড়ছেন অনেকে

ঢাকা, ২৮ অক্টোবর, ২০২৬ (বাসস): যুক্তরাষ্ট্রে উন্নত জীবনের আশায় দীর্ঘ ও বিপজ্জনক পথ পাড়ি দিয়ে মেক্সিকো সীমান্তে পৌঁছেছিলেন ভেনেজুয়েলার নাগরিক মিলকো গার্সিয়া। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র দুই দিন পর আশ্রয়ের আবেদন করার জন্য তাঁর নির্ধারিত সাক্ষাতের সময় বাতিল হয়ে যায়। এতে যুক্তরাষ্ট্রে নতুন জীবন শুরুর স্বপ্ন ভেঙে পড়ে তাঁর। শেষ পর্যন্ত মেক্সিকোর সীমান্তবর্তী শহর তিজুয়ানাকেই স্থায়ী আবাস হিসেবে বেছে নিয়েছেন তিনি।

বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিবাসন নীতির কারণে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অপেক্ষায় থাকা অনেক অভিবাসীর মতো ২৯ বছর বয়সী গার্সিয়াও মেক্সিকোতে বসতি গড়েছেন। একসময় যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার প্রবেশদ্বার হিসেবে বিবেচনা করা তিজুয়ানায় এখন তিনি নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার চেষ্টা করছেন।

আবাসন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত গার্সিয়া এএফপিকে বলেন, ‘আমি এখানে বেশ কিছু ভালো সুযোগ পেয়েছি। মেক্সিকোতে নিজেকে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি।’

তিনি আরও বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে আমি আবার শূন্য থেকে শুরু করতে চাই না।’

সাক্ষাতের সময় বাতিলে থেমে যায় যুক্তরাষ্ট্রযাত্রা

যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্তবর্তী তিজুয়ানা শহরটি ধাতব বেড়া দিয়ে দেশটি থেকে বিচ্ছিন্ন। প্রায় সাড়ে পাঁচ থেকে নয় মিটার উঁচু এই সীমান্ত বেড়ায় রয়েছে কড়া নজরদারি।

অভিবাসনবিরোধী অবস্থান নিয়ে আবারও ক্ষমতায় ফেরার পর ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের সুযোগ সীমিত করার বিভিন্ন পদক্ষেপ নেন। মেক্সিকো থেকে অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে বলে দাবি করেছেন তিনি। আগামী সপ্তাহের মার্কিন মধ্যবর্তী কংগ্রেস নির্বাচনের আগে অভিবাসন ইস্যুকে প্রচারের কেন্দ্রে রাখতে চাইছেন ট্রাম্প।

ক্ষমতায় ফিরে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কাস্টমস অ্যান্ড বর্ডার প্রোটেকশন (সিবিপি) সংস্থার মোবাইল অ্যাপ ‘সিবিপি ওয়ান’ বন্ধের নির্দেশ দেন। এই অ্যাপের মাধ্যমে আশ্রয়প্রার্থী ও অন্যান্য আবেদনকারী সীমান্তে সাক্ষাতের সময় নির্ধারণ করতে পারতেন।

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে অ্যাপটিতে প্রায় ২ লাখ ৭০ হাজার আবেদন প্রক্রিয়াধীন ছিল। তাঁদের মধ্যে ৩০ হাজার আবেদনকারী মেক্সিকো থেকে বৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের সুযোগ পাওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন।

গার্সিয়া ও তাঁর ভাইও অপেক্ষমাণ আবেদনকারীদের মধ্যে ছিলেন। সব নির্ধারিত সাক্ষাতের সময় বাতিল করে দেওয়ায় তিজুয়ানায় অপেক্ষারত অভিবাসীরা হতবাক হয়ে পড়েন।

ঘটনাটি স্মরণ করে গার্সিয়া বলেন, ‘আমরা ভেবেছিলাম, এখন সম্ভব হচ্ছে না, তবে হয়তো কয়েক মাস পর সুযোগ পাওয়া যাবে।’

কিন্তু অনেকের ক্ষেত্রে সেই অপেক্ষার শেষ হয়েছে মেক্সিকোতেই স্থায়ীভাবে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে।

মানব পাচারকারীদের অর্থ না দিয়ে মেক্সিকোয় বিনিয়োগের পরিকল্পনা

২০২৮ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি হেরে গেলেও অবৈধভাবে সীমান্ত পেরিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার পরিকল্পনা নেই গার্সিয়ার।

যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসীদের নিয়ে যাওয়ার জন্য মানব পাচারকারীদের বিপুল অর্থ দাবি করার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘তারা ১০ হাজার ডলার চাইছে।’

যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসীদের অবৈধভাবে প্রবেশে সহায়তাকারী এসব পাচারকারীকে সাধারণত ‘কোয়োটে’ বলা হয়।

গার্সিয়ার ভাষ্য, ওই অর্থ ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায় ব্যয় না করে তিনি তিজুয়ানায় কোনো ব্যবসায় বিনিয়োগ করতে চান। এতে মেক্সিকোতেই নিজের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার প্রতি তাঁর আগ্রহের বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে।

দীর্ঘ যাত্রার পর তিজুয়ানায় নতুন জীবন

তিজুয়ানা দীর্ঘদিন ধরে অভিবাসীদের যাতায়াতের পথ ও আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত। ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে শহরটিতে প্রায় ২৫ হাজার বিদেশি অভিবাসী এসেছেন।

ভেনেজুয়েলা ছাড়ার পর দীর্ঘ ১২ বছরের যাত্রার একপর্যায়ে তিজুয়ানায় পৌঁছান গার্সিয়া। নিজ দেশের সংকট থেকে বাঁচতে ২০১৪ সালে তাঁর পরিবার পেরুতে চলে গিয়েছিল। পরে যুক্তরাষ্ট্রে উন্নত সুযোগের আশায় তিনি উত্তর দিকে যাত্রা শুরু করেন।

পথে কলম্বিয়া ও পানামার মধ্যবর্তী দুর্গম দারিয়েন গ্যাপ পায়ে হেঁটে অতিক্রম করেন তিনি। ঘন বন, জলাভূমি ও বিপজ্জনক পথ পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত মেক্সিকোয় পৌঁছান।

যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার সিদ্ধান্তের পেছনে পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিও ভূমিকা রেখেছিল বলে জানান গার্সিয়া। তিনি বলেন, ‘আমার বোন যুক্তরাষ্ট্রে থাকতেন। সেখানে আরও ভালো সুযোগ পাওয়া যাবে বলে মনে হয়েছিল।’

পর্যটন ও খাবারের ব্যবসায় নতুন সম্ভাবনা

ভেনেজুয়েলার আরেক নাগরিক ২৭ বছর বয়সী হেইরি মায়া ২০২২ সালে মেক্সিকোয় আসেন। তবে সিবিপি ওয়ান কর্মসূচির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করতে পারেননি তিনি।

পরে মায়া পর্যটন খাতে কাজ শুরু করেন। পাশাপাশি বাড়তি আয়ের জন্য ভেনেজুয়েলার খাবার বিক্রি করতেন। এক মাস আগে তিজুয়ানায় একটি ছোট খাবারের দোকানও চালু করেছেন তিনি।

নিজের বর্তমান জীবন নিয়ে সন্তুষ্টির কথা জানিয়ে মায়া বলেন, ‘আমি এখানে বেশ স্বাচ্ছন্দ্যে আছি। তিজুয়ানা আমাকে আপন করে নিয়েছে।’

জাতিসংঘের অভিবাসনবিষয়ক সংস্থার ২০২৫ সালের এক জরিপেও মেক্সিকোয় স্থায়ী হওয়ার প্রবণতার চিত্র উঠে এসেছে। জরিপ অনুযায়ী, তিজুয়ানা এলাকায় সাক্ষাৎকার দেওয়া অভিবাসীদের ৪৫ শতাংশ মেক্সিকোকেই নিজেদের আবাস হিসেবে বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রে থাকা বন্ধুদের দুর্ভোগের কথা

যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছানো ভেনেজুয়েলীয় বন্ধুদের দুর্ভোগের কথা উল্লেখ করে মায়া বলেন, তাঁদের মতো উদ্বেগের মধ্যে থাকতে হচ্ছে না বলে তিনি কৃতজ্ঞ।

তিনি জানান, তাঁর বন্ধুদের অনেককে বাড়ির ভেতরে অবস্থান করতে হচ্ছে। তাঁদের কেউ কেউ বহিষ্কারের অপেক্ষায় না থেকে নিজেরাই যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে যাওয়ার কথা ভাবছেন।

মায়ার ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁদের কেউ কেউ বলছেন, ‘আমাকে বহিষ্কার করার আগেই আমি নিজের ইচ্ছায় চলে যেতে চাই।’

অভিবাসীদের আশ্রয়কেন্দ্রও কমছে

একসময় অভিবাসীদের ভিড়ে উপচে পড়া তিজুয়ানার আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর অনেকগুলো এখন বন্ধ হয়ে গেছে। অন্যগুলোও সীমিত সামর্থ্য নিয়ে চালু রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের সুযোগ সংকুচিত হওয়া এবং অভিবাসীদের গন্তব্য পরিবর্তনের মধ্যে তিজুয়ানার পরিস্থিতিও বদলে যাচ্ছে। একসময় যে শহরকে অনেকে যুক্তরাষ্ট্রে নতুন জীবন শুরুর সিঁড়ি হিসেবে দেখতেন, সেই শহরই এখন অনেকের কাছে স্থায়ী আবাস ও জীবিকা গড়ার জায়গা হয়ে উঠছে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন