ইরানের মধ্যস্থতায় তেহরানে গোপন বৈঠকের দাবি ইসরায়েলি গণমাধ্যমের, অর্থ হস্তান্তরের তথ্য নিশ্চিত করেনি সৌদি কর্তৃপক্ষ
ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি চুক্তির অংশ হিসেবে ১ বিলিয়ন ডলার দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে সৌদি আরব। বিনিময়ে সৌদি ভূখণ্ডে সব ধরনের হামলা বন্ধ করতে হবে হুথিদের। ইরানের মধ্যস্থতায় এ বিষয়ে তেহরানে গোপন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে দাবি করেছে ইসরায়েলি গণমাধ্যম। ভারতীয় বার্তা সংস্থা এএনআইয়ের এক প্রতিবেদনে উপসাগরীয় অঞ্চলের কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রস্তাবিত চুক্তির আওতায় ইরানের মাধ্যমে হুথিদের কাছে অর্থ হস্তান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে অর্থ দেওয়ার প্রস্তাব এবং বিমানে করে তেহরানে অর্থ নিয়ে যাওয়ার দাবির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। সৌদি আরবের এক কর্মকর্তাও ইসরায়েলি গণমাধ্যমের কাছে অর্থ হস্তান্তরের বিষয়টি নিশ্চিত করেননি।
তেহরানে গোপন বৈঠকে সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী
ইসরায়েলি গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুথিদের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে তেহরানে আয়োজিত একটি গোপন বৈঠকে অংশ নেন সৌদি আরবের প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রিন্স খালিদ বিন সালমান। একটি কূটনৈতিক সূত্রের দাবি, তিনি ‘হারকিউলিস’ সামরিক পরিবহন বিমানে তেহরানে পৌঁছান এবং ওই বিমানেই প্রস্তাবিত অর্থ নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।
তবে সৌদি কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে অর্থ বহন বা হস্তান্তরের বিষয়ে কোনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে আলোচনায় অর্থ দেওয়ার প্রস্তাব থাকলেও বাস্তবে অর্থ স্থানান্তর হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, তেহরানের বহুপক্ষীয় আলোচনায় তুরস্কের গোয়েন্দাপ্রধান ইব্রাহিম কালিন এবং পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরও অংশ নেন। ইরানের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের মহাসচিব মোহসেন রেজাই এবং ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) শীর্ষ কর্মকর্তারা।
হামলা বন্ধের বিনিময়ে অর্থ দেওয়ার প্রস্তাব
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি আরবের বিভিন্ন বিমানবন্দর ও তেল স্থাপনায় হুথিদের ধারাবাহিক হামলায় দেশটির অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল। এমন পরিস্থিতিতে সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যে মধ্যস্থতার প্রস্তাব দেয় তেহরান।
একই সময়ে হরমুজ প্রণালিতে ইরানি ট্যাংকারে হামলার ঘটনায় উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল রপ্তানিও বিঘ্নিত হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও জ্বালানি সরবরাহের ওপর চাপের মধ্যে কূটনৈতিক উদ্যোগটি সামনে আসে।
সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রীর তেহরান সফর নিয়ে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, চলমান সংকটে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে উত্তেজনা কমানো, সংলাপ ও কূটনৈতিক সমাধান উৎসাহিত করা এবং কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতার প্রচেষ্টাকে সমর্থন করার জন্য এই সফর বৃহত্তর উদ্যোগের অংশ।
আগের সমঝোতা বাস্তবায়ন নিয়ে বিরোধ
অর্থ দেওয়ার তথ্য নিশ্চিত না করলেও সৌদি আরবের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, হুথিদের সঙ্গে প্রায় তিন বছর আগে হওয়া একটি সমঝোতা বাস্তবায়ন নিয়েই মূলত বিরোধ তৈরি হয়েছে।
ওই সমঝোতা অনুযায়ী, বিরোধ নিষ্পত্তির অংশ হিসেবে হুথি-নিয়ন্ত্রিত এলাকায় সরকারি কর্মচারীদের বকেয়া বেতন পরিশোধ এবং অবকাঠামো পুনর্গঠনে সৌদি আরবের সরাসরি আর্থিক সহায়তা দেওয়ার কথা ছিল। বিনিময়ে হুথিদের যুদ্ধবিরতি বজায় রাখার কথা ছিল।
তবে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে হুথিরা অভিযোগ করেছে, রিয়াদ আগের সমঝোতা থেকে সরে এসেছে। এই অভিযোগ তুলে তারা আবারও সৌদি আরবে হামলার হুঁশিয়ারি দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে সৌদি আরবের অবস্থান হলো, কোনো ধরনের ‘সামরিক ব্ল্যাকমেইলের’ মুখে তারা নতুন যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে যাবে না। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের কাছ থেকে দখল করা ভূখণ্ড হুথিরা ফিরিয়ে না দেওয়া পর্যন্ত তাদের অর্থ ছাড়েরও বিরোধিতা করছে রিয়াদ।
আঞ্চলিক কূটনীতিতে ইরানের ভূমিকা
ইসরায়েলি গণমাধ্যমের দাবি, তেহরানের এই বৈঠকের মধ্য দিয়ে ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা জোটের’ প্রতিনিধিদের সঙ্গে ইরানের নেতৃত্বের প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর আগের সপ্তাহে পাকিস্তানের সেনাপ্রধানের তেহরান সফরের সময় এ উদ্যোগের সূচনা হয় বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
প্রতিবেদনটির ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের সামরিক হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করে মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের প্রধান কূটনৈতিক মধ্যস্থতাকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে ইরান। তবে বৈঠকের ফলাফল, যুদ্ধবিরতির শর্ত এবং অর্থ দেওয়ার প্রস্তাবের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের পূর্ণাঙ্গ বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
হুথিদের সঙ্গে সম্ভাব্য সমঝোতা বাস্তবায়িত হলে তা সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং ইয়েমেনের দীর্ঘদিনের সংঘাত নিরসনের প্রচেষ্টায় প্রভাব ফেলতে পারে। তবে ১ বিলিয়ন ডলার দেওয়ার প্রস্তাব ও অর্থ পরিবহনের দাবির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই না হওয়ায় বিষয়গুলোকে আপাতত গণমাধ্যমে প্রকাশিত দাবি হিসেবেই বিবেচনা করতে হচ্ছে।

