মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬

ইন্দোনেশিয়ায় দাবানলের বিষাক্ত ধোঁয়ায় বিপর্যস্ত জনজীবন, শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণে আক্রান্ত ৩ লাখ

নয় মাসে পুড়েছে ১৯ লাখ হেক্টরের বেশি বন ও ভূমি; ধোঁয়ায় অসুস্থদের চিকিৎসায় প্রায় ৫০০ কেন্দ্র চালু

ইন্দোনেশিয়ার বোর্নিও দ্বীপের পালাংকারায়া শহরে চারদিকে হলুদাভ ধোঁয়া, বাতাসে পোড়া গন্ধ। দূষিত বাতাসে শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে স্থানীয় বাসিন্দাদের। মাসের পর মাস ধরে চলা দাবানলে ছড়িয়ে পড়া বিষাক্ত ধোঁয়ায় অসুস্থ হয়ে পড়ছেন মানুষ। পরিস্থিতির প্রভাব পড়ছে প্রতিবেশী দেশগুলোতেও।

বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্য কালিমান্তান প্রদেশের পালাংকারায়া শহরের বাসিন্দা ৫৭ বছর বয়সী সুদারসোনো দাবানলের ধোঁয়ায় অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তাঁকে বাড়ি থেকে সরিয়ে নেওয়ার সময় অক্সিজেন সিলিন্ডারের সাহায্যে শ্বাস নিতে হচ্ছিল।

পেশায় নির্মাণশ্রমিক ও কৃষক সুদারসোনো কয়েক দিন আগে তিন বন্ধুর সঙ্গে আগুন নেভাতে গিয়েছিলেন। কিন্তু আগুনের ধোঁয়ায় নিজেই অসুস্থ হয়ে পড়েন। গত সপ্তাহে হাসপাতালে নেওয়ার জন্য অ্যাম্বুলেন্সে তোলার সময় তিনি এএফপিকে বলেন, মাস্ক ও সুরক্ষাচশমা পরাসহ সব ধরনের সতর্কতা নেওয়ার পরও চারদিক থেকে ধোঁয়া তাঁকে ঘিরে ধরেছিল। শেষ পর্যন্ত আর সহ্য করতে না পেরে বাড়ি ফিরে আসেন তিনি।

দাবানলে তাঁর বাড়ির পেছনের উঠান পুড়ে কালো হয়ে গেছে। সেখানে পড়ে রয়েছে পোড়া গাছের গুঁড়ি, আর বাতাসে ছড়িয়ে আছে পোড়া গন্ধ।

অ্যাম্বুলেন্সে ওঠার আগে সুদারসোনো আশা প্রকাশ করেন, ধোঁয়াশা কেটে যাবে এবং মধ্য কালিমান্তান আগুনমুক্ত হবে। এতে মানুষ আবার নিরাপদে কাজ করতে ও জীবিকা নির্বাহ করতে পারবে।

শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণে আক্রান্ত তিন লাখের বেশি মানুষ

মাসের পর মাস ধরে চলা দাবানল ও বিষাক্ত ধোঁয়ায় ইন্দোনেশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে স্বাস্থ্যসংকট তৈরি হয়েছে। দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্ট থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সাতটি প্রদেশে তিন লাখের বেশি মানুষ শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণে আক্রান্ত হয়েছেন। পালাংকারায়া শহরেই এ সংকটের মধ্যে ১১ হাজারের বেশি মানুষ শ্বাসতন্ত্রের সমস্যায় চিকিৎসা নিয়েছেন।

পালাংকারায়ার একটি আশ্রয়কেন্দ্রে শ্বাসকষ্ট ও মাথাব্যথার চিকিৎসা নিচ্ছিলেন আলেক্সান্দ্রা সুরিয়া হাবসারি। তাঁকে নেবুলাইজার ও অক্সিজেন দেওয়া হয়। নেবুলাইজারের মাধ্যমে ওষুধকে সূক্ষ্ম কণায় পরিণত করে শ্বাসের সঙ্গে ফুসফুসে পৌঁছাতে সহায়তা করা হয়।

এএফপিকে আলেক্সান্দ্রা বলেন, পরিস্থিতি তাঁকে চরমভাবে অতিষ্ঠ করে তুলেছে। তবে কার ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করবেন, তা বুঝতে পারছেন না। তাঁর ভাষ্য, পরিস্থিতি মানুষের সহ্যসীমা ছাড়িয়ে গেছে।

বাতাসে ক্ষতিকর রাসায়নিক ও অতি সূক্ষ্ম কণা

দাবানলের ধোঁয়ায় ফরমালডিহাইড, হাইড্রোজেন সায়ানাইড ও অ্যামোনিয়ার মতো ক্ষতিকর রাসায়নিক থাকতে পারে। এ ছাড়া ধোঁয়ায় রয়েছে পিএম২.৫ নামে পরিচিত অতি সূক্ষ্ম বস্তুকণা, যা ফুসফুসের গভীরে প্রবেশ করতে পারে এবং রক্তপ্রবাহেও পৌঁছাতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, পিএম২.৫-এর সংস্পর্শে এলে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে এবং মৃত্যুঝুঁকিও বৃদ্ধি পেতে পারে।

নয় মাসে পুড়েছে ১৯ লাখ হেক্টরের বেশি বন ও ভূমি

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তম দেশ ইন্দোনেশিয়া কয়েক মাস ধরে দাবানল নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছে। বন উজাড় পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা নুসান্তারা অ্যাটলাসের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নয় মাসে দেশটিতে ১৯ লাখ হেক্টরের বেশি বন ও ভূমি দাবানলে পুড়ে গেছে।

তবে ইন্দোনেশিয়ার সরকার এ হিসাবের সত্যতা নিশ্চিত করেনি, আবার তা নাকচও করেনি।

দাবানলের ধোঁয়ায় দূষিত বাতাসে শ্বাস নিতে বাধ্য হওয়া প্রতিবেশী দেশগুলোর পক্ষ থেকে কূটনৈতিক পর্যায়ে আপত্তি জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের ভেতরেও পরিস্থিতি নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে। বিভিন্ন স্থানে বিক্ষিপ্ত সরকারবিরোধী বিক্ষোভেও এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।

দেশজুড়ে প্রায় ৫০০ চিকিৎসাকেন্দ্র

ধোঁয়াশার কারণে অসুস্থ হয়ে পড়া মানুষের চিকিৎসায় ইন্দোনেশিয়ার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় দেশজুড়ে প্রায় ৫০০টি কেন্দ্র স্থাপন করেছে। এসব কেন্দ্রে বিনা মূল্যে অক্সিজেন ও ধোঁয়াজনিত অসুস্থতার চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

এর মধ্যে প্রায় ৩০০টি কেন্দ্র রয়েছে মধ্য কালিমান্তান প্রদেশে, যেখানে দাবানল ও ধোঁয়াশার প্রকোপ বিশেষভাবে তীব্র।

এ ছাড়া পালাংকারায়ার বিভিন্ন এলাকায় অক্সিজেন সিলিন্ডারসহ বাস মোতায়েন করেছে স্থানীয় প্রশাসন। এসব বাসে মানুষকে বিনা মূল্যে শ্বাসকষ্টের চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।

এ সেবা নেওয়া ব্যক্তিদের একজন সিতি জুমিয়াতি। দীর্ঘদিন ধরে চোখ লাল হয়ে জ্বালাপোড়া করা, গলাব্যথা ও কাশির সমস্যায় ভুগছেন তিনি। গত শনিবার এএফপিকে সিতি বলেন, ওই বাসে তিনি বিনা মূল্যে শ্বাস নিতে সহায়তা পাচ্ছেন।

জীবিকার তাগিদে বিষাক্ত বাতাসেই কাজ

স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তা রিদুয়ান বলেন, শ্বাসতন্ত্রের সমস্যায় সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন ১৭ থেকে ৫৯ বছর বয়সী মানুষ। জীবিকার প্রয়োজনে তাঁদের বিষাক্ত ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন বাতাসের মধ্যেও কাজের জন্য বাইরে বের হতে হচ্ছে।

৪৩ বছর বয়সী আলেক্সান্দ্রা জানান, প্রতিদিন অফিসে যাতায়াতের মাত্র ২০ মিনিটের পথও এখন তাঁর জন্য অসহনীয় হয়ে উঠেছে।

এএফপিকে তিনি বলেন, মানুষের নীল আকাশ দেখা, নির্মল অক্সিজেন নেওয়া, সূর্যের আলো উপভোগ করা এবং বিশুদ্ধ বাতাসে শ্বাস নেওয়ার কথা। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে তাঁরা যা শ্বাসের সঙ্গে নিচ্ছেন, তা বিষের মতো।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন