বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬

আফগানিস্তানে ফিরেছেন ৬০ লাখের বেশি মানুষ, কাজ-বাসস্থানের সংকটে স্থানীয়রাও

প্রত্যাবাসনে বাড়ছে জীবিকা ও পানির সংকট

ইরান ও পাকিস্তান থেকে গত তিন বছরের কিছু বেশি সময়ে ৬০ লাখেরও বেশি আফগান দেশে ফিরেছেন। কয়েক দশক ধরে সংঘাতের কারণে প্রতিবেশী দেশ দুটিতে আশ্রয় নেওয়া এসব মানুষকে সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাপক বহিষ্কার অভিযানের মুখে দেশে ফিরতে হয়েছে। কিন্তু ফিরে আসা মানুষের চাপে আফগানিস্তানের বিভিন্ন এলাকায় কাজ, বাসস্থান ও পানির সংকট আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। সংকটের প্রভাব পড়ছে আগে থেকেই দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করা স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবনেও।

বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, আফগানিস্তানের উত্তরাঞ্চলীয় জওজজান প্রদেশে ফিরে আসা মানুষ ও স্থানীয় বাসিন্দা—উভয় পক্ষই জীবিকা নির্বাহের জন্য কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন।

কাজের বাজারে বাড়ছে প্রতিযোগিতা

জওজজান প্রদেশের রাজধানী শেবেরঘানে প্রতিদিনের মতো কাজের সন্ধানে রাস্তার পাশে জড়ো হয়েছেন শ্রমিকেরা। তাঁদের একজন ৮৩ বছর বয়সী গুলাম সাখি বারাত। সাতজন স্বজনের ভরণপোষণের দায়িত্ব তাঁর কাঁধে।

বারাতের ভাষায়, দেশে ফিরে আসা মানুষের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।

তিনি বলেন, ‘মানুষ না খেয়ে থাকছে। দেশে ফিরে আসা মানুষদের কারণে স্থানীয় বাসিন্দাদের কাজের সুযোগ কমে গেছে। যারা নতুন করে ফিরেছে, তাদের সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু যারা আগে থেকেই এখানে বসবাস করছে, তারা কোনো সহায়তা পাচ্ছে না।’

ইরান ও পাকিস্তান সীমান্ত থেকে কয়েকশ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত জওজজান প্রদেশেও বিপুলসংখ্যক আফগান ফিরে এসেছেন। তাঁদের কেউ আগে ওই এলাকায় বসবাস করতেন, আবার কারও পরিবারের সদস্যরা বহু বছর আগে সেখান থেকে চলে গিয়েছিলেন।

পাকিস্তান থেকে ফিরে সন্তানদের আবর্জনা সংগ্রহের কাজ

৬০ বছর বয়সী আবদুল কাদের হোটাক দুই দশক পাকিস্তানে কাটিয়ে জওজজানে ফিরেছেন। সেখানে তাঁর পরিবারের কোনো জমি বা নিজস্ব বাড়ি নেই। আট মাস আগে পাকিস্তান থেকে বহিষ্কৃত হয়ে দেশে ফেরার পর তাঁর সন্তানদের জীবনও বদলে গেছে।

হোটাক বলেন, ‘পাকিস্তানে আমার সন্তানরা স্কুলে যেত, পড়াশোনা করত। এখন তাদের সবাইকে কিছু আয় করার জন্য আবর্জনা সংগ্রহ করতে হচ্ছে।’

শিক্ষাজীবন ছেড়ে সন্তানদের উপার্জনের পথে নামতে হওয়ায় ফিরে আসা পরিবারগুলোর সংকটের আরেকটি দিক সামনে এসেছে।

পানি ও বাসস্থানের সংকট আরও তীব্র

জওজজান প্রদেশের আকচা এলাকায় বিপুলসংখ্যক মানুষের প্রত্যাবর্তনের কারণে জনসংখ্যা ২৬ শতাংশের বেশি বাড়তে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে জাতিসংঘ। খরাপীড়িত এই এলাকায় মানুষের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে পানির সংকটও গুরুতর হয়ে উঠছে।

৫৪ বছর বয়সী রাজমিস্ত্রি ফকির মোহাম্মদ খুদাবখশ গত দুই দশক ধরে কাজের সন্ধানে ইরানে যাওয়া-আসা করেছেন। কিন্তু এখন সপ্তাহে মাত্র তিন দিন কাজ পান তিনি।

শেবেরঘানে অন্য শ্রমিকদের সঙ্গে কাজের অপেক্ষায় থাকা খুদাবখশ বলেন, ‘যারা আফগানিস্তানে ফিরে এসেছে, তাদের প্রত্যেকেরই থাকার জন্য একটি জায়গা ও কাজ দরকার। কিন্তু তাদের কোনোটিই নেই।’

তিনি আরও বলেন, ‘খাবার ও পোশাক কেনার পেছনে অর্থ ব্যয় করার পরিবর্তে আমাদের বাড়িভাড়া দিতে হচ্ছে। দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, আমরা অপুষ্টিতে ভুগছি।’

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, আফগানিস্তানে প্রায় এক কোটি ৫৯ লাখ মানুষ—দেশটির প্রতি তিনজনের প্রায় একজন—খাদ্যসংকটের গুরুতর ঝুঁকিতে রয়েছেন। তাঁদের খাদ্যনিরাপত্তা পরিস্থিতি সংকটজনক বা তার চেয়েও ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে।

বাসস্থান নিয়েও প্রতিযোগিতা বাড়ছে। এএফপির সঙ্গে কথা বলা স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কোনো কোনো এলাকায় বাড়িভাড়া সর্বোচ্চ ১৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।

সরকারের দাবি, বেকারত্বের সমস্যা নেই

জওজজান প্রদেশের তথ্য অধিদপ্তরের পরিচালক সাইফুদ্দিন মুত্তাসেমের দাবি, স্থানীয় বাসিন্দা কিংবা দেশে ফিরে আসা মানুষদের নিয়ে সমাধানহীন কোনো সমস্যা নেই।

আফগানিস্তানে বেকার মানুষ নেই দাবি করে তিনি বলেন, ‘কেউ যদি কাজ না করে, তাহলে বুঝতে হবে সে নিজের আরাম-আয়েশের প্রতি বেশি আসক্ত এবং তিনি কাজ করতে চান না।’

বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ এবং অযৌক্তিক ভাড়া বৃদ্ধি ঠেকাতে সরকার দেশব্যাপী একটি কমিটি গঠন করেছে বলেও জানান তিনি।

তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ৩০ বছর বয়সী এক সরকারি কর্মকর্তা এএফপিকে জানিয়েছেন, এমন কোনো কমিটির কথা তিনি কখনো শোনেননি। গত ১৮ মাসে তাঁর বাড়িভাড়া দ্বিগুণ হয়েছে।

নিরাপত্তাজনিত কারণে শুধু আহমাদি নামে পরিচয় দেওয়া ওই কর্মকর্তা বলেন, দেশে ফিরে আসা মানুষের সংখ্যা বাড়ার পর অর্থনৈতিক সমস্যা আরও বেড়েছে।

দীর্ঘমেয়াদি সহায়তার আহ্বান জাতিসংঘের

গত সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সতর্ক করে বলেছিল, দেশে ফিরে আসা মানুষ এবং তাঁদের আশ্রয় দেওয়া স্থানীয় জনগোষ্ঠী—উভয়ের জন্যই দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা অত্যন্ত জরুরি।

আফগানিস্তানে জাতিসংঘের সহায়তা মিশনের উপপ্রধান জর্জেট গ্যানন বলেন, ‘সীমিত সম্পদের জন্য প্রতিযোগিতা মানুষের মধ্যে অসন্তোষ বাড়াতে পারে, আরও বেশি মানুষকে বাস্তুচ্যুত করতে পারে এবং অস্থিতিশীলতা উসকে দিতে পারে।’

জাতিসংঘের এই সতর্কবার্তায় ফিরে আসা মানুষদের পুনর্বাসনের পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর প্রয়োজন মেটানোর বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।

দীর্ঘস্থায়ী খরায় পরিস্থিতি আরও জটিল

জওজজান প্রদেশে দীর্ঘস্থায়ী খরা পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে। ধুলাবালিতে আচ্ছন্ন পরিবেশ, মাটির তৈরি গম্বুজাকৃতির ঘরবাড়ি আর চরে বেড়ানো উটের মধ্যেই জীবিকা ও পানির জন্য লড়াই করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

প্রদেশটির তথ্য অধিদপ্তরের পরিচালক মুত্তাসেম জানান, সেখানকার অধিকাংশ পানি এখন পান করা কিংবা কৃষিকাজে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি বদলাতে একটি খাল নির্মাণ প্রকল্পের ওপর আশা রাখছেন তাঁরা। তবে প্রকল্পটির কাজ শেষ হতে আরও দুই বছর লাগতে পারে।

মুত্তাসেম বলেন, ‘আফগানিস্তানের মানুষ ক্ষুধা কিংবা তৃষ্ণায় মারা যাচ্ছে না—তবে তাদের আশ্রয়ের ভীষণ প্রয়োজন।’

তিনি আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে প্রদেশটিতে ফিরে আসা মানুষের জন্য ঘরবাড়ি নির্মাণে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।

সবশেষে তিনি বলেন, ‘বাকি বিষয়গুলোর ব্যবস্থা আল্লাহ নিশ্চয়ই করবেন।’


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন