১ হাজার ৬৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৫৩২ মিটার দীর্ঘ সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা; ২০৩১ সালের মধ্যে চালুর লক্ষ্য, কমবে তিন জেলার মানুষের ফেরি পারাপারের দুর্ভোগ।
খরস্রোতা কর্ণফুলী নদীর ওপর নির্মিত হতে যাচ্ছে দেশের প্রথম চার লেনের ক্যাবল-স্টেইড সেতু। রাঙামাটির কাপ্তাই ও চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার সংযোগস্থলে চন্দ্রঘোনা-রাইখালী ফেরিঘাট এলাকায় সেতুটি নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তর। ১ হাজার ৬৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৫৩২ মিটার দীর্ঘ সেতুটি নির্মিত হলে রাঙামাটি, চট্টগ্রাম ও বান্দরবান জেলার মানুষের দীর্ঘদিনের ফেরি পারাপারের ভোগান্তি কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত হওয়ার পাশাপাশি পর্যটন, কৃষিপণ্য পরিবহন ও ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও স্থানীয় বাসিন্দারা।
চার লেনের সেতুতে থাকবে আধুনিক প্রযুক্তি
সওজ রাঙামাটির নির্বাহী প্রকৌশলী সবুজ চাকমা বাসসকে জানান, স্টিল ও কংক্রিটের সমন্বয়ে নির্মিতব্য সেতুটির মূল অংশের দৈর্ঘ্য হবে ৫৩২ মিটার। এর সঙ্গে থাকবে ৪৫৫ মিটার ভায়াডাক্ট এবং ১ হাজার ২৫০ মিটারের বেশি দীর্ঘ এলিভেটেড সড়ক।
চার লেনের এ সেতুতে যুক্ত করা হবে আধুনিক ‘ব্রিজ স্মার্ট হেলথ মনিটরিং সিস্টেম’। এর মাধ্যমে সেতুর কাঠামোগত অবস্থা ও স্থায়িত্ব নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হবে। এ ছাড়া থাকবে স্বয়ংক্রিয় টোল প্লাজা।
সেতুটি রাঙামাটি-বান্দরবান আঞ্চলিক মহাসড়কের (আর-১৬১) ২১তম কিলোমিটারে নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এ জন্য ৭ দশমিক ৫২ হেক্টর জমি অধিগ্রহণে ২৩৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
কীভাবে কাজ করবে ক্যাবল-স্টেইড সেতু
ক্যাবল-স্টেইড সেতুতে উঁচু পাইলন বা টাওয়ারের সঙ্গে যুক্ত শক্তিশালী ইস্পাতের তির্যক তারের মাধ্যমে সেতুর চলাচলের পথের ভার বহন করা হয়। টাওয়ার, তার ও সেতুর ডেক একসঙ্গে কাঠামোর ভার সামলায়।
সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী সবুজ চাকমা বলেন, এ ধরনের সেতুতে নদীর মাঝখানে পিলার নির্মাণের প্রয়োজন হয় না। ফলে বড় স্প্যান তৈরি করা সম্ভব হয় এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও নৌযান চলাচলে বাধা তুলনামূলকভাবে কম থাকে।
আধুনিক এ নকশায় নির্মিত সেতু বিশ্বের বিভিন্ন দেশে স্থাপত্য ও পর্যটন আকর্ষণের অংশ হিসেবেও পরিচিত।
প্রকল্প প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে, একনেকের অনুমোদন বাকি
সওজ সূত্র জানায়, সেতুর চূড়ান্ত নকশা তৈরি করে প্রকল্প প্রস্তাব বা ডিপিপি সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগে পাঠানো হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির সভাও অনুষ্ঠিত হয়েছে। এখন ডিপিপি পুনর্গঠন করে আবার পাঠাতে হবে। এরপর চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় উপস্থাপন করা হবে।
প্রকল্পটির নির্মাণকাজ ২০৩১ সালের মধ্যে শেষ করে যান চলাচলের জন্য সেতুটি খুলে দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
৩৭ বছর ধরে ফেরির ওপর নির্ভরতা
সওজ সূত্র জানায়, রাঙামাটির সঙ্গে রাজস্থলী ও বান্দরবান জেলার যোগাযোগ সহজ করতে ১৯৮৯ সালে রাঙামাটি সড়ক ও জনপথ বিভাগের অধীনে কর্ণফুলী নদীর চন্দ্রঘোনায় ফেরি সার্ভিস চালু করা হয়। প্রায় ৩৭ বছর পরও একটি ফেরির মাধ্যমেই দুই পাড়ের যানবাহন পারাপার করা হচ্ছে।
পন্টুনের সমস্যা, ডুবোচর এবং নদীর তীব্র স্রোতের কারণে প্রায়ই ফেরি চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। নদীতে পানির প্রবাহ বেড়ে গেলে, কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের বাঁধের গেট খুলে দিলে কিংবা পানি কমে গেলেও ফেরি চলাচলে বিঘ্ন ঘটে।
নির্বাহী প্রকৌশলী সবুজ চাকমা জানান, বর্তমানে একবারে ফেরিতে মাত্র ৮ থেকে ১০টি ট্রাক বা বাস এবং ১৫ থেকে ২০টি ছোট ও হালকা যানবাহন পারাপার করা যায়। একবার নদী পার হতে আধা ঘণ্টা, কখনো এক ঘণ্টারও বেশি সময় লাগে।
দৈনিক হাজারের কাছাকাছি যানবাহন পারাপার
চন্দ্রঘোনার ব্যবসায়ী ফরিদ আহমদ বলেন, চন্দ্রঘোনা ফেরি দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৯০০ থেকে ১ হাজার ছোট-বড় যানবাহন পারাপার হয়। তবে ফেরির কারণে নিয়মিত ভোগান্তিতে পড়তে হয় যাত্রী ও চালকদের। অনেকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ছোট ছোট সাম্পানে নদী পার হন।
তিনি বলেন, রাঙামাটি, চট্টগ্রাম ও বান্দরবান জেলার কয়েক লাখ মানুষ এ ফেরির ওপর নির্ভরশীল। স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি পর্যটকদের জন্যও তিন পার্বত্য জেলা ঘুরে কক্সবাজার যাওয়ার এ পথটি জনপ্রিয়।
জরুরি রোগী ও অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে উদ্বেগ
কাপ্তাইয়ের রাইখালী ইউনিয়নের বাসিন্দা থোয়াই অং মারমা বলেন, ফেরি অচল থাকলে এলাকার মানুষের চলাচলও থেমে যায়। দুই-তিন মিনিটের পথ পাড়ি দিতে ৪৫ মিনিট থেকে এক ঘণ্টা, কখনো তারও বেশি সময় লাগে।
তিনি বলেন, সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকেন জরুরি রোগীরা। রাত-বিরাতে অ্যাম্বুলেন্সকেও ফেরির জন্য অপেক্ষা করতে হয়। অথচ সেতু থাকলে কয়েক মিনিটেই নদী পার হওয়া সম্ভব হতো।
কৃষিপণ্য পরিবহন ও ব্যবসায় গতি আসার আশা
রাইখালী বাজারের ব্যবসায়ী তনয় তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, ফেরির কারণে পাহাড়ি এলাকার কৃষিপণ্য সময়মতো বাজারে পৌঁছানো যায় না। অনেক সময় ফেরি বিকল হয়ে মাঝনদীতে আটকে পড়ে। সেতু নির্মিত হলে বান্দরবান ও রাঙামাটির সঙ্গে তাঁদের ব্যবসা-বাণিজ্যে বড় পরিবর্তন আসবে বলে আশা করেন তিনি।
ট্রাকচালক রহিম উদ্দিন বলেন, প্রতিদিন ইট পরিবহনের কাজে তাঁকে এ ফেরি পার হতে হয়। কখনো এক ঘণ্টায় নদী পার হওয়া যায়, আবার কখনো দীর্ঘ যানজটে বসে থাকতে হয়। সেতু চালু হলে সময়ের অপচয় ও জীবনের ঝুঁকি—দুটিই কমবে বলে মনে করেন তিনি।
পর্যটন ও আঞ্চলিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাবের প্রত্যাশা
সওজের উপসহকারী প্রকৌশলী কীর্তি নিশান চাকমা বলেন, সেতুটি শুধু যাতায়াত সহজ করবে না, রাঙামাটি ও বান্দরবানের পর্যটনশিল্পের বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
তিনি বলেন, দুই পার্বত্য জেলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে কেন্দ্র করে পর্যটনশিল্পের বিকাশে এ সেতু মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে।
কাপ্তাই উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান দিলদার হোসেন বলেন, চন্দ্রঘোনায় সেতু নির্মাণ এ অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে কৃষিপণ্য পরিবহন সহজ হবে এবং দুই জেলার আর্থসামাজিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটবে।
রাজস্থলী উপজেলা বিএনপির সভাপতি মাস্টার খলিলুর রহমান শেখ বলেন, সেতুটি নির্মিত হলে পার্বত্য বান্দরবান, রাজস্থলী, চন্দ্রঘোনা, রাইখালী, রাঙ্গুনিয়া ও কাপ্তাই এলাকার মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়নের সুযোগ তৈরি হবে।
দীর্ঘদিনের ফেরিনির্ভরতা কাটিয়ে সেতুটি চালু হলে আঞ্চলিক যোগাযোগ, জরুরি স্বাস্থ্যসেবা, কৃষিপণ্য পরিবহন ও পর্যটনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে বলে আশা করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

