বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬

টেকসই উন্নয়ন ও জলবায়ু মোকাবিলায় বাংলাদেশের পাশে থাকবে জার্মানি

জলবায়ু, জ্বালানি ও অর্থনৈতিক সংস্কারে সহযোগিতা জোরদারের অঙ্গীকার

বাংলাদেশের সঙ্গে নির্ভরযোগ্য ও দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্ব বজায় রাখতে জার্মানি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে জানিয়েছেন দেশটির অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়নবিষয়ক উপমন্ত্রী ড. বারবেল কোফলার। টেকসই উন্নয়ন, জলবায়ু সহনশীলতা এবং অভিন্ন অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দুই দেশের সহযোগিতা আরও জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।

মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ঢাকায় ফ্রাঙ্কো-জার্মান দূতাবাসে জার্মান পুনঃএকত্রীকরণ দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় তিনি বলেন, ‘আমরা দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের পাশে থাকতে এসেছি।’

দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারে গুরুত্ব

জার্মান রাষ্ট্রদূত ড. রুডিগার লোৎজ ও ইভানা লোৎজ আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু। এতে বাংলাদেশ ও জার্মানির জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তা, কূটনীতিক, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এবং সাংস্কৃতিক ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বরা অংশ নেন।

কোফলার বলেন, পরিবেশ সুরক্ষা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সামাজিক অগ্রগতির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে উন্নয়ন এগিয়ে নিতে জার্মানি বাংলাদেশের সরকার ও ইউরোপীয় অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করতে চায়।

দুই দেশের দীর্ঘদিনের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, জার্মানির উন্নয়ন সহযোগিতা বাংলাদেশের সরকার, বেসরকারি খাত ও নাগরিক সমাজের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে আসছে। প্রতিকূল ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেও এই অংশীদারিত্বের উল্লেখযোগ্য সাফল্য রয়েছে।

বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রগতির প্রশংসা করে কোফলার বলেন, ‘বাংলাদেশের জনগণ প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নে অসাধারণ অগ্রগতি অর্জন করেছেন।’

জলবায়ু ও জ্বালানি খাতে সহযোগিতা

জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় ‘গ্লোবাল শিল্ড এগেইনস্ট ক্লাইমেট রিস্কস’ উদ্যোগ, জলবায়ু অভিযোজন এবং জ্বালানি খাতে সহযোগিতাকে দুই দেশের যৌথ প্রচেষ্টার গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন জার্মান উপমন্ত্রী।

জীবাশ্ম জ্বালানিমুক্ত ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেন, এ রূপান্তর প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তুলতে এবং ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে সৃষ্ট বিঘ্নের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে।

বিশ্বজুড়ে সংঘাত জ্বালানি সরবরাহ, মূল্য এবং খাদ্যনিরাপত্তার ওপর প্রভাব ফেলছে উল্লেখ করে কোফলার বলেন, এসব পরিস্থিতি টেকসই উন্নয়নের পথে এগিয়ে যেতে দেশগুলোর পারস্পরিক সহযোগিতার গুরুত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে।

তিনি স্বীকার করেন, খাদ্য ও জ্বালানির ক্রমবর্ধমান দাম বাংলাদেশের পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। জার্মানিও একই ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে বলে জানান তিনি।

কোফলার বলেন, ‘আমি জার্মানির প্রতিনিধিত্ব করে এখানে এসেছি শুধু এসব চ্যালেঞ্জের কথা স্বীকার করতে নয়, বরং কীভাবে আমরা একসঙ্গে এগুলো মোকাবিলা করতে পারি, তা নিয়ে আলোচনা করতে।’

দেশের সীমানা ছাড়িয়ে যাওয়া চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশ, জার্মানি ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের অংশীদারদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ও সহযোগিতা অপরিহার্য বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর ভাষায়, ‘আমরা ঐক্যবদ্ধ থাকলেই কেবল বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জগুলো অতিক্রম করতে পারব।’

এলডিসি উত্তরণ ও সংস্কারের ধারাবাহিকতা

বাংলাদেশের আসন্ন স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) শ্রেণি থেকে উত্তরণে অভিনন্দন জানিয়ে কোফলার বলেন, এ প্রক্রিয়া টেকসই করতে অর্থনৈতিক, আর্থিক, সামাজিক ও পরিবেশগত সংস্কারের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, এলডিসি উত্তরণ এবং ইউরোপের সঙ্গে সম্ভাব্য মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনার সঙ্গে চলমান সংস্কার কার্যক্রমের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। সামনে থাকা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশ ও ইউরোপীয় অংশীদারদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা প্রয়োজন হবে।

কোফলার আরও বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন, ডিজিটালাইজেশন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো বিষয়গুলোর পাশাপাশি মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং তরুণদের জন্য উন্নত ভবিষ্যতের সুযোগ তৈরি করাও গুরুত্বপূর্ণ।

তরুণদের কর্মসংস্থান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা

বাংলাদেশের প্রতি জার্মানির অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে কোফলার বলেন, বাংলাদেশের নির্ভরযোগ্য বন্ধু হিসেবে পাশে থাকা জার্মানি ও ইউরোপের দায়িত্ব। অভিন্ন লক্ষ্য অর্জনের পথে যেসব জটিলতা রয়েছে, সেগুলো নিয়ে খোলামেলা আলোচনার আহ্বান জানান তিনি।

তাঁর মতে, অংশীদাররা একসঙ্গে কাজ করলে বিদ্যমান বাধাগুলো অতিক্রম করা সম্ভব। বিশেষ করে টেকসই উন্নয়ন, কর্মসংস্থান এবং তরুণদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে যৌথ উদ্যোগের প্রয়োজন রয়েছে।

তিন দিনের সফরে বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে বৈঠক

বাংলাদেশে তৃতীয়বারের মতো সফররত কোফলার জানান, তিন দিনের সফরে তিনি নাগরিক সমাজ ও শ্রমিক সংগঠনের প্রতিনিধি, উদ্যোক্তা, সরকারি মন্ত্রী এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।

এসব মতবিনিময়ের মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষ, দেশের বাস্তবতা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে জনগণের আকাঙ্ক্ষা সম্পর্কে আরও ভালোভাবে জানার সুযোগ হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

জার্মান ঐক্য দিবসের তাৎপর্য

১৯৯০ সালে পূর্ব ও পশ্চিম জার্মানির পুনঃএকত্রীকরণের স্মরণে পালিত জার্মান ঐক্য দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরে কোফলার বলেন, এ দিবস শান্তি, সংহতি ও বিভাজন অতিক্রমের প্রতীক। বাংলাদেশের সঙ্গে সহযোগিতার ক্ষেত্রেও এসব মূল্যবোধ গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন