মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬

বন্ধুত্বকে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে রূপ দিতে চায় বাংলাদেশ-জাপান

জ্বালানি, আইসিটি, রেলপথ, অবকাঠামো ও গভীর সমুদ্রবন্দর খাতে সহযোগিতা বাড়াতে সম্মত ঢাকা-টোকিও; দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠকে একাধিক সমঝোতা স্মারক বিনিময়।

বাংলাদেশ ও জাপানের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও যৌথ সমৃদ্ধির চালিকাশক্তিতে রূপ দেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ লক্ষ্য অর্জনে জাপানি বিনিয়োগকারী, ব্যবসায়ী ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাংলাদেশে বিনিয়োগের সুযোগ অনুসন্ধানের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) টোকিওতে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠক শেষে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ আহ্বান জানান।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, জ্বালানি, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি), রেলপথ, অবকাঠামো, গভীর সমুদ্রবন্দর এবং প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের (এফডিআই) মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে সহযোগিতা বাড়িয়ে দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিতে চায় বাংলাদেশ।

বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গুরুত্ব

যৌথ সংবাদ সম্মেলনে তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশ ও জাপানের অংশীদারত্ব কয়েক দশকের বন্ধুত্ব, আস্থা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে। এই সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ এসেছে উল্লেখ করে তিনি বাংলাদেশের উন্নয়নের পরবর্তী ধাপে জাপানি অংশীদারদের যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানান।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, উৎপাদনশীল বিনিয়োগ, প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং পারস্পরিকভাবে লাভজনক ব্যবসায়িক উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে তাঁর সরকার জাপানি অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

তিনি আশা প্রকাশ করেন, দুই দেশ একসঙ্গে কাজ করলে উভয় দেশের জনগণের জন্য আরও সহনশীল ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

গুরুত্বপূর্ণ খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর অঙ্গীকার

দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে জ্বালানি, আইসিটি, রেলপথ ও অবকাঠামো উন্নয়ন, গভীর সমুদ্রবন্দর এবং এফডিআইসহ বিভিন্ন খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়ে আলোচনা হয়। উভয় দেশ এসব ক্ষেত্রে অভিন্ন অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।

সফরকালে বাংলাদেশ ও জাপান গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি ক্ষেত্রে একাধিক সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) বিনিময় করেছে। দুই দেশের আলোচনার ফলাফল ও অভিন্ন অগ্রাধিকারগুলো একটি যৌথ বিবৃতিতে তুলে ধরা হবে বলেও সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।

দুই দেশের নেতারা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের পাশাপাশি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন। এ সময় দীর্ঘদিনের অংশীদারত্ব আরও জোরদার করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন তাঁরা।

বাংলাদেশের উন্নয়নে জাপানের অবদানের স্বীকৃতি

বাংলাদেশের উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে জাপানের দীর্ঘদিনের ভূমিকার কথা স্মরণ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে জাপানের একটি বিশেষ স্থান রয়েছে। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, আস্থা এবং শান্তি, সমৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতার অভিন্ন লক্ষ্য দুই দেশের বন্ধুত্বকে শক্তিশালী করেছে।

তারেক রহমান বলেন, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর প্রথম দিকেই স্বীকৃতি প্রদানকারী দেশগুলোর অন্যতম ছিল জাপান। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশটি বাংলাদেশের অন্যতম মূল্যবান উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে আর্থসামাজিক অগ্রগতি ও অবকাঠামো উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে।

দীর্ঘস্থায়ী এই বন্ধুত্বের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দুই দেশের সম্পর্ককে অর্থনৈতিক সুযোগ ও অভিন্ন সমৃদ্ধির শক্তিশালী চালিকাশক্তিতে রূপান্তর করাই তাঁদের লক্ষ্য।

জাপান সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, দুই দেশের জনগণের কল্যাণে কাজ করবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য স্থায়ী উত্তরাধিকার রেখে যাবে—এমন একটি অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে হবে।

কান্তেইয়ে উষ্ণ অভ্যর্থনা, গার্ড অব অনার

এর আগে মঙ্গলবার বেলা ১১টা ৩২ মিনিটে টোকিওতে জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় কান্তেইয়ে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সেখানে তাঁকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি। এ সময় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়।

পরে দুই নেতা দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠকে বসেন। বৈঠকের আগে তাঁরা নিজ নিজ প্রতিনিধিদলের সদস্যদের পরিচয় করিয়ে দেন। বৈঠক শেষে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে দুই দেশের সম্পর্ক, বিনিয়োগ এবং ভবিষ্যৎ সহযোগিতার বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়।

সরকারি সফরে উষ্ণ অভ্যর্থনা ও আন্তরিক আতিথেয়তার জন্য জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি এবং দেশটির জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তারেক রহমান।

চার দিনের সফরে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক

জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে সোমবার চার দিনের সরকারি সফরে টোকিও পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। নারিতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তাঁকে স্বাগত জানান জাপানের পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইয়াসুতাকা নাকাসোনে।

সফরের প্রথম দিন জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী তারো আসোর নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের সংসদীয় প্রতিনিধিদল, মারুবেনি করপোরেশনের চেয়ারম্যান মাসুমি কাকিনোকি এবং জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) প্রেসিডেন্ট ড. আকিহিকো তানাকার সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন তিনি।

চলতি বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণের পর এটি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের তৃতীয় বিদেশ সফর। এর আগে তিনি মালয়েশিয়া ও চীন সফর করেন। এ ছাড়া গত সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্ক সফর করেন প্রধানমন্ত্রী।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন