মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬

ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় আসছে আরও ৪১ লাখ পরিবার, তৈরি হচ্ছে সমন্বিত তথ্যভাণ্ডার

দেশের দরিদ্র ও অস্বচ্ছল পরিবারগুলোকে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় আনতে পরিবারভিত্তিক সমন্বিত তথ্যভাণ্ডার গড়ে তুলছে সরকার। এ তথ্যভাণ্ডারের মাধ্যমে পরিবারের আর্থ-সামাজিক অবস্থা যাচাই করে প্রকৃত দরিদ্র পরিবার শনাক্ত করা এবং তাদের ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ধীরে ধীরে ফ্যামিলি কার্ডকে সমন্বিত সামাজিক নিবন্ধন ও অর্থপ্রদানের ব্যবস্থায় রূপ দেওয়া হবে। এর মাধ্যমে বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে একই তথ্যভিত্তি ব্যবহার, উপকারভোগী নির্বাচন আরও নির্ভুল করা এবং সরাসরি আর্থিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

চলতি বছর পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের আওতায় ৭০ হাজার ৮৬১টি পরিবার ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে আর্থিক সহায়তা পেয়েছে। এ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে নতুন করে ৪১ লাখ পরিবারকে কর্মসূচির আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। গত ১০ অক্টোবর থেকে সারাদেশে পর্যায়ক্রমে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ ও কর্মসূচি সম্প্রসারণের কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাকে (বাসস) বলেন, ফ্যামিলি কার্ডের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে তথ্যভিত্তিকভাবে প্রকৃত দরিদ্র ও অস্বচ্ছল পরিবারগুলোকে চিহ্নিত করা। সামাজিক নিরাপত্তার সুবিধা যেন যোগ্য পরিবারের কাছে পৌঁছায় এবং বাদ পড়া দরিদ্র পরিবারগুলোকেও যেন শনাক্ত করা যায়, সে লক্ষ্যেই উদ্যোগটি নেওয়া হয়েছে।

তিনি জানান, পরিবারের আয়, সম্পদ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান ও জীবিকার তথ্য বিবেচনায় নিয়ে উপকারভোগী নির্বাচন করা হবে। পরিবারের আর্থ-সামাজিক অবস্থার পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তথ্যভাণ্ডার নিয়মিত হালনাগাদ করা হবে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, পরিবারের সদস্যসংখ্যা, আয়, সম্পদ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান, কর্মসংস্থান ও জীবিকাসহ বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করে একটি গতিশীল সামাজিক নিবন্ধনভাণ্ডার তৈরি করা হবে। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে পরিবারের আর্থিক সক্ষমতা ও দারিদ্র্যের মাত্রা নির্ধারণ করা হবে। এরপর নির্ধারিত মানদণ্ড অনুযায়ী ফ্যামিলি কার্ডের উপকারভোগী নির্বাচন করা হবে।

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ আবু ইউছুফ বাসসকে বলেন, ফ্যামিলি কার্ডকে শুধু ভাতা বিতরণের কর্মসূচি হিসেবে দেখলে হবে না। এটিকে একটি সমন্বিত সামাজিক নিবন্ধনব্যবস্থা হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এর ফলে সরকারের বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে একই তথ্যভিত্তি ব্যবহার করা সম্ভব হবে।

তিনি আরও জানান, তথ্য সংগ্রহের পর তা স্থির রাখা হবে না। পরিবারের আর্থ-সামাজিক অবস্থার পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিয়মিত তথ্য হালনাগাদ করা হবে।

ফ্যামিলি কার্ডের জন্য সরাসরি বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হবে। এ কাজে নিয়োজিত কর্মীরা ট্যাবলেট কম্পিউটারের মাধ্যমে পরিবারের সদস্য ও আর্থ-সামাজিক অবস্থাসংক্রান্ত তথ্য ডিজিটাল পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করবেন।

ইন্টারনেট সংযোগ না থাকলেও অফলাইনে তথ্য সংগ্রহ করা যাবে। পরে নেটওয়ার্ক পাওয়া গেলে সংগৃহীত তথ্য কেন্দ্রীয় তথ্যভাণ্ডারে পাঠানো হবে।

মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম কেন্দ্রীয়ভাবে পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থাও রাখা হচ্ছে। তথ্য সংগ্রহকারীরা নির্ধারিত এলাকায় গিয়ে কাজ করছেন কি না, তা অবস্থানভিত্তিক প্রযুক্তির মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করা হবে।

সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) শাহ মোহাম্মদ মাহ্বুব বাসসকে বলেন, তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ের নির্ভুলতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্য তথ্য সংগ্রহকারীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে এবং সংগৃহীত তথ্য যাচাইয়ের ব্যবস্থা থাকবে।

তিনি জানান, পরীক্ষামূলক কার্যক্রমে কিছু বাস্তব সমস্যা চিহ্নিত হয়েছে। জাতীয় পর্যায়ে কর্মসূচি সম্প্রসারণের আগে সেগুলো সমাধানে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

ফ্যামিলি কার্ডের উপকারভোগী নির্বাচনে রাজনৈতিক পরিচয় বা ব্যক্তিগত সুপারিশের পরিবর্তে পরিবারের প্রকৃত আর্থ-সামাজিক অবস্থাকে গুরুত্ব দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। মাঠপর্যায়ে সংগৃহীত তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের পর আয়, সম্পদ, জীবনযাত্রা ও অন্যান্য সূচকের ভিত্তিতে যোগ্যতা নির্ধারণ করা হবে।

প্রকৃত দরিদ্র পরিবার শনাক্ত করতে সম্পদ ও আর্থিক সক্ষমতা যাচাই পদ্ধতি বা প্রক্সি মিনস টেস্ট (পিএমটি) ব্যবহার করা হচ্ছে। এ পদ্ধতিতে পরিবারের আয়-ব্যয়, সম্পদ, বাসস্থান ও জীবনযাত্রার বিভিন্ন সূচকের ভিত্তিতে একটি স্কোর নির্ধারণ করা হবে। সেই স্কোরের মাধ্যমে পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতা মূল্যায়ন করে উপকারভোগী নির্বাচনে সহায়তা নেওয়া হবে।

পরীক্ষামূলক কার্যক্রমে ভাতা প্রদানের ক্ষেত্রে কয়েকটি সমস্যা চিহ্নিত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যের ভুল, নিজ নামে মোবাইল নম্বর না থাকা এবং ব্যাংক বা মোবাইল আর্থিক হিসাবসংক্রান্ত জটিলতা।

জাতীয় পর্যায়ে কর্মসূচি সম্প্রসারণের আগে এসব সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, তথ্য যাচাই ও আর্থিক হিসাবের সঠিকতা নিশ্চিত করা গেলে উপকারভোগী শনাক্তকরণ এবং অর্থ বিতরণের প্রক্রিয়া আরও কার্যকর হবে।

ফ্যামিলি কার্ডকে ভবিষ্যতে শুধু ভাতা গ্রহণের মাধ্যম হিসেবে সীমাবদ্ধ রাখতে চায় না সরকার। ব্যাংক ও ডিজিটাল আর্থিক সেবার সঙ্গে এ ব্যবস্থাকে যুক্ত করে সরাসরি উপকারভোগীর কাছে সরকারি অর্থ পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

এতে মধ্যস্বত্বভোগীর সুযোগ কমানো এবং অর্থপ্রদানে স্বচ্ছতা বাড়ানো সম্ভব হবে বলে মনে করছে সরকার। একই সঙ্গে ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে দেওয়া সহায়তা পরিবারের খাদ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা, বাসস্থান ও জীবিকার ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলছে, তা মূল্যায়নের পরিকল্পনাও রয়েছে।

ভবিষ্যতে প্রভাব সমীক্ষার মাধ্যমে কর্মসূচির কার্যকারিতা পর্যালোচনা করা হবে। এর মাধ্যমে সহায়তা যথাযথ পরিবারের কাছে পৌঁছাচ্ছে কি না এবং কর্মসূচির কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাচ্ছে কি না, তা মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে।

সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে জাতীয় পর্যায়ে ফ্যামিলি কার্ড কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় উপকারভোগী শনাক্তকরণ, তথ্য ব্যবস্থাপনা ও অর্থপ্রদানের ক্ষেত্রে পরিবর্তন আসতে পারে।

পরিবারভিত্তিক সমন্বিত তথ্যভাণ্ডার গড়ে উঠলে ভবিষ্যতে বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির জন্য একই তথ্য ব্যবহার করা সম্ভব হবে। এতে যোগ্য পরিবার নির্বাচন, তথ্য হালনাগাদ এবং সরকারি সহায়তা বণ্টনের প্রক্রিয়া আরও সমন্বিত করার সুযোগ তৈরি হবে।

তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ৪১ লাখ পরিবারকে কর্মসূচির আওতায় আনা, মাঠপর্যায়ের তথ্যের নির্ভুলতা নিশ্চিত করা এবং অর্থপ্রদানের জটিলতা দূর করাই হবে এ উদ্যোগ বাস্তবায়নের গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন