দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে উত্তেজনার মধ্যে পূর্ব উপকূল থেকে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ল পিয়ংইয়ং; সামরিক আলোচনার প্রস্তাবে এখনো সাড়া দেয়নি উত্তর কোরিয়া
উত্তর কোরিয়া বৃহস্পতিবার দেশটির পূর্ব উপকূল থেকে প্রায় এক ডজন স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনী এ তথ্য জানিয়েছে। দুই দেশের সীমান্ত নিয়ে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যে সিউল সামরিক পর্যায়ে আলোচনার প্রস্তাব দেওয়ার এক সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে এ ঘটনা ঘটল।
দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউল থেকে বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
ওনসান থেকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ শনাক্ত
দক্ষিণ কোরিয়ার জয়েন্ট চিফস অব স্টাফ (জেসিএস) জানায়, উত্তর কোরিয়ার ওনসান এলাকা থেকে পূর্ব সাগরের দিকে প্রায় এক ডজন স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ শনাক্ত করেছে তাদের সামরিক বাহিনী। পূর্ব সাগর জাপান সাগর নামেও পরিচিত।
জেসিএসের বিবৃতিতে বলা হয়, সম্ভাব্য আরও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের বিষয়ে সামরিক বাহিনী নজরদারি ও সতর্কতা জোরদার করেছে।
অন্যদিকে, জাপানের কোস্টগার্ড জানায়, উত্তর কোরিয়া থেকে নিক্ষেপ করা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র বলে ধারণা করা হচ্ছে—এমন একটি বস্তু সাগরে পড়ে গেছে বলে মনে হচ্ছে। এ বিষয়ে সতর্ক থাকতে জাহাজগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
একের পর এক অস্ত্রের পরীক্ষা উত্তর কোরিয়ার
সাম্প্রতিক সময়ে উত্তর কোরিয়া ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন ধরনের অস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নতুন নির্ভুল লক্ষ্যভেদী টর্পেডো ব্যবস্থা এবং মধ্যপাল্লার হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র। এসব অস্ত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে বলে দাবি করেছে দেশটি।
বিশ্লেষকদের কাছে উত্তর কোরিয়ার ধারাবাহিক অস্ত্র পরীক্ষা এবং দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সীমান্ত উত্তেজনা আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগের বিষয়।
স্থলমাইন বিস্ফোরণে দক্ষিণ কোরিয়ার তিন সেনা আহত
দুই কোরিয়ার মধ্যবর্তী কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত স্থলসীমান্তে স্থলমাইন বিস্ফোরণে দক্ষিণ কোরিয়ার তিন সেনা আহত হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা আরও বেড়েছে।
চলতি মাসের শুরুর দিকে সিউল ও জাতিসংঘের যৌথ তদন্তে বলা হয়, উত্তর কোরিয়া এক বছরেরও বেশি সময় আগে ওই স্থলমাইনগুলো পুঁতে রেখেছিল। দক্ষিণ কোরিয়া ঘটনাটিকে ‘যুদ্ধবিরতি চুক্তির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন’ বলে আখ্যা দিয়েছে। একই সঙ্গে পিয়ংইয়ংকে আবারও সংলাপে ফেরার আহ্বান জানিয়েছে সিউল।
সামরিক আলোচনার প্রস্তাবে সাড়া দেয়নি পিয়ংইয়ং
গত সপ্তাহে দক্ষিণ কোরিয়া উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সামরিক আলোচনা শুরুর প্রস্তাব দেয়। দুই দেশের সীমান্তের সুনির্দিষ্ট অবস্থান পারস্পরিকভাবে নিশ্চিত করা এবং যোগাযোগের চ্যানেল পুনরায় চালুর বিষয়ে আলোচনা করাই ছিল এ উদ্যোগের উদ্দেশ্য।
তবে পিয়ংইয়ং এখনো প্রস্তাবটিতে সাড়া দেয়নি। বরং দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ংয়ের আলোচনার প্রস্তাবকে উপহাস করেছে উত্তর কোরিয়া। দেশটির নেতা কিম জং উনের প্রভাবশালী বোন কিম ইয়ো জং এ উদ্যোগকে ‘প্রহসনের চূড়ান্ত পর্যায়’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।
দুই কোরিয়ার মধ্যবর্তী অসামরিকীকৃত অঞ্চল (ডিএমজেড) বিশ্বের অন্যতম কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত সীমান্ত হিসেবে পরিচিত। এর আগে ওই এলাকায় স্থলমাইন বিস্ফোরণের ঘটনাগুলোও দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বাড়িয়েছে।
যুদ্ধবিরতির পরও আনুষ্ঠানিক শান্তিচুক্তি হয়নি
দক্ষিণ কোরিয়া ও উত্তর কোরিয়া এখনো কার্যত যুদ্ধাবস্থায় রয়েছে। ১৯৫৩ সালে কোরীয় যুদ্ধের অবসান ঘটে যুদ্ধবিরতি চুক্তির মাধ্যমে; দুই দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিক শান্তিচুক্তি হয়নি। ফলে সীমান্তে সামরিক তৎপরতা ও যেকোনো সংঘাতের ঘটনা আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
ট্রাম্প-কিম বৈঠক নিয়ে নতুন অনিশ্চয়তা
এদিকে, উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক যোগাযোগের উদ্যোগও নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। সম্ভাব্য পারমাণবিক আলোচনা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দক্ষিণ কোরিয়া বাদ পড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
সর্বশেষ মন্তব্যে ট্রাম্প উত্তর কোরিয়ার নেতার সঙ্গে শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠকের সম্ভাবনাকে কিছুটা খাটো করে দেখিয়েছেন বলে মনে হয়েছে। তবে কিম জং উনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ‘খুব ভালো’ বলে জোর দিয়ে উল্লেখ করেছেন তিনি।
এর আগে, অক্টোবরে ট্রাম্প চলতি বছর কিমের সঙ্গে বৈঠক হতে পারে বলে ইঙ্গিত দেওয়ার এক দিন পর উত্তর কোরিয়া কয়েকটি স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছিল।

