প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি আনার নির্দেশ প্রতিমন্ত্রীর; সারা দেশের ওয়াসা থেকে বোর্ড তুলে নিতে আইন সংশোধনের সিদ্ধান্ত
ঢাকা ওয়াসার চলমান প্রকল্পগুলোতে আগামী দুই মাসের মধ্যে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হলে সংশ্লিষ্ট প্রকল্প পরিচালকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। ব্যর্থ কর্মকর্তাদের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, কোনো প্রকল্প অনুমোদনের পর তা বাস্তবায়নে বছরের পর বছর সময়ক্ষেপণ গ্রহণযোগ্য নয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নিতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।
আজ সকালে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে ঢাকা ওয়াসা ভবনে সংস্থাটির সার্বিক কার্যক্রম নিয়ে আয়োজিত পর্যালোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
চলমান প্রকল্প দ্রুত শেষ করার নির্দেশ
ঢাকা ওয়াসার চলমান প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করার নির্দেশ দিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, দাসেরকান্দি স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট থেকে গুলশান, বনানী ও বারিধারা এলাকায় পাইপলাইন সংযোগের প্রকল্প দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে। পাশাপাশি পূর্বাচল এলাকায় পানি সরবরাহ নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে দ্রুত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) প্রণয়নের নির্দেশ দেন তিনি।
প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতার বিষয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে মীর শাহে আলম বলেন, গত সাত মাসে ওয়াসার কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য নতুন উদ্যোগ বা প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রত্যাশিত গতি দেখা যায়নি। অথচ নগরীতে জনসংখ্যা ও বাসাবাড়ির সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পানির চাহিদাও বাড়ছে।
ওয়াসা থেকে বোর্ড তুলে নিতে আইন সংশোধনের সিদ্ধান্ত
প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রচলিত আইনে ওয়াসায় বোর্ড রাখার বিধান থাকলেও সরকার যেকোনো সময় তা গঠন বা ভেঙে দিতে পারে। মন্ত্রণালয়ের পর্যালোচনায় দেখা গেছে, অনেক ক্ষেত্রে ওয়াসা বোর্ডগুলো জনসেবামূলক এ খাতের কাজে বাধা সৃষ্টি করছে কিংবা অপ্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপের মাধ্যমে কার্যক্রমের গতি কমিয়ে দিচ্ছে।
এ পরিস্থিতিতে আইন সংশোধন করে সারা দেশের সব ওয়াসা থেকে বোর্ড তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার বলে জানান তিনি।
পানির চাহিদা ও সরবরাহ দৈনিক ৩১৪ কোটি লিটার
প্রতিমন্ত্রী জানান, ঢাকা মহানগরীতে বর্তমানে দৈনিক পানির চাহিদা ও সরবরাহ—দুটিই ৩১৪ কোটি লিটার। তবে নগরীর জনসংখ্যা ও বাসাবাড়ি বাড়তে থাকায় ভবিষ্যতে পানির চাহিদা আরও বাড়বে।
পানির সংকট তৈরি হলে এর দায় সরকারের ওপরই বর্তায় উল্লেখ করে তিনি নগরবাসীর পানির চাহিদা পূরণে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেন।
ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমানোর তাগিদ
বর্তমানে ঢাকা ওয়াসার সরবরাহ করা পানির ৭৪ শতাংশ আসে ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে এবং ২৬ শতাংশ আসে উপরিভাগের উৎস থেকে। ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে তা ২০ থেকে ২৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণের কথা জানান প্রতিমন্ত্রী।
এ লক্ষ্য অর্জনে উপরিভাগের পানিনির্ভর প্রকল্পগুলোর কাজ দ্রুত শেষ করার নির্দেশ দেন তিনি। ভূমিকম্পের ঝুঁকি কমানোর লক্ষ্যেও ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন কমানোর ওপর গুরুত্ব দেন প্রতিমন্ত্রী।
রাজস্ব বাড়ানো ও সেবায় অটোমেশনের নির্দেশ
ওয়াসার অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও আধুনিকায়ন প্রসঙ্গে মীর শাহে আলম বলেন, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে সেবার মান বজায় রেখেই নিজস্ব রাজস্ব আয় বাড়াতে হবে। এতে বিদেশি ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব তহবিল থেকে জনকল্যাণমূলক প্রকল্প বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।
তিনি মিটার রিডিং ও বিলিং ব্যবস্থায় অটোমেশন কার্যক্রম জোরদারের নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে ২০৫০ সালের সম্ভাব্য পানির চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে ঢাকা ওয়াসার আধুনিকায়নের জন্য নতুন ও পূর্ণাঙ্গ জনবল কাঠামো বা অর্গানোগ্রাম তৈরি করে অনুমোদনের জন্য মন্ত্রণালয়ে জমা দিতে বলেন।
অবৈধ পানির সংযোগ ও রাজনৈতিক প্রভাব বন্ধের নির্দেশ
শহরের অবৈধ ও চোরাই পানির সংযোগ চিহ্নিত করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন প্রতিমন্ত্রী। এসব কর্মকাণ্ডে প্রভাবশালী ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দুর্বৃত্তরা জড়িত থাকলে তাঁদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নিতে বলেন তিনি।
সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠানে দলীয় বা রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে সাধারণ মানুষের সেবা ব্যাহত করা যাবে না উল্লেখ করে সিবিএ ও কর্মচারী সংগঠনগুলোকেও সতর্ক করেন তিনি।
পাশাপাশি ব্রাশ বা শেভ করার সময় অপ্রয়োজনে পানির কল খোলা না রাখা এবং পানির অপচয় রোধে জনসচেতনতামূলক প্রচার চালানোর নির্দেশ দেন প্রতিমন্ত্রী।
দুই মাস পর আবারও কার্যক্রম পর্যালোচনা
মীর শাহে আলম বলেন, আগামী দুই মাস পর তিনি আবারও ঢাকা ওয়াসার কার্যক্রম পর্যালোচনা করবেন। এর মধ্যে সংস্থাটির কাজে দৃশ্যমান ও আমূল পরিবর্তন দেখতে চান তিনি, যাতে নগরবাসী পানির বিষয়ে স্বস্তি পান।
ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মুহা. মনিরুজ্জামানের সভাপতিত্বে সভায় সংস্থাটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, প্রকৌশলী সমিতি, ডিপ্লোমা অ্যাসোসিয়েশন, সিবিএর নেতৃবৃন্দসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মীরা অংশ নেন।

