শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬

লাইসেন্স ছাড়া চলবে না ই-রিকশা, নিবন্ধনের মেয়াদ ৫ বছর

রাজধানী ঢাকাসহ দেশের সব সিটি করপোরেশন এলাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশা বা ই-রিকশা চলাচলে শৃঙ্খলা ফেরাতে নতুন নীতিমালা প্রকাশ করেছে সরকার। নতুন বিধান অনুযায়ী, নিবন্ধন ও লাইসেন্স ছাড়া কোনো ই-রিকশা সড়কে চলাচল করতে পারবে না। প্রতিটি ই-রিকশার জন্য কিউআর কোডযুক্ত স্বতন্ত্র নিবন্ধন নম্বর ও নির্ধারিত নম্বর প্লেট বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। নিবন্ধনের মেয়াদ হবে পাঁচ বছর।

বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে ‘ই-রিকশা চলাচল ও ব্যবস্থাপনা নীতিমালা’ প্রকাশ করা হয়। স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন, ২০০৯-এর ১২০ ধারায় দেওয়া ক্ষমতাবলে প্রণীত এ বিধিমালা দেশের সব সিটি করপোরেশন এলাকায় চলাচলকারী ই-রিকশার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে।

নিবন্ধন ও ফিটনেসে নতুন শর্ত

নীতিমালা অনুযায়ী, ই-রিকশা নিবন্ধনের জন্য নির্ধারিত ফি ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করতে হবে। আবেদন ও জমা দেওয়া কাগজপত্র যাচাইয়ের পাশাপাশি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) নির্ধারিত প্রযুক্তিগত মানদণ্ড এবং নিরাপত্তাবৈশিষ্ট্য পরীক্ষা করা হবে। সবকিছু সন্তোষজনক হলে আবেদন পাওয়ার ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে নিবন্ধন দিতে হবে।

প্রতিটি নিবন্ধিত ই-রিকশার জন্য কিউআর কোডযুক্ত স্বতন্ত্র নিবন্ধন নম্বর ও নম্বর প্লেট দেওয়া হবে। নিবন্ধন নম্বরটি গাড়ির দৃশ্যমান স্থানে প্রদর্শন করতে হবে। একটি জাতীয় পরিচয়পত্রের বিপরীতে যেকোনো এক বা একাধিক সিটি করপোরেশন থেকে সর্বোচ্চ পাঁচটি ই-রিকশার নিবন্ধন নেওয়া যাবে। তবে এক সিটি করপোরেশনে নিবন্ধিত ই-রিকশা অন্য সিটি করপোরেশন এলাকায় বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে চালানো যাবে না।

কোনো আবেদন নামঞ্জুর হলে সাত কার্যদিবসের মধ্যে লিখিতভাবে কারণ জানাতে হবে। এ সিদ্ধান্তে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি আদেশ পাওয়ার ১০ কার্যদিবসের মধ্যে কর্তৃপক্ষের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আপিল করতে পারবেন। আপিলের বিষয়ে কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে।

ই-রিকশার নকশা ও কাঠামো বুয়েটের নির্ধারিত প্রযুক্তিগত মানদণ্ড এবং নিরাপত্তাবৈশিষ্ট্য অনুযায়ী হতে হবে। নিবন্ধন বা নবায়নের জন্য ফিটনেস সার্টিফিকেটের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ট্রাফিক বিভাগের প্রতিস্বাক্ষর বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ফিটনেস সনদ প্রদানকারী ও প্রতিস্বাক্ষরকারী প্রতিষ্ঠানকে নিবন্ধনের রেকর্ড সংরক্ষণ করতে হবে।

১২ বছর পর বাতিল হবে নিবন্ধন

নীতিমালায় প্রতিটি ই-রিকশার অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল নিবন্ধনের তারিখ থেকে ১২ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। এ সময় শেষ হলে নম্বর প্লেটসহ সংশ্লিষ্ট ই-রিকশার নিবন্ধন বাতিল করতে হবে। প্রতিটি গাড়িতে স্পিডোমিটার বা ওডোমিটার স্থাপনও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

যান্ত্রিক বা নিরাপত্তাগত ত্রুটিযুক্ত এবং নিবন্ধনবিহীন ই-রিকশা সড়কে চালানো যাবে না। কোনো গাড়িতে ত্রুটি দেখা দিলে সামনের দৃশ্যমান স্থানে ‘যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে চলাচল অযোগ্য’ লেখা সাইনবোর্ড প্রদর্শন করে দ্রুত মেরামতের ব্যবস্থা করতে হবে।

বর্তমানে সড়কে চলাচলকারী ই-রিকশাগুলোও বুয়েটের নির্ধারিত প্রযুক্তিগত মানদণ্ড ও নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট নকশা অনুযায়ী কাঠামোগত সংশোধন করে অনুমোদন নিতে পারবে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ট্রাফিক বিভাগের প্রতিস্বাক্ষরসহ ফিটনেস সার্টিফিকেট নিতে হবে। পর্যায়ক্রমে ই-রিকশাগুলোকে বিমার আওতায় আনার কথাও বলা হয়েছে।

মহাসড়ক ও প্রধান সড়কে চলাচল নিষিদ্ধ

নতুন বিধিমালা অনুযায়ী, ই-রিকশা জাতীয় মহাসড়ক, এক্সপ্রেসওয়ে, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, প্রধান বাস চলাচলের সড়ক বা করিডোর এবং প্রশাসনের নিষিদ্ধ করা সড়কে চলতে পারবে না। ফুটপাতেও ই-রিকশা চালানো যাবে না।

চালকদের সব সময় সড়কের বাম লেন অনুসরণ করতে হবে। গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার, নিয়মবহির্ভূত ওভারটেকিং এবং লেন পরিবর্তন নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

ই-রিকশায় চালক ছাড়া গাড়ির আকারভেদে সর্বোচ্চ দুই বা চারজন যাত্রী পরিবহন করা যাবে। যাত্রীদের হাতে বহনযোগ্য মালামাল ছাড়া অন্য কোনো বাণিজ্যিক পণ্য বহন করা যাবে না। গাড়িতে ৪০ ডেসিবেলের বেশি শব্দের হর্ন ব্যবহার করা যাবে না। স্কুল, হাসপাতাল, ধর্মীয় উপাসনালয় ও জনবহুল এলাকায় সর্বোচ্চ ঘণ্টায় ১৫ কিলোমিটার গতিতে ই-রিকশা চালানোর বিধান রাখা হয়েছে।

জোনভিত্তিক রুট ও পার্কিং ব্যবস্থা

ই-রিকশা চলাচলের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও ট্রাফিক বিভাগ যৌথভাবে রুট নির্ধারণ করবে। সিটি করপোরেশন এলাকায় জোনভিত্তিক রুট চালু করা হবে। এক জোনে নিবন্ধিত ই-রিকশা অন্য জোনে চলাচল করতে পারবে না।

এ জন্য সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশন ও ট্রাফিক বিভাগ যৌথভাবে জোনের সীমানা, প্রতিটি জোনে ই-রিকশার সংখ্যা, চলাচলের রুট এবং গাড়ির নির্দিষ্ট রং চূড়ান্ত করবে। পাশাপাশি ট্রাফিক বিভাগের সঙ্গে পরামর্শ করে প্রতিটি ওয়ার্ড বা উপযুক্ত স্থানে প্রয়োজনীয় সংখ্যক পার্কিং এলাকা নির্ধারণ করবে কর্তৃপক্ষ।

চালকদের ট্রাফিক আইন, সড়ক নিরাপত্তা, ব্যাটারি ও ই-রিকশার রক্ষণাবেক্ষণসহ আনুষঙ্গিক বিষয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রাখার কথাও বলা হয়েছে। কর্তৃপক্ষের স্বীকৃত প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এ প্রশিক্ষণ দেওয়া যাবে।

নিয়ন্ত্রিত চার্জিং ও সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার

ই-রিকশার ব্যাটারি চার্জ করতে হলে কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ও সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশনের লাইসেন্সপ্রাপ্ত চার্জিং পয়েন্ট বা নির্দিষ্ট গ্যারেজ ব্যবহার করতে হবে। এসব চার্জিং পয়েন্ট ও গ্যারেজে নবায়নযোগ্য জ্বালানি বা সৌরশক্তি ব্যবহারের ব্যবস্থা রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব, বেসরকারি খাত বা অন্য উপযুক্ত প্রক্রিয়ায় অনুমোদিত চার্জিং স্টেশন, গ্যারেজ ও ব্যাটারি বিনিময় কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেবে কর্তৃপক্ষ। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট ট্রাফিক বিভাগের সঙ্গে পরামর্শ করতে হবে।

চার্জিং স্টেশনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে এবং অনিয়ন্ত্রিত ও নিয়মবহির্ভূত চার্জিং বন্ধে উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে শুধু বৈধভাবে নিবন্ধিত চার্জিং স্টেশনেই ই-রিকশার ব্যাটারি চার্জ করা যাবে। এসব স্টেশনে নেট মিটারিং ব্যবস্থার মাধ্যমে গ্রিডের সঙ্গে সৌরবিদ্যুৎ সংযোগ স্থাপনের বিধান রাখা হয়েছে। এর ফলে দিনের বেলায় সৌরবিদ্যুৎ গ্রিডে সরবরাহ করে রাতে গ্রিডের বিদ্যুৎ ব্যবহার করে ব্যাটারি চার্জ করা সম্ভব হবে।

চার্জিং স্টেশন স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমোদন নিতে হবে। অবৈধভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহার করে ব্যাটারি চার্জ করলে সংশ্লিষ্ট প্রচলিত আইনে শাস্তির বিধান কার্যকর হবে।

ঋণ সহায়তা ও পরিবেশ সুরক্ষার বিধান

নীতিমালায় ই-রিকশা উৎপাদন ও সহায়ক অবকাঠামো নির্মাণে অর্থায়নের সুযোগ রাখা হয়েছে। সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা, তফসিলি ব্যাংক এবং ফাইন্যান্স কোম্পানি অনুমোদিত মানের ই-রিকশা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ও অবকাঠামো নির্মাণে চালক ও মালিকদের ঋণ সহায়তা দিতে পারবে।

ই-রিকশা উৎপাদন, আমদানি, ব্যবহার এবং ব্যাটারি পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ ও ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫-এর অধীনে প্রণীত বিধিমালা ও জারি করা নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে।

এ ছাড়া পুরোনো বা অকার্যকর ব্যাটারি কিংবা এর কোনো অংশ খোলা জায়গা, মাটি, জলাশয় বা সাধারণ বর্জ্যে ফেলা বা পোড়ানো যাবে না।

আইন প্রয়োগে যৌথ উদ্যোগ

ই-রিকশার চলাচল নিয়ন্ত্রণ ও বিধিমালা বাস্তবায়নে মেট্রোপলিটন এলাকার ট্রাফিক বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট যৌথভাবে বা পৃথকভাবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারবেন। অবৈধ, নিবন্ধনবিহীন ও নিয়মবহির্ভূত ই-রিকশা চলাচল বন্ধে তাঁদের ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা থাকবে।

নতুন নীতিমালার মাধ্যমে ই-রিকশার নিবন্ধন, ফিটনেস, রুট, গতি, যাত্রী পরিবহন, পার্কিং এবং চার্জিং ব্যবস্থাকে একটি নিয়মের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর বাস্তবায়ন কতটা কার্যকরভাবে হয়, তার ওপরই সিটি করপোরেশন এলাকায় ই-রিকশা চলাচলে শৃঙ্খলা ফেরানোর উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন