ইন্টারনেটে তথ্য অনুসন্ধানের প্রচলিত পদ্ধতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)। কয়েকটি শব্দ লিখে ওয়েবসাইটের তালিকা খোঁজার পরিবর্তে ব্যবহারকারীরা এখন সরাসরি বিস্তারিত প্রশ্ন করছেন, ছবি দেখিয়ে তথ্য জানতে চাইছেন এবং কণ্ঠস্বরের মাধ্যমে অনুসন্ধান করছেন। এমনকি বিভিন্ন নথি বিশ্লেষণ করেও প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করছেন তাঁরা।
প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান গুগলের সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর সার্চ প্রযুক্তির ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। এর ফলে শুধু তথ্য অনুসন্ধানের পদ্ধতিই নয়, মানুষের সঙ্গে প্রযুক্তির যোগাযোগের ধরনও পরিবর্তিত হচ্ছে।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) গুগলের মূল প্রতিষ্ঠান অ্যালফাবেটের তৃতীয় প্রান্তিকের আর্থিক ফলাফল প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত বিনিয়োগকারী সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরেন গুগলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সুন্দর পিচাই।
এআই সার্চে তিন গুণ দীর্ঘ প্রশ্ন
সুন্দর পিচাই জানান, প্রচলিত গুগল সার্চের তুলনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর ‘এআই মোডে’ ব্যবহারকারীদের প্রশ্ন গড়ে তিন গুণ দীর্ঘ হচ্ছে।
আগে কোনো বিষয়ে তথ্য জানতে ব্যবহারকারীরা সাধারণত কয়েকটি শব্দ লিখে অনুসন্ধান করতেন। যেমন, ‘ঢাকার ভালো আবাসিক এলাকা’।
কিন্তু এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে এখন একই বিষয়ে অনেক বেশি বিস্তারিত প্রশ্ন করা সম্ভব হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, একজন ব্যবহারকারী জানতে চাইতে পারেন, ‘ঢাকায় পরিবার নিয়ে বসবাসের জন্য কোন আবাসিক এলাকাগুলো ভালো, যেখানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও যোগাযোগব্যবস্থা সুবিধাজনক এবং ভবিষ্যতে সম্পত্তির মূল্য বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে?’
এ ধরনের প্রশ্নের ক্ষেত্রে এআই প্রযুক্তি ব্যবহারকারীর চাহিদা বিশ্লেষণ করে তুলনামূলকভাবে বিস্তারিত ও প্রাসঙ্গিক উত্তর দিতে পারে।
ফলে সার্চ ইঞ্জিন এখন শুধু ওয়েবসাইট খুঁজে দেওয়ার মাধ্যম হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকছে না; বরং তথ্য বিশ্লেষণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়ক প্রযুক্তি হিসেবে বিকশিত হচ্ছে।
প্রতি পাঁচটি অনুসন্ধানের একটিতে ছবি, ভয়েস বা নথি
গুগলের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী এআই মোডে প্রতি পাঁচটি অনুসন্ধানের একটি সম্পন্ন হচ্ছে কণ্ঠস্বর, ছবি অথবা নথি ব্যবহার করে।
অর্থাৎ ব্যবহারকারীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এখন শুধু লিখিত প্রশ্নের ওপর নির্ভর করছেন না।
উদাহরণস্বরূপ, কোনো ভবনের ছবি আপলোড করে তার স্থাপত্যশৈলী সম্পর্কে জানতে চাওয়া, কোনো যন্ত্রের ছবি দিয়ে সমস্যার কারণ অনুসন্ধান করা কিংবা একটি দীর্ঘ নথি থেকে নির্দিষ্ট তথ্য বের করার মতো কাজ এআই সার্চের মাধ্যমে করা সম্ভব হচ্ছে।
একইভাবে কণ্ঠস্বর ব্যবহার করে প্রশ্ন করার সুবিধা তথ্য অনুসন্ধানকে আরও সহজ ও স্বাভাবিক করে তুলছে।
বিশেষ করে মোবাইল ব্যবহারকারীদের জন্য এ ধরনের প্রযুক্তি নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে।
মাসে পাঁচ হাজার কোটির বেশি ভিজ্যুয়াল সার্চ
গুগলের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির প্ল্যাটফর্মে প্রতি মাসে পাঁচ হাজার কোটির বেশি ভিজ্যুয়াল সার্চ সম্পন্ন হচ্ছে।
ভিজ্যুয়াল সার্চ এমন একটি প্রযুক্তি, যেখানে ব্যবহারকারীরা কোনো ছবি বা ক্যামেরার মাধ্যমে দৃশ্যমান বস্তু শনাক্ত করে সে সম্পর্কে তথ্য জানতে পারেন।
যেমন, কোনো পণ্যের ছবি দিয়ে তার নাম, বৈশিষ্ট্য বা বাজারে পাওয়া যায় কি না, তা অনুসন্ধান করা যায়।
এ ছাড়া উদ্ভিদ, স্থাপনা, পোশাক, আসবাবপত্র কিংবা বিভিন্ন যন্ত্রপাতি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহেও এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে।
এ ধরনের অনুসন্ধান বৃদ্ধির মাধ্যমে বোঝা যাচ্ছে, অনলাইনে তথ্য খোঁজার ক্ষেত্রে ছবিনির্ভর প্রযুক্তির গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে।
পাঁচ বছরের মধ্যে সার্চে সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি
সুন্দর পিচাই জানিয়েছেন, গত পাঁচ বছরের মধ্যে গুগল সার্চে অনুসন্ধানের সংখ্যা সবচেয়ে দ্রুত বার্ষিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে।
তবে এই প্রবৃদ্ধির সুনির্দিষ্ট হার প্রকাশ করেননি তিনি।
গুগলের প্রধান নির্বাহীর মতে, এআই প্রযুক্তি যুক্ত হওয়ার ফলে ব্যবহারকারীরা এখন নতুন নতুন পদ্ধতিতে তথ্য অনুসন্ধান করছেন।
আগে যেসব জটিল প্রশ্নের উত্তর পেতে একাধিক ওয়েবসাইট ঘুরে তথ্য সংগ্রহ করতে হতো, এখন অনেক ক্ষেত্রেই এআইয়ের মাধ্যমে একটি সমন্বিত উত্তর পাওয়া সম্ভব হচ্ছে।
পাশাপাশি ব্যবহারকারীরা প্রথম প্রশ্নের উত্তরের ভিত্তিতে আরও প্রশ্ন করতে পারছেন। এর ফলে তথ্য অনুসন্ধান অনেকটা ধারাবাহিক কথোপকথনের রূপ নিচ্ছে।
প্রচলিত সার্চ ইঞ্জিনের ভূমিকা কি বদলে যাচ্ছে?
দীর্ঘদিন ধরে সার্চ ইঞ্জিনের প্রধান কাজ ছিল ব্যবহারকারীর প্রশ্নের সঙ্গে সম্পর্কিত ওয়েবসাইটের তালিকা প্রদর্শন করা।
কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সংযোজনের ফলে এই ব্যবস্থায় পরিবর্তন আসছে।
এখন সার্চ ইঞ্জিন শুধু তথ্যের উৎস দেখানোর পরিবর্তে বিভিন্ন উৎস থেকে প্রাসঙ্গিক তথ্য বিশ্লেষণ করে সরাসরি উত্তর দেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করছে।
তবে এআইয়ের তৈরি সব উত্তর নির্ভুল নাও হতে পারে। বিশেষ করে চিকিৎসা, আইন, আর্থিক সিদ্ধান্ত এবং গুরুত্বপূর্ণ তথ্য যাচাইয়ের ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য উৎসের সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।
একই সঙ্গে এআইয়ের মাধ্যমে সরাসরি উত্তর পাওয়ার প্রবণতা বাড়লে সংবাদমাধ্যম, তথ্যভিত্তিক ওয়েবসাইট এবং অনলাইন প্রকাশকদের পাঠকপ্রাপ্তির ধরনেও পরিবর্তন আসতে পারে।
কারণ ব্যবহারকারীরা প্রয়োজনীয় তথ্য সার্চের মধ্যেই পেয়ে গেলে সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইটে প্রবেশের প্রয়োজন কম অনুভব করতে পারেন।
ডিজিটাল ব্যবসা ও অনলাইন বিপণনেও পরিবর্তনের সম্ভাবনা
এআইভিত্তিক সার্চ প্রযুক্তির প্রসার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ডিজিটাল বিপণন কৌশলেও পরিবর্তন আনতে পারে।
আগে সার্চ ইঞ্জিনে নির্দিষ্ট শব্দের ভিত্তিতে ওয়েবসাইটের অবস্থান উন্নত করাকে গুরুত্ব দেওয়া হতো। এখন ব্যবহারকারীদের বিস্তারিত প্রশ্নের উপযোগী তথ্য তৈরি করাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
বিশেষ করে পণ্য ও সেবার বৈশিষ্ট্য, মূল্য, সুবিধা এবং ব্যবহারকারীদের সাধারণ প্রশ্নের নির্ভরযোগ্য উত্তর অনলাইনে প্রকাশ করা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য আরও কার্যকর হতে পারে।
এতে প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সম্ভাব্য ক্রেতাদের কাছে পৌঁছানোর নতুন সুযোগ তৈরি হলেও তথ্যের নির্ভুলতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ হবে।
ভবিষ্যতের সার্চ হবে আরও কথোপকথননির্ভর
প্রযুক্তির বর্তমান অগ্রগতি ইঙ্গিত দিচ্ছে, ভবিষ্যতে অনলাইনে তথ্য অনুসন্ধান আরও বেশি কথোপকথননির্ভর, ব্যক্তিগত চাহিদাভিত্তিক এবং বহুমাধ্যমনির্ভর হয়ে উঠতে পারে।
ব্যবহারকারীরা একই অনুসন্ধানে লেখা, ছবি, কণ্ঠস্বর ও নথি ব্যবহার করে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করতে পারবেন।
ফলে তথ্য অনুসন্ধান শুধু প্রশ্ন লিখে ফলাফল দেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং ব্যবহারকারীর প্রয়োজন বুঝে ধারাবাহিকভাবে তথ্য বিশ্লেষণ ও উপস্থাপনের দিকে এগোবে।
গুগলের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান সেই পরিবর্তনেরই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশে অনলাইন সার্চের ভবিষ্যৎ এখন আর শুধু তথ্য খুঁজে পাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তথ্য বোঝা, বিশ্লেষণ করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী কাজে লাগানোর সক্ষমতার ওপরও নির্ভর করছে।

