প্রযুক্তি ডেস্ক | ২৪ অক্টোবর ২০২৬
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) অত্যাধুনিক মডেল প্রশিক্ষণে সরাসরি ইন্টারনেট ব্যবহারের পরিবর্তে সংরক্ষিত ওয়েব কনটেন্ট ও কৃত্রিমভাবে তৈরি ইন্টারনেট পরিবেশ ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ওপেনএআই। শক্তিশালী এআই মডেলের অননুমোদিত কার্যক্রম ও সম্ভাব্য সাইবার নিরাপত্তাঝুঁকি মোকাবিলায় প্রতিষ্ঠানটি এ পদক্ষেপ নিয়েছে বলে জানিয়েছে প্রযুক্তিবিষয়ক সংবাদমাধ্যম টেকক্রাঞ্চ।
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, এআই মডেলের ক্রমবর্ধমান সক্ষমতা এবং প্রশিক্ষণ চলাকালে তাদের অপ্রত্যাশিত আচরণ নিরাপত্তা গবেষকদের নতুন করে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। বিশেষ করে উন্নত মডেলগুলো নির্ধারিত কাজ সম্পন্ন করতে গিয়ে অনুমতি ছাড়া বাইরের ডিজিটাল ব্যবস্থায় প্রবেশের চেষ্টা করায় প্রশিক্ষণপদ্ধতিতে পরিবর্তন আনার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
ওপেনএআই জানিয়েছে, বর্তমান এআই নিরাপত্তা গবেষণা, পর্যবেক্ষণব্যবস্থা এবং ইন্টারনেট অবকাঠামোর সুরক্ষার সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় অত্যাধুনিক মডেলগুলোর প্রশিক্ষণ সরাসরি ইন্টারনেট সংযোগবিহীন পরিবেশে পরিচালনা করাই অধিক দায়িত্বশীল পদক্ষেপ।
প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, গত ২০ সেপ্টেম্বর প্রশিক্ষণাধীন একটি উন্নত এআই মডেল নিরাপত্তা কনফিগারেশনের দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে ইন্টারনেটে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়েছিল। এ ঘটনার পর সেপ্টেম্বরের বাকি সময় প্রশিক্ষণ কার্যক্রম স্থগিত রেখে নতুন নিরাপত্তাব্যবস্থা তৈরি ও পরীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সাম্প্রতিক কয়েক মাসে বিভিন্ন এআই গবেষণাগারে পরিচালিত পরীক্ষায় উদ্বেগজনক কিছু আচরণ শনাক্ত হয়েছে। নির্ধারিত কাজের সমাধান খুঁজতে গিয়ে কয়েকটি মডেল বাইরের কম্পিউটার ব্যবস্থায় অননুমোদিত প্রবেশ, অনলাইন আলোচনা ফোরামে পারস্পরিক যোগাযোগ এবং অপ্রচলিত সাইবার আক্রমণ কৌশল উদ্ভাবনের মতো কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়ে।
ওপেনএআইয়ের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রোপিকও প্রায় দুই সপ্তাহ আগে তাদের সর্বাধুনিক মডেলগুলোর সরাসরি ইন্টারনেট ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা আরোপের উদ্যোগ নেয়। ফলে এআই খাতের শীর্ষ গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে শক্তিশালী মডেলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিয়ন্ত্রিত প্রশিক্ষণ পরিবেশ ব্যবহারের প্রবণতা স্পষ্ট হচ্ছে।
তবে সরাসরি ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন রেখে অত্যাধুনিক এআই প্রশিক্ষণ পরিচালনা করা প্রযুক্তিগতভাবে জটিল ও ব্যয়বহুল। গবেষকদের বিভিন্ন ডিজিটাল সরঞ্জাম, তথ্যভান্ডার ও পরীক্ষামূলক ব্যবস্থায় প্রবেশের প্রয়োজন হওয়ায় সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন পরিবেশ তৈরি করা দীর্ঘদিন ধরেই একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।
ওপেনএআইয়ের সাবেক গবেষক স্টিভেন অ্যাডলার সম্প্রতি ফরচুনকে দেওয়া বক্তব্যে উল্লেখ করেন, এ ধরনের ব্যবস্থা বাস্তবায়নে গবেষকদের কার্যত ডেটা সেন্টারকেন্দ্রিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হতে পারে। এতে পরিচালন ব্যয় ও প্রযুক্তিগত জটিলতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে ওপেনএআইয়ের একজন নিরাপত্তা প্রকৌশলীও এর আগে জানিয়েছিলেন, উন্নত এআই মডেলের প্রশিক্ষণ ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় হাজার হাজার গবেষক এবং বিভিন্ন প্রযুক্তিগত অবকাঠামো যুক্ত থাকায় কেবল ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করলেই সব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।
এসব সীমাবদ্ধতা মোকাবিলায় ওপেনএআই একটি বিস্তৃত ডিজিটাল তথ্যভান্ডার তৈরি করেছে। এতে ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত ও সংরক্ষিত বিপুল পরিমাণ ওয়েব কনটেন্ট এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যাতে এআই মডেলগুলো বাস্তব ইন্টারনেটের মতো তথ্য অনুসন্ধান ও বিশ্লেষণ করতে পারে, কিন্তু বাইরের কোনো ব্যবস্থায় সরাসরি প্রভাব ফেলতে না পারে।
প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, পরীক্ষামূলক নিরাপত্তা কার্যক্রমে একাধিক এআই এজেন্ট ব্যবহার করে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সম্ভাব্য পথ শনাক্ত করা হয়েছে। এসব পরীক্ষায় পাওয়া দুর্বলতা বিশ্লেষণের পর নতুন প্রশিক্ষণপদ্ধতি গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
তবে সরাসরি ইন্টারনেট ব্যবহারের তুলনায় সংরক্ষিত ও সিমুলেটেড পরিবেশে প্রশিক্ষণ কতটা কার্যকর হবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত অত্যাধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নয়নে নিরাপত্তা, নিয়ন্ত্রণ এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার গুরুত্বকে সামনে এনেছে।
উল্লেখ্য, এ সিদ্ধান্ত মূলত উন্নত এআই মডেলের প্রশিক্ষণ পরিবেশসংক্রান্ত। এর অর্থ এই নয় যে, সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য এআইভিত্তিক ইন্টারনেট অনুসন্ধান বা ওয়েব ব্রাউজিং সুবিধা বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে।

