মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬

এশিয়ার শেয়ারবাজারে দরপতন, এআই খাতে বিনিয়োগের মুনাফা নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ

গত সপ্তাহের নেতিবাচক প্রবণতার ধারাবাহিকতায় সোমবার এশিয়ার প্রধান শেয়ারবাজারগুলোতে দরপতন হয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে বিপুল বিনিয়োগের বিপরীতে প্রত্যাশিত মুনাফা অর্জন নিয়ে অনিশ্চয়তা, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মুদ্রানীতিসংক্রান্ত সিদ্ধান্তকে ঘিরে বিনিয়োগকারীদের সতর্ক অবস্থানের কারণে বাজারে এই চাপ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক ফলাফল প্রকাশের আগে বাজারে অপেক্ষা ও উদ্বেগের মনোভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ, ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক (ইসিবি) ও জাপান ব্যাংকের সুদের হারসংক্রান্ত সিদ্ধান্তের পাশাপাশি বিশ্বের শীর্ষ প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক প্রতিবেদন বাজারের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

চলতি বছরের প্রথমার্ধে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকেন্দ্রিক প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বিপুল বিনিয়োগের প্রবাহ বৈশ্বিক শেয়ারবাজারকে একাধিকবার রেকর্ড উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল। তবে এখন সেই বিনিয়োগের বিপরীতে কত দ্রুত এবং কী পরিমাণ মুনাফা আসবে, তা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।

বিশেষ করে এআই অবকাঠামো, ডেটা সেন্টার, উন্নত চিপ এবং ক্লাউড কম্পিউটিং সক্ষমতা বাড়াতে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর বিপুল অর্থ ব্যয়ের বিষয়টি বাজারের নজরদারিতে রয়েছে। এসব বিনিয়োগ ভবিষ্যতে বড় ধরনের আয় ও মুনাফা এনে দিতে পারবে কি না, তা নিয়ে স্পষ্ট প্রমাণ দেখতে চাইছেন বিনিয়োগকারীরা।

এর পাশাপাশি সুদের হার ও বন্ডের মুনাফার হার বাড়ার আশঙ্কা কোম্পানিগুলোর অর্থায়ন ব্যয় এবং ভবিষ্যৎ আয়ের মূল্যায়নের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। ফলে উচ্চ প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশায় মূল্যবান হয়ে ওঠা প্রযুক্তি শেয়ারগুলোর প্রতি বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টিভঙ্গিতেও সতর্কতা বাড়ছে।

চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের বৃহৎ প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান অ্যামাজন, মাইক্রোসফট ও অ্যালফাবেট তাদের আর্থিক ফলাফল প্রকাশ করবে। প্রতিষ্ঠান তিনটি বহুল আলোচিত ‘ম্যাগনিফিসেন্ট সেভেন’ প্রযুক্তি কোম্পানির অন্তর্ভুক্ত। পাশাপাশি দক্ষিণ কোরিয়ার শীর্ষ চিপ নির্মাতা এসকে হাইনিক্স ও স্যামসাংয়ের আর্থিক ফলাফলও প্রকাশিত হবে।

প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগের বাস্তব সুফল কতটা পাওয়া যাচ্ছে, এসব প্রতিষ্ঠানের আয়, মুনাফা, ভবিষ্যৎ পূর্বাভাস এবং এআই অবকাঠামোতে ব্যয়ের তথ্য থেকে তার গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত পাওয়া যেতে পারে।

গত সপ্তাহে টেসলা ও মেটার আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশের পর প্রযুক্তি খাতে বিপুল ব্যয় এবং তার বিপরীতে সম্ভাব্য মুনাফা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। এর প্রভাব প্রযুক্তিনির্ভর শেয়ারগুলোর ওপরও পড়েছে।

এসপিআই অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের কর্মকর্তা স্টিফেন ইনেস বলেন, চলতি আয় প্রকাশের মৌসুমের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়ের আগে এআই খাতের ওপর নিবিড় নজর রাখা হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, মাইক্রোসফট, অ্যালফাবেট ও অ্যামাজন এখন বিনিয়োগকারীদের সামনে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরবে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এবার শুধু প্রত্যাশার চেয়ে ভালো ফলাফল প্রকাশ বা ভবিষ্যৎ আয়ের পূর্বাভাস সামান্য বাড়ানোই যথেষ্ট হবে না; বিনিয়োগকারীরা এআই খাতে বিপুল ব্যয়ের বিপরীতে বাস্তব ফলাফলের প্রমাণ দেখতে চাইছেন।

শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াল স্ট্রিটের প্রধান তিনটি শেয়ারসূচকই দরপতনের মধ্য দিয়ে লেনদেন শেষ করে। সপ্তাহের শুরুতে এশিয়ার বাজারগুলোতেও সেই নেতিবাচক প্রবণতার প্রতিফলন দেখা গেছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সেমিকন্ডাক্টর খাতের পরিস্থিতি বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত দক্ষিণ কোরিয়ার শেয়ারবাজারে এক শতাংশের বেশি পতন হয়েছে। এ ছাড়া টোকিও, সাংহাই, হংকং, সিডনি, সিঙ্গাপুর ও ম্যানিলার শেয়ারবাজারেও দর কমেছে।

বাজার বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণে, প্রযুক্তি খাতের ভবিষ্যৎ মুনাফা নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির সুদের হারসংক্রান্ত পরিস্থিতি বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতাকে প্রভাবিত করছে। এর সঙ্গে ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা যুক্ত হওয়ায় শেয়ারবাজারে চাপ আরও বেড়েছে।

শুক্রবার মধ্যপ্রাচ্য ও ইউক্রেনের সংঘাতের কারণে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম তিন শতাংশের বেশি বেড়েছিল। ওই দিন তেলের দাম ছয় মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়।

তবে সোমবার তেলের দাম এক শতাংশের বেশি কমেছে। এতে বাজারে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও জ্বালানি সরবরাহ, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং উত্তর গোলার্ধে শীতকাল ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সম্পর্কিত চাহিদা নিয়ে উদ্বেগ পুরোপুরি কাটেনি।

তেলের দাম দীর্ঘ সময় উচ্চ পর্যায়ে থাকলে পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বাড়তে পারে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সুদের হার কমানোর সুযোগও সীমিত হয়ে পড়তে পারে। ফলে জ্বালানি বাজারের গতিপ্রকৃতি শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বাজারে অনিশ্চয়তার আরেকটি বড় কারণ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে ঘিরে সম্ভাব্য সামরিক উত্তেজনা। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী মঙ্গলবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান আরও জোরদার করতে পারেন—এমন জল্পনা বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

কয়েকজন কর্মকর্তা সতর্ক করেছেন, নতুন মার্কিন কংগ্রেসের কার্যক্রম শুরুর আগের কয়েক মাস বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

রোববার ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্পের বক্তব্যও নতুন করে সামরিক পদক্ষেপের আশঙ্কা দূর করতে পারেনি। তিনি বলেন, “আমাকে একটি সিদ্ধান্ত নিতে হবে—আমি কি এর চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করব, যা করা খুবই সহজ, নাকি কোনো সমঝোতায় পৌঁছাব? ব্যস, এটাই।”

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি আরও জোরদার করা হয়েছে। সেখানে তৃতীয় একটি বিমানবাহী রণতরির বহর পাঠানো হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ওই অঞ্চলে মার্কিন জনবল কমানোর কথাও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়লে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ও বাণিজ্যপথে বিঘ্নের আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। এতে তেলের দাম এবং বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, যা আর্থিক বাজারের জন্যও নেতিবাচক হতে পারে।

চলতি সপ্তাহে বিনিয়োগকারীদের নজর থাকবে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ, ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং জাপান ব্যাংকের মুদ্রানীতিসংক্রান্ত সিদ্ধান্তের দিকে।

প্রাথমিক প্রত্যাশা অনুযায়ী, ফেডারেল রিজার্ভ এবার সুদের হার অপরিবর্তিত রাখতে পারে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিনির্ধারকদের বক্তব্য, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের অগ্রগতি এবং ভবিষ্যৎ সুদের হার সম্পর্কে দেওয়া ইঙ্গিত বাজারের পরবর্তী গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হবে।

সুদের হার দীর্ঘ সময় উচ্চ পর্যায়ে থাকলে প্রযুক্তি কোম্পানিসহ প্রবৃদ্ধিনির্ভর প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ আয়ের বর্তমান মূল্যায়নে চাপ তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে সুদের হার কমানোর সম্ভাবনা বাড়লে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ ফিরে আসতে পারে। এ কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সিদ্ধান্তের পাশাপাশি তাদের ভবিষ্যৎ নীতিগত অবস্থান সম্পর্কেও স্পষ্ট ধারণা পেতে চাইছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা।

সামগ্রিকভাবে, এশিয়ার শেয়ারবাজারে সোমবারের দরপতন শুধু গত সপ্তাহের নেতিবাচক প্রবণতার ধারাবাহিকতা নয়; বরং প্রযুক্তি খাতে বিপুল বিনিয়োগের স্থায়িত্ব, সুদের হারের ভবিষ্যৎ গতিপথ এবং ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি নিয়ে বিনিয়োগকারীদের ক্রমবর্ধমান সতর্কতারও প্রতিফলন।

চলতি সপ্তাহে বড় প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক ফলাফল এবং প্রধান কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সিদ্ধান্ত প্রকাশের পর বাজারের দিকনির্দেশনা আরও স্পষ্ট হতে পারে। বিশেষ করে এআই খাতে বিপুল ব্যয়ের বিপরীতে আয় ও মুনাফা বৃদ্ধির বাস্তব প্রমাণ পাওয়া যায় কি না, সেটিই প্রযুক্তি শেয়ারের মূল্যায়ন এবং বৈশ্বিক শেয়ারবাজারের স্বল্পমেয়াদি গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

তবে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও জ্বালানি বাজারের অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকলে ভালো আর্থিক ফলাফলও বাজারের উদ্বেগ পুরোপুরি দূর করতে পারবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন