বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬

পুঁজিবাজারে বিদেশি বিনিয়োগে অস্থিরতা কাটছে না

দেশের পুঁজিবাজারে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণে স্থিতিশীলতা ফিরছে না। কোনো মাসে লেনদেন বাড়লেও পরের মাসেই তা উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাচ্ছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের লেনদেন ৬৬৩ কোটি টাকায় উঠলেও মে মাসে তা নেমে আসে মাত্র ৭৪ কোটি টাকায়। সর্বশেষ অক্টোবরের প্রথমার্ধেও তাদের লেনদেন কমেছে।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) পাক্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, অক্টোবরের প্রথমার্ধে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের লেনদেন হয়েছে ২১৪ কোটি টাকা। গত সেপ্টেম্বরের শেষার্ধে এ লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৩৪৬ কোটি টাকা। সে হিসাবে এক পাক্ষিকের ব্যবধানে বিদেশিদের লেনদেন কমেছে ১৩২ কোটি টাকা বা প্রায় ৩৮ শতাংশ।

ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারিতে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের লেনদেন ছিল ৩৭৭ কোটি টাকা। ফেব্রুয়ারিতে তা বেড়ে ৬৬৩ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। মার্চে কমে ২৭২ কোটি এবং এপ্রিলে ১৭৫ কোটি টাকায় নেমে আসে। মে মাসে লেনদেন আরও কমে হয় ৭৪ কোটি টাকা। জুনে তা বেড়ে ৫৪০ কোটি এবং জুলাইয়ে ৫২৩ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। আগস্টে লেনদেন কমে ৩১৯ কোটি টাকায় এলেও সেপ্টেম্বরে আবার বেড়ে ৫৮১ কোটি টাকা হয়।

মাসভিত্তিক এই ওঠানামা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণে ধারাবাহিকতার অভাবের চিত্র তুলে ধরছে। ২০২৫ সালের জুলাই থেকে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত ১৩ মাসে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা মোট ৪ হাজার ৭০৭ কোটি টাকার লেনদেন করেছেন।

২০২৫ সালের জুলাইয়ে ডিএসইতে বিদেশিদের লেনদেন ছিল ৪৯১ কোটি টাকা। আগস্টে তা কমে ৩৭১ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। সেপ্টেম্বরে বেড়ে ৪৪০ কোটি টাকা হলেও অক্টোবরে আবার কমে ৩৬৮ কোটি টাকায় নেমে আসে। নভেম্বর ও ডিসেম্বরে লেনদেন আরও কমে যথাক্রমে ২৬৭ কোটি ও ১৪৬ কোটি টাকায় দাঁড়ায়।

সব মিলিয়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৪ হাজার ১৮৫ কোটি টাকা। আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৯৩১ কোটি টাকা।

এদিকে শুধু শেয়ার লেনদেন নয়, দেশের পুঁজিবাজার ও বন্ডবাজারে বিদেশি বিনিয়োগের নিট প্রবাহও কয়েক বছর ধরে ঋণাত্মক রয়েছে। ২০২০-২১ অর্থবছর থেকে দেশীয় ঋণ সিকিউরিটিজে বিদেশি বিনিয়োগের নিট প্রবাহ নেতিবাচক।
ওই অর্থবছরে নিট পোর্টফোলিও বিনিয়োগের বহিঃপ্রবাহ ছিল ২ হাজার ৮৮০ কোটি টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরে তা বেড়ে ৩ হাজার ৬০ কোটি এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরে ২ হাজার ৬৪০ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বহিঃপ্রবাহ আরও বেড়ে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৮২০ কোটি টাকায় পৌঁছায়।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে নিট পোর্টফোলিও বিনিয়োগের বহিঃপ্রবাহ কমে ১ হাজার ৬৮০ কোটি টাকায় নেমে আসে। তবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা আবার বেড়ে ২ হাজার ৭২১ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।

দীর্ঘমেয়াদি চিত্রেও ডিএসইতে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ কমার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ২০১৬ সালে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৮ হাজার ৭৭৩ কোটি টাকা। ওই বছর ডিএসইর মোট লেনদেনে তাঁদের অংশগ্রহণের হার ছিল ৩ দশমিক ৬৮ শতাংশ।

২০১৭ সালে বিদেশিদের লেনদেন বেড়ে ১১ হাজার ৪৪৮ কোটি টাকা হলেও মোট লেনদেনে তাঁদের অংশগ্রহণ কমে ২ দশমিক ৬৪ শতাংশে দাঁড়ায়। ২০১৮ ও ২০১৯ সালে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা যথাক্রমে ৯ হাজার ২৭৩ কোটি ও ৭ হাজার ৮২৩ কোটি টাকার শেয়ার লেনদেন করেন। এ দুই বছরে মোট লেনদেনে তাঁদের অংশগ্রহণের হার ছিল যথাক্রমে ৩ দশমিক ৪৮ ও ৩ দশমিক ৪৪ শতাংশ।
২০২০ সালে বিদেশিদের লেনদেন বেড়ে ১০ হাজার ৩৮৮ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। ওই বছর মোট লেনদেনে তাঁদের অংশগ্রহণ ছিল ৩ দশমিক ৮৫ শতাংশ। ২০২১ সালে তা কমে ১ দশমিক ১০ শতাংশে নেমে আসে। ওই বছর বিদেশিদের লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৭ হাজার ৭৬৪ কোটি টাকা।

২০২২ ও ২০২৩ সালে ডিএসইর মোট লেনদেনে বিদেশিদের অংশগ্রহণের হার ছিল যথাক্রমে শূন্য দশমিক ৮৯ ও শূন্য দশমিক ৭৭ শতাংশ। টাকার অঙ্কে তাঁদের লেনদেনের পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ৪ হাজার ১৮০ কোটি ও ২ হাজার ১৬৭ কোটি টাকা।

২০২৪ সালে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের লেনদেন কিছুটা বেড়ে ৩ হাজার ৯২৯ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। তবে ডিএসইর মোট লেনদেনে তাঁদের অংশগ্রহণের হার ছিল মাত্র ১ দশমিক ২২ শতাংশ।

বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের লেনদেনে ওঠানামার পেছনে পুঁজিবাজারের সামগ্রিক পরিস্থিতি, শেয়ারদরের প্রবণতা, দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা, মুদ্রাবাজারের স্থিতিশীলতা এবং বিনিয়োগ প্রত্যাহারের সুযোগসহ বিভিন্ন বিষয় ভূমিকা রাখে।

তাদের মতে, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের লেনদেনে সাময়িক বৃদ্ধি দেখা গেলেও দীর্ঘমেয়াদে তাদের অংশগ্রহণে স্থিতিশীল প্রত্যাবর্তনের ইঙ্গিত এখনো নেই। কয়েক বছর ধরে নিট বিনিয়োগের বহিঃপ্রবাহ এবং ডিএসইর মোট লেনদেনে বিদেশিদের অংশগ্রহণের হার কম থাকা দেশের পুঁজিবাজারে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন