আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে ১ লাখ কোটি ইয়েন বা প্রায় ৬৩৫ কোটি মার্কিন ডলারের বেসরকারি বিনিয়োগের ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নিয়েছে জাপান। দেশটির সংবাদমাধ্যম নিক্কেই এশিয়ার গত ২২ অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের উৎপাদনশিল্প, জ্বালানি অবকাঠামো ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে জাপানি বিনিয়োগ বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
চার দিনের সরকারি সফরে সোমবার (২৬ অক্টোবর) সকালে টোকিও পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত এ সফরে দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারত্ব জোরদার, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ আকর্ষণ বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
নিক্কেই এশিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে ১ লাখ কোটি ইয়েনের বেসরকারি বিনিয়োগের ব্যবস্থা করার বিষয়ে সম্মত হতে পারে জাপান। প্রস্তাবিত উদ্যোগের আওতায় গাড়ি ও অন্যান্য উৎপাদনশিল্পের পাশাপাশি জ্বালানি অবকাঠামো নির্মাণে বিনিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে।
বাংলাদেশে জাপানের সংশ্লিষ্টতায় গড়ে ওঠা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণও এ পরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। তবে বিনিয়োগের পরিমাণ, খাতভিত্তিক বরাদ্দ ও বাস্তবায়ন কাঠামো সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া বাকি।
বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে উৎপাদনশিল্প ও জ্বালানি অবকাঠামোকে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে গাড়ি উৎপাদনসহ বিভিন্ন শিল্প খাতে বিনিয়োগ বাড়লে দেশের উৎপাদন সক্ষমতা উন্নয়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং দক্ষ জনশক্তি তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
নিক্কেই এশিয়ার প্রতিবেদন অনুযায়ী, জাপানি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান সুমিতোমো করপোরেশনসহ কয়েকটি পক্ষ বাংলাদেশের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়নে যুক্ত রয়েছে। এসব অঞ্চলে নতুন বিনিয়োগ এলে শিল্পকারখানা স্থাপন, সরবরাহব্যবস্থা সম্প্রসারণ এবং স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে জাপানি কোম্পানির ব্যবসায়িক সম্পর্ক বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এ ছাড়া জ্বালানি অবকাঠামোতে বিনিয়োগ বাড়লে শিল্প উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ ও অবকাঠামোগত সক্ষমতা উন্নয়নের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এসব সম্ভাবনার বাস্তব সুফল নির্ভর করবে বিনিয়োগের ধরন, প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং স্থানীয় অর্থনীতির সঙ্গে তার সংযোগের ওপর।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এ সফরে বিনিয়োগ উদ্যোগটি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে তাঁর শীর্ষ বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।
বৈঠক শেষে দুই দেশের পক্ষ থেকে যৌথ বিবৃতি দেওয়ার কথা রয়েছে। এ ছাড়া জাপানের প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া মধ্যাহ্নভোজেও অংশ নেবেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী।
বৈঠকে দুই দেশের বিদ্যমান কৌশলগত অংশীদারত্ব জোরদার, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং উন্নয়ন সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। পাশাপাশি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয়ও আলোচনায় স্থান পেতে পারে।
সফরকালে প্রধানমন্ত্রী জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা জাইকা, জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন (জেবিআইসি) এবং জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (জেট্রো) প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করবেন।
এ ছাড়া মিতসুই অ্যান্ড কোম্পানি, সুমিতোমো করপোরেশন এবং জেরা-সহ জাপানের বড় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে তাঁর আলোচনার কথা রয়েছে।
এসব বৈঠকে বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশ, সম্ভাবনাময় শিল্প খাত, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নতুন ব্যবসায়িক সুযোগ নিয়ে আলোচনা হতে পারে। সরকারি সংস্থা ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর মাধ্যমে সম্ভাব্য বিনিয়োগ প্রকল্প চিহ্নিত করা এ সফরের অন্যতম লক্ষ্য।
টোকিওতে বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক ফোরামে মূল বক্তব্য দেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এতে দুই দেশের ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।
ফোরামটি দুই দেশের বেসরকারি খাতের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানো এবং বাংলাদেশে বিনিয়োগের সম্ভাবনা তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হতে পারে। বিশেষ করে উৎপাদনশিল্প, রপ্তানিমুখী শিল্পকারখানা, জ্বালানি এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগ আকর্ষণের বিষয়গুলো গুরুত্ব পেতে পারে।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) প্রধানমন্ত্রী জাপানি পোশাক ব্র্যান্ড ইউনিক্লোর প্রধান কার্যালয় পরিদর্শন করবেন এবং প্রতিষ্ঠানটির শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। সফরের শেষ দিন বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) নাগোয়া শহরে টয়োটা মোটর করপোরেশনের মোটোমাচি কারখানা পরিদর্শনের কর্মসূচি রয়েছে তাঁর।
বাংলাদেশ ও জাপানের অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদারে এ সফরকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) সই হয়েছে। চুক্তিটির কার্যকর বাস্তবায়ন, জাপানের বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের প্রবেশাধিকার সম্প্রসারণ এবং দুই দেশের ব্যবসায়িক যোগাযোগ বাড়ানো সফরের অন্যতম লক্ষ্য।
ইপিএ কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও ব্যবসায়িক সহযোগিতার নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের জন্য জাপানের বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়ানো এবং জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে স্থানীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের অংশীদারত্ব জোরদারের সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রস্তাবিত বিনিয়োগ পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের উৎপাদনশিল্প, গাড়ি উৎপাদন এবং জ্বালানি অবকাঠামো উন্নয়নে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। বিদেশি বিনিয়োগের পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থান, প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধি এবং রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য সম্প্রসারণেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ার সুযোগ রয়েছে।
তবে ঘোষিত বিনিয়োগের পরিমাণ আর বাস্তবে বিনিয়োগ হওয়ার পরিমাণ এক বিষয় নয়। পরিকল্পনাটি কতটা বাস্তবায়িত হবে, কোন খাতে কত অর্থ আসবে এবং কত সময়ে প্রকল্পগুলো কার্যকর হবে, তার ওপর নির্ভর করবে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এর প্রকৃত প্রভাব।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের টোকিও সফরে দুই দেশের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা ও ব্যবসায়িক যোগাযোগের মাধ্যমে বিনিয়োগ উদ্যোগটি কতটা এগিয়ে যায়, এখন সেদিকেই নজর থাকবে।

