মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে বিদেশে কর্মী পাঠানো কমেছে ৩১.৮ শতাংশ, রেমিট্যান্স প্রবাহেও দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকির আশঙ্কা
মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান সংঘাত বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও রেমিট্যান্স প্রবাহের ওপর নতুন চাপ তৈরি করেছে। আট মাস আগে শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধ দেশের জ্বালানি সংগ্রহে বিঘ্ন ঘটিয়েছিল। এবার ইয়েমেনের হুথি ও সৌদি আরবের সংঘাতের প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানিতে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের অন্যতম প্রধান উৎস রেমিট্যান্স প্রবাহ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এ পরিস্থিতি বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি বড় দুর্বলতা সামনে এনেছে—সৌদি আরবের শ্রমবাজারের ওপর অতিনির্ভরতা। দেশটিতে নতুন কর্মী নিয়োগ কমে যাওয়ায় বৈদেশিক কর্মসংস্থান খাতে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।
বিদেশে কর্মী পাঠানো কমেছে ৩১.৮ শতাংশ
জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে ৫ লাখ ৯০ হাজার ১৮৮ জন কর্মী বিদেশে গেছেন। ২০২৫ সালের একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ৮ লাখ ৬৪ হাজার ৭৩৫। অর্থাৎ, গত বছরের তুলনায় এ বছর বিদেশে কর্মী পাঠানো কমেছে ৩১.৮ শতাংশ।
এই নিম্নমুখী প্রবণতার প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে সৌদি আরবের শ্রমবাজারে কর্মী নিয়োগ কমে যাওয়া। আলোচ্য সময়ে ৩ লাখ ১৫ হাজার ৯৩৫ জন বাংলাদেশি কর্মী সৌদি আরবে গেছেন। আগের বছরের একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ৫ লাখ ৭৭ হাজার ১০। অর্থাৎ, দেশটিতে কর্মী যাওয়া কমেছে ৪৫.২ শতাংশ।
গত বছরের তুলনায় বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থান কমেছে মোট ২ লাখ ৭৪ হাজার ৫৪৭ জন। এর মধ্যে শুধু সৌদি আরবেই কর্মী যাওয়া কমেছে ২ লাখ ৬১ হাজার ৭৫ জন, যা মোট ঘাটতির প্রায় ৯৫ শতাংশ।
রেমিট্যান্স বাড়লেও দীর্ঘমেয়াদি শঙ্কা
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, সাম্প্রতিক সময়ে রেমিট্যান্স প্রবাহে যে গতি দেখা যাচ্ছে, তা হয়তো প্রবাসীদের নিয়মিত ও স্থিতিশীল আয় থেকে আসছে না। যুদ্ধ ও অনিশ্চয়তার কারণে অনেক প্রবাসী সঞ্চিত অর্থ দ্রুত দেশে পাঠিয়ে দিতে পারেন। এতে সাময়িকভাবে রেমিট্যান্স বাড়লেও দীর্ঘমেয়াদে প্রবাহ কমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন শিকদার বলেন, “যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট অনিশ্চয়তার মধ্যে প্রবাসীরা তাঁদের সঞ্চয় দেশে পাঠিয়ে দিতে পারেন, যা সাময়িকভাবে রেমিট্যান্স বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু এই সংঘাত যদি অমীমাংসিত অবস্থায় দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে প্রথম কয়েক মাস পর প্রবাসী আয়ের প্রবাহ কমে যেতে পারে।”
নলেজ হাব ইনস্টিটিউট ট্রাস্টের সভাপতি খন্দকার গোলাম বলেন, সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও বিনিয়োগ প্রকল্প স্থবির হয়ে পড়তে পারে। এতে প্রবাসীদের কর্মসংস্থান ও মজুরি—দুটিই ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো প্রধান গন্তব্যগুলোতে মূলধনী ব্যয় কমে গেলে নতুন শ্রমিকের চাহিদা সরাসরি হুমকির মুখে পড়বে। পাশাপাশি, ইতিমধ্যে কর্মরত প্রবাসীদেরও ছাঁটাইয়ের ঝুঁকি বাড়বে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামও পরিস্থিতির ব্যাপক ঝুঁকির কথা স্বীকার করেছেন। তিনি জানান, বর্তমানে সৌদি আরবে ৩০ লাখেরও বেশি বাংলাদেশি বসবাস ও কাজ করছেন।
সাংবাদিকদের তিনি বলেন, “যেখানে ৩০ লাখের বেশি বাংলাদেশি কাজ করেন, সেখানে একটি প্রভাব পড়া অনিবার্য।” তবে দীর্ঘমেয়াদি চাপ কমাতে সরকার বিকল্প শ্রমবাজার খোঁজার চেষ্টা করছে বলেও জানান তিনি।
ফ্লাইট বিপর্যয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
ইরান যুদ্ধ, আঞ্চলিক সংঘাত ও হুথিদের হামলার জেরে সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোতে, বিশেষ করে রিয়াদ বিমানবন্দরে, সাম্প্রতিক সময়ে নিরাপত্তাজনিত অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর ফলে ফেব্রুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত এক হাজারের বেশি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে।
সংঘাতের প্রভাবে অন্যান্য প্রধান শ্রমবাজারেও কর্মী নিয়োগ কমেছে। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে কাতারে গেছেন ৫২ হাজার ৬০ জন কর্মী। আগের বছরের একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ৮৬ হাজার ১৭১। একইভাবে কুয়েতে যাওয়া কর্মীর সংখ্যা ৩৪ হাজার ৯২৮ থেকে কমে ২৫ হাজার ৩৫ হয়েছে।
তবে কয়েকটি শ্রমবাজারে বিপরীত প্রবণতাও দেখা গেছে। আলোচ্য সময়ে সিঙ্গাপুরে গেছেন ৬২ হাজার ৬৪৭ জন বাংলাদেশি কর্মী, যা আগের বছর ছিল ৫৬ হাজার ৫৯১। অন্যদিকে, সংযুক্ত আরব আমিরাতে কর্মী যাওয়ার সংখ্যা ১০ হাজার ১৪২ থেকে বেড়ে ২২ হাজার ৮৪৮ হয়েছে।
বিএমইটির তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারি থেকে বিদেশে কর্মসংস্থানের মাসিক ছাড়পত্রের সংখ্যা ৪৪ হাজার থেকে ৭০ হাজারের মধ্যে রয়েছে। এ সংখ্যা মহামারির পরবর্তী সময়ে মাসিক গড় প্রায় এক লাখ কর্মীর তুলনায় অনেক কম। এটি কোভিড-পূর্ববর্তী অভিবাসন পরিস্থিতির প্রতিফলন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ফ্লাইট ব্যবস্থাপনা বিভাগের তথ্যমতে, সৌদি বিমানবন্দরের কার্যক্রমে বিধিনিষেধের কারণে ১০ থেকে ২৩ অক্টোবরের মধ্যে ঢাকা থেকে সপ্তাহে ১৪১টি সরাসরি ও ট্রানজিট ফ্লাইটে বিপর্যয় ঘটেছে। এতে ২১ হাজার ৯৩৩ জন যাত্রী আটকা পড়েছেন।
চাকরি ও ভিসা নিশ্চিত করতে বিপুল অর্থ বিনিয়োগের পর এসব অভিবাসনপ্রত্যাশী এখন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন। তবে আটকে পড়া কর্মীদের ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়টি নিশ্চিত করতে সরকার দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় সক্রিয় রয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক।
সন্ধিক্ষণে রেমিট্যান্স প্রবাহ
নতুন কর্মী নিয়োগে বড় ধরনের পতন দেখা দিলেও রেমিট্যান্স প্রবাহে এখন পর্যন্ত ইতিবাচক চিত্র রয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, এ ধারা দীর্ঘস্থায়ী নাও হতে পারে।
চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) দেশে ৮.৫৯ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এসেছিল ৭.৫৯ বিলিয়ন ডলার। সে হিসাবে রেমিট্যান্স বেড়েছে ১৩.৩ শতাংশ।
রেমিট্যান্সের অন্যতম প্রধান উৎস হিসেবে শীর্ষে রয়েছে সৌদি আরব। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট রেমিট্যান্সের ১৯.২ শতাংশ এসেছে দেশটি থেকে। এ সময়ে সৌদি আরব থেকে এসেছে ১.৬৫ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ে ১.২৩ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় প্রায় ৩৪ শতাংশ বেশি।
তবে রেমিট্যান্স প্রবাহে সাম্প্রতিক সতর্কসংকেতও দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে দেশে ২.৯৭ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এলেও সেপ্টেম্বরে তা কমে ২.৭৭ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। এটি গত ১১ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন মাসিক রেমিট্যান্স প্রবাহ।

