সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬

ফ্রান্সের আর্থিক অস্থিরতা ও মূল্যস্ফীতি নিয়ে ইসিবির গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক

সরকারি ঋণ ও বন্ডের মুনাফার হার বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ, বিশেষ সহায়তার সম্ভাবনা কম দেখছেন বিশ্লেষকেরা

ফ্রান্সের অবনতিশীল সরকারি আর্থিক পরিস্থিতি ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের (ইসিবি) চলতি সপ্তাহের বৈঠকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে পারে। তবে ইউরোজোনের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিকে তাৎক্ষণিকভাবে সংকট থেকে উদ্ধারে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিশেষ কোনো সহায়তা দেবে—এমন সম্ভাবনা কম বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

ইসিবি এবার সুদের হার অপরিবর্তিত রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। চলতি বছর এরই মধ্যে দুই দফা সুদের হার বাড়িয়েছে ব্যাংকটি। ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। এ পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ইউরোজোনের অর্থনীতির গতি সচল রাখার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করছে ইসিবি।

তবে বৃহস্পতিবারের বৈঠকে ফ্রান্সের আর্থিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে।

ফ্রান্সের ঋণসংকট ও রাজনৈতিক অস্থিরতা

ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের প্রধান ইউরোপীয় অর্থনীতিবিদ অ্যান্ড্রু কেনিংহাম বলেন, বৈঠকে ফ্রান্সের চলমান আর্থিক ও রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলায় ইসিবি কী পদক্ষেপ নিতে পারে, তা নিয়ে আলোচনা হতে পারে।

সরকারি ঋণ নেওয়ার ব্যয় নির্দেশক ফরাসি সরকারি বন্ডের মুনাফার হার গত সপ্তাহে বেড়ে ২০০২ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। আগামী বছরের বাজেট নিয়ে অচলাবস্থার মধ্যে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ফ্রান্সের বিপুল সরকারি ঋণের বোঝা কমানো ওই বাজেটের অন্যতম লক্ষ্য।

অন্যদিকে, সরকারি সেবায় ব্যয় বাড়ানোর দাবিতে শুরু হওয়া বিক্ষোভ একপর্যায়ে কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ সড়ক সহিংসতায় রূপ নেওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।

বিশেষ সহায়তা কর্মসূচি নিয়ে অনিশ্চয়তা

বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা ঠেকাতে ইসিবি প্রথমবারের মতো ‘ট্রান্সমিশন প্রোটেকশন ইনস্ট্রুমেন্ট’ (টিপিআই) নামের বিশেষ সংকট মোকাবিলা কর্মসূচি ব্যবহার করে ফরাসি বন্ডের মুনাফার হার কমানোর চেষ্টা করতে পারে বলে জল্পনা চলছে। তবে কর্মসূচিটি চালুর শর্ত কঠোর হওয়ায় ফ্রান্সের বর্তমান পরিস্থিতি সেই শর্ত পূরণ করছে না বলে মনে করছেন অধিকাংশ পর্যবেক্ষক।

ইসিবির নিয়ম অনুযায়ী, আর্থিক অস্থিতিশীলতা ইউরোজোনের অন্যান্য দেশে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হলে বাজারের ‘অযৌক্তিক’ ওঠানামা মোকাবিলায় এ কর্মসূচি ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে দুর্বল রাজস্বনীতি বা সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনার সমস্যার কারণে বাজারে অস্থিরতা দেখা দিলে এ কর্মসূচি ব্যবহারের সুযোগ নেই।

ইসিবির প্রেসিডেন্ট ক্রিস্টিন লাগার্দ, যিনি একসময় ফ্রান্সের অর্থমন্ত্রী ছিলেন, এ ধরনের পদক্ষেপের বিষয়ে এখন পর্যন্ত তেমন আগ্রহ দেখাননি।

চলতি মাসের শুরুতে ফরাসি বন্ডের মুনাফার হার বৃদ্ধি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, “প্রাথমিক ও প্রধান সমাধানটি ফ্রান্সের অভ্যন্তরেই রয়েছে। আর সেটি রাজস্বনীতির সঙ্গে সম্পর্কিত।”

ইসিবির পরিচালনা পর্ষদের সদস্য এবং ফ্রান্সের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধানও সম্ভাব্য হস্তক্ষেপের বিষয়টিকে গুরুত্বহীন করে দেখেছেন। তাঁর ভাষায়, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপের জন্য প্রয়োজনীয় “শর্তগুলো পূরণ হয়নি”।

ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের কেনিংহামের পূর্বাভাস, বৃহস্পতিবারের বৈঠকে ফ্রান্সের জন্য কোনো বিশেষ সহায়তা ঘোষণা করা হবে না।

সুদের হার অপরিবর্তিত রাখার সম্ভাবনা

জ্বালানির দাম বাড়ায় মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী হলেও ইউরো ব্যবহারকারী ২১টি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইসিবি মূল সুদের হার ২ দশমিক ৫ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ইসিবির সুদের হারসংক্রান্ত সিদ্ধান্তের এক দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ তাদের সর্বশেষ সিদ্ধান্ত জানাবে। সেপ্টেম্বরে সুদের হার বাড়ানোর পর ফেডও এবার হার অপরিবর্তিত রাখতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ইউরোজোনে মূল্যস্ফীতি সেপ্টেম্বরে বেড়ে তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ৩ দশমিক ৮ শতাংশে পৌঁছেছে। তবে জ্বালানি ও খাদ্যের মতো অস্থির মূল্যসম্পন্ন পণ্য বাদ দিয়ে হিসাব করা মূল মূল্যস্ফীতিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়নি।

আইএনজি ব্যাংকের অর্থনীতিবিদ কার্স্টেন ব্রজেস্কি এএফপিকে বলেন, “জ্বালানির দাম বৃদ্ধির প্রভাব অন্য খাতে ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা এখন পর্যন্ত খুবই সামান্য।”

তিনি আরও বলেন, ফ্রান্সের সংকটের কারণে ইসিবির আরেক দফা সুদের হার বাড়ানোর সম্ভাবনা বরং কমেছে।

ঋণ নেওয়ার ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা

সরকারি বন্ডের মুনাফার হার বেড়ে গেলে ঋণ নেওয়ার শর্ত কঠিন হয়ে পড়ে। এর ফলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও পরিবারের ঋণ নেওয়ার ব্যয় বাড়তে পারে। সুদের হার বাড়লেও একই ধরনের প্রভাব দেখা যায়।

অধিকাংশ অর্থনীতিবিদের ধারণা, ইসিবি সুদের হার বৃদ্ধির ধারায় শেষ দফা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত ডিসেম্বরে নিতে পারে। ওই সময় ব্যাংকটির হাতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির হালনাগাদ পূর্বাভাস থাকবে।

লাগার্দের ভবিষ্যৎ নিয়েও জল্পনা

ইসিবির প্রধান হিসেবে ক্রিস্টিন লাগার্দের ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে। আগামী বছরের অক্টোবরে তাঁর মেয়াদ আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এর আগেই তিনি পদত্যাগ করতে পারেন—এমন জল্পনা বাড়ছে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন