সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬

ক্রেতা সংকট, লোকসান ও ৫০ লাখ টাকা বিদ্যুৎ বিল বকেয়া, বন্ধ কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি

একসময় রাজধানীর অভিজাত শপিং মলগুলোর একটি ছিল শান্তিনগর-কাকরাইল মোড়ে অবস্থিত কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি শপিং কমপ্লেক্স। পোশাক, জুতা, প্রসাধনী, উপহারসামগ্রী ও বিভিন্ন ব্র্যান্ডের পণ্যের সমাহারে জমজমাট থাকা এই বিপণিবিতান এখন বন্ধ। দীর্ঘদিনের ক্রেতা সংকট, ব্যবসায়িক মন্দা, অনিয়মিত সার্ভিস চার্জ এবং বিপুল অঙ্কের বিদ্যুৎ বিল বকেয়ার কারণে লোকসান সামলাতে না পেরে গত ১ অক্টোবর থেকে মার্কেটটি বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন দোকানমালিকেরা।

১৯৯৮ সালে যাত্রা শুরু করা এই শপিং কমপ্লেক্সে একসময় ছিল ১৯৮টি দোকান। অথচ বন্ধ ঘোষণার সময় সেখানে চালু ছিল মাত্র ২০ থেকে ২৫টি দোকান। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, গত এক দশকে ধাপে ধাপে ক্রেতা ও ব্যবসায়ী হারিয়ে মার্কেটটির ব্যবসায়িক কার্যক্রম সংকুচিত হয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত লোকসানের বোঝা আর সামাল দিতে পারেননি মালিকেরা।

তবে পুরো ভবনটি পরিত্যক্ত হচ্ছে না। শপিং কমপ্লেক্স বন্ধ থাকলেও ভবনের ওপরের তলাগুলোর আবাসিক অ্যাপার্টমেন্ট এ সিদ্ধান্তের বাইরে রয়েছে। অন্যদিকে, বাণিজ্যিক অংশটি বিক্রি বা নতুন কোনো কাজে ব্যবহারের বিষয়ে একাধিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা চলছে বলে জানিয়েছে দোকানমালিক সমিতি।

রোববার দুপুরে সরেজমিনে মার্কেটটিতে গিয়ে দেখা যায়, প্রবেশপথের প্রধান ফটকের সাটার নামানো। ওপরে ঝুলছে মার্কেট বন্ধের ঘোষণা-সংবলিত ব্যানার। এতে উল্লেখ করা হয়েছে, ১ অক্টোবর ২০২৬ থেকে শপিং কমপ্লেক্সটি বন্ধ থাকবে।

তবে প্রধান ফটকের আশপাশে কয়েকটি খাবার ও পোশাকের দোকান চালু রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কাচ্চি ডাইন, হটকেক, রেমন্ড ও মেজবান ডাইনসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান।

মার্কেট কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, নিরাপত্তারক্ষী, ব্যবস্থাপক ও অন্যান্য কর্মচারীর বেতনসহ ন্যূনতম পরিচালন ব্যয় মেটাতে এসব দোকান খোলা রাখা হয়েছে। দোকানগুলোর ভাড়া থেকে পাওয়া অর্থ দিয়ে কর্মীদের বেতন ও দৈনন্দিন খরচের একটি অংশ বহন করা হচ্ছে।

মার্কেট বন্ধের অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে আর্থিক সংকট। দোকানমালিক সমিতির দাবি, ক্রেতা কমে যাওয়ায় দোকানগুলোর ব্যবসা কমেছে, ফলে সার্ভিস চার্জও নিয়মিত আদায় করা সম্ভব হচ্ছিল না। একই সময়ে বিদ্যুৎ বিল বকেয়া জমে ৫০ লাখ টাকার বেশি হয়ে যায়।

কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি দোকানমালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক বাকীবিল্লাহ ওসমানী (আনন্দ শাহ) বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, সার্ভিস চার্জ আদায় হচ্ছিল না। অন্যদিকে, বিদ্যুৎ বিলও প্রায় ৫০ লাখ টাকা বকেয়া হয়ে যায়। এ অবস্থায় সব মালিক সম্মিলিতভাবে মার্কেট বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেন।

তিনি জানান, নিরাপত্তাকর্মী ও ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত কর্মীদের বেতন দেওয়ার জন্য কিছু দোকান চালু রাখা হয়েছে। প্রয়োজনে ঋণ নিয়ে হলেও এসব কর্মীর বেতন ও ন্যূনতম খরচ মেটানোর চেষ্টা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

শপিং কমপ্লেক্সটির ভবিষ্যৎ ব্যবহার নিয়ে ইতোমধ্যে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা শুরু হয়েছে। হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, করপোরেট অফিস, ব্যাংক কিংবা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের বাণিজ্যিক কার্যক্রম এখানে পরিচালিত হতে পারে বলে জানিয়েছে দোকানমালিক সমিতি।

সমিতির সভাপতি এ কে এম ইকবাল বলেন, সব মালিক মিলে মার্কেটটি বিক্রি করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। ভবনটিতে হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, টিভি সেন্টার কিংবা অন্য কোনো অফিস হতে পারে।

এদিকে, মার্কেটটির দোকানমালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক বাকীবিল্লাহ ওসমানী জানান, কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা চলছে। তবে এখনো কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা চুক্তি হয়নি। আগ্রহী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে হাসপাতাল, করপোরেট প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংক রয়েছে।

মার্কেটটির অধিকাংশ দোকান আগেই ব্যক্তিমালিকানায় রেজিস্ট্রি করে বিক্রি করা হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। ফলে ভবনটির বাণিজ্যিক অংশের ভবিষ্যৎ ব্যবহারের বিষয়টি মালিকদের সম্মিলিত সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।

কর্ণফুলী গার্ডেন সিটিতে ২০১৭ সাল থেকে ঘড়ি বিক্রির ব্যবসা পরিচালনা করছিল প্রতিষ্ঠান ‘এক্কোচি’। মার্কেটটির নিচতলায় ছিল তাদের দোকান। দীর্ঘদিন সরাসরি ক্রেতার উপস্থিতি কম থাকায় প্রতিষ্ঠানটি মূলত অনলাইন গ্রাহকদের ওপর নির্ভর করে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছিল।

মার্কেট বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটি বেইলি রোডের ক্যাপিটাল সিরাজ সেন্টারে দোকান স্থানান্তর করেছে।

এক্কোচির দায়িত্বে থাকা মো. শফিউল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, মার্কেটটি বিক্রি হয়ে যাচ্ছে এবং একটি পক্ষ এটি কিনে নিচ্ছে বলে তিনি জানতে পেরেছেন। তাঁর ধারণা, ভবনটিতে হাসপাতাল বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান হতে পারে; আগের মতো শপিং মল হিসেবে এটি আর চালু নাও হতে পারে।

শফিউলের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরেই মার্কেটে ক্রেতার উপস্থিতি ছিল খুবই কম। গত প্রায় ১০ বছরে ধীরে ধীরে ব্যবসায়িক কার্যক্রম সংকুচিত হয়েছে। ফলে অনলাইন গ্রাহকদের ওপর নির্ভর করেই ব্যবসা পরিচালনা করতে হয়েছে।

মার্কেটটির ব্যবসায়ীদের মতে, এক দিনে এই পতন ঘটেনি। গত এক দশকে কয়েকটি বড় পরিবর্তন ও সমস্যার সম্মিলিত প্রভাবে ক্রেতা ও ব্যবসায়ী হারিয়েছে কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি।

প্রথমত, ফ্লাইওভার নির্মাণ ও সড়ক সংস্কার। শান্তিনগর এলাকায় ফ্লাইওভার নির্মাণ এবং দীর্ঘ সময় ধরে সড়ক সংস্কারকাজ চলার সময় ক্রেতাদের যাতায়াত ব্যাহত হয়। এতে মার্কেটে ক্রেতার সংখ্যা কমতে থাকে। অনেক প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী বিকল্প মার্কেটে চলে যান। পরে যোগাযোগব্যবস্থা স্বাভাবিক হলেও তাঁদের অনেকে আর ফিরে আসেননি।

দ্বিতীয়ত, করোনাকালীন ব্যবসায়িক মন্দা। কোভিড-১৯ মহামারির সময় লকডাউন ও স্বাভাবিক বাণিজ্যিক কার্যক্রমে বিঘ্নের কারণে ব্যবসায় বড় ধাক্কা লাগে। ওই সময় আরও কিছু প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী মার্কেট ছেড়ে চলে যান। ফলে আগের ক্রেতাদের ফিরিয়ে আনা কঠিন হয়ে পড়ে।

তৃতীয়ত, কিছু ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, কিছু দোকানি স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ করা পণ্য বিদেশি বলে বিক্রি করতেন। এতে অভিজাত ও মানসম্মত পণ্যের প্রত্যাশী ক্রেতাদের আস্থা কমে যায়। একপর্যায়ে এসব ক্রেতার একটি অংশ মার্কেটটি এড়িয়ে চলতে শুরু করেন।

চতুর্থত, অনলাইন কেনাকাটা ও বড় শপিং মলের সঙ্গে প্রতিযোগিতা। ই-কমার্স ও ফেসবুকভিত্তিক কেনাকাটার প্রসার ক্রেতাদের কেনাকাটার অভ্যাস বদলে দিয়েছে। পাশাপাশি বসুন্ধরা সিটি ও যমুনা ফিউচার পার্কের মতো বড় শপিং মলে একই জায়গায় নানা ধরনের পণ্য পাওয়ায় ক্রেতাদের কাছে সেগুলো বেশি আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।

ব্যবসায়ীদের মতে, তুলনামূলক ছোট পরিসরের কর্ণফুলী গার্ডেন সিটিতে একসঙ্গে সব ধরনের পণ্য পাওয়ার সুযোগ সীমিত ছিল। ফলে অনেক ক্রেতা প্রয়োজনীয় সবকিছু কেনার জন্য অন্য বড় মার্কেট কিংবা অনলাইন প্ল্যাটফর্মকে বেছে নেন।

মার্কেটটির পতনের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বাকীবিল্লাহ ওসমানী বলেন, ফ্লাইওভার নির্মাণ ও সড়ক সংস্কারের সময় ক্রেতারা মার্কেটে আসা কমিয়ে দেন। সে সময় যেসব ব্যবসায়ী অন্য মার্কেটে চলে গিয়েছিলেন, তাঁদের অনেকে আর ফেরেননি। পরে করোনাকালীন মন্দায় আরও কিছু ব্যবসায়ী চলে যাওয়ায় পরিস্থিতি কঠিন হয়ে ওঠে।

অনলাইন কেনাকাটার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, এখন ঘরে বসেই পোশাক থেকে শুরু করে ছোটখাটো প্রয়োজনীয় পণ্য অর্ডার করা যায়। অন্যদিকে, বড় শপিং মলগুলোতে এক জায়গায় অনেক ধরনের পণ্য পাওয়া যায়। কর্ণফুলী গার্ডেন সিটিতে সেই বৈচিত্র্য তুলনামূলক কম থাকায় ক্রেতাদের আকৃষ্ট করা কঠিন হয়ে পড়েছিল।

কিছু ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে পণ্যের উৎস সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর তথ্য দেওয়ার অভিযোগও করেন তিনি। তাঁর দাবি, স্থানীয় বাজার থেকে সংগ্রহ করা পণ্য বিদেশি বলে বিক্রি করার কারণে কিছু বিশ্বস্ত ক্রেতা মার্কেটটি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন।

প্রায় তিন দশক ধরে রাজধানীর শান্তিনগর-কাকরাইল এলাকার বাণিজ্যিক পরিচয়ের অংশ ছিল কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি। পোশাক, জুতা, প্রসাধনী, উপহারসামগ্রী ও বিভিন্ন ব্র্যান্ডের দোকান নিয়ে গড়ে ওঠা এই বিপণিবিতান একসময় ক্রেতাদের কাছে পরিচিত গন্তব্য ছিল।

কিন্তু ক্রেতা সংকট, ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতা, আর্থিক চাপ ও পরিচালন ব্যয় সামাল দিতে না পারায় শেষ পর্যন্ত বন্ধের সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে মালিকদের। এখন ভবনটির বাণিজ্যিক অংশে হাসপাতাল, করপোরেট অফিস, ব্যাংক কিংবা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে কি না, তা নির্ভর করছে চলমান আলোচনার ফলাফলের ওপর।

এখন পর্যন্ত কোনো চুক্তি চূড়ান্ত না হওয়ায় ভবনটির পরবর্তী ব্যবহার নিয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—একসময়ের পরিচিত শপিং মলটি আপাতত আর আগের রূপে চালু নেই।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন