জনবল সংকট কাটাতে বছরে ১৫ হাজার নিয়োগ, ৫ হাজার ৮০০ গাড়ি কেনার প্রকল্প অনুমোদন
পুলিশ বাহিনীর ভেতরে মাদক-সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে গত দুই মাসে ২৭ জন কর্মকর্তা ও সদস্যকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির। একই সঙ্গে পুলিশের যানবাহন সংকট দূর করতে প্রায় ৫ হাজার ৮০০ গাড়ি কেনার প্রকল্প নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। জনবলের ঘাটতি পূরণে প্রতি বছর ন্যূনতম ১৫ হাজার নতুন পুলিশ সদস্য নিয়োগ দেওয়া হবে বলেও জানিয়েছেন আইজিপি।
রোববার (২৫ অক্টোবর) সকালে বাগেরহাট জেলা পুলিশ লাইন্স মিলনায়তনে কমিউনিটি পুলিশিং সমাবেশ ও প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব কথা বলেন তিনি।
মাদক-সংশ্লিষ্টতায় পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা
আইজিপি বলেন, “গত দুই মাসে আমি ২৭ জন পুলিশ অফিসারকে, পুলিশ সদস্যকে জেলে পাঠিয়েছি এই মাদকের কারণে। আপনারা আর কী চান? আগে ঘর পরিষ্কার হোক, তারপরে আপনারা পরিষ্কার হবেন।”
পুলিশ বাহিনীর অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা, মাদক নির্মূল, জনবল ও যানবাহন সংকট এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, পুলিশ বাহিনীকে অকার্যকর করে দেওয়া হয়েছিল। যারা বাহিনীকে দুর্বল করেছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
পুলিশ সদস্যদের উদ্দেশে আইজিপি বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার দায়িত্ব দিয়ে কাউকে কক্সবাজারে পাঠানো হলে তিনি নিজেই মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন না।
৫ হাজার ৮০০ গাড়ি কেনার প্রকল্প
পুলিশ বাহিনীকে আরও শক্তিশালী করতে বর্তমান সরকার বিভিন্ন কার্যক্রম হাতে নিয়েছে বলে জানান আইজিপি। তিনি বলেন, পুলিশের যানবাহনের চাহিদার তুলনায় প্রায় আড়াই হাজার গাড়ির ঘাটতি রয়েছে। এ ছাড়া আট থেকে ২০ বছর বয়সী পুরোনো গাড়ির সংখ্যাও কম নয়।
সব মিলিয়ে প্রায় ৫ হাজার ৮০০ গাড়ি কেনার জন্য নতুন একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। গত সপ্তাহে প্রকল্পটি অনুমোদন পেয়েছে বলে জানান তিনি।
প্রতি বছর নিয়োগ দেওয়া হবে ১৫ হাজার পুলিশ সদস্য
পুলিশের বিদ্যমান সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধানের আশাবাদ জানিয়ে আইজিপি বলেন, জনবলের ঘাটতি একসঙ্গে পূরণ করা সম্ভব নয়। এ জন্য প্রতি বছর ন্যূনতম ১৫ হাজার নতুন সদস্য নিয়োগ দেওয়া হবে। এর মাধ্যমে ধীরে ধীরে জনবল সংকট কাটিয়ে পুলিশের লজিস্টিক সহায়তা আরও শক্তিশালী করা হবে।
মাদক ও কিশোর গ্যাং প্রতিরোধে জনসম্পৃক্ততা
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে মাদক, কিশোর গ্যাং, দুর্নীতি ও বিভিন্ন ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান আইজিপি।
তিনি বলেন, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির জন্য আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে বেকারত্ব একটি বড় সমস্যা। প্রতি বছর প্রায় ২৫ থেকে ৩০ লাখ শিক্ষিত বেকার জনগোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন। বেকারত্ব মোকাবিলা, তরুণদের পুনর্বাসন এবং মাদকের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা নীতি বাস্তবায়নে সবাইকে কাজ করতে হবে।
কমিউনিটি পুলিশিংয়ের মাধ্যমে অপরাধ দমন, সামাজিক সমস্যা সমাধান এবং মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে বলেও জানান তিনি। মাদক, কিশোর গ্যাং, দুর্নীতি ও সম্পত্তিসংক্রান্ত অপরাধ প্রতিরোধে এ ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করা হবে।
কিশোর গ্যাং নির্মূলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) নিয়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে উল্লেখ করে আইজিপি বলেন, এ কার্যক্রম ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত করা হবে।
স্থানীয় মানুষের কাছে অপরাধের তথ্য অনেক সময় পুলিশের চেয়েও বেশি থাকে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ইউনিয়নের কোন পাড়ায় কে মাদক সেবন করেন, কারা অপরাধে জড়িত কিংবা কোথায় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড হচ্ছে—এসব তথ্য স্থানীয় বাসিন্দারা অনেক সময় ভালো জানেন। তাই পুলিশকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করার আহ্বান জানান তিনি।
গুজব ও ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সতর্ক থাকার আহ্বান
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিথ্যা তথ্য ও গুজব ছড়িয়ে দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন আইজিপি। তিনি বলেন, “প্রতিটা জায়গায় ষড়যন্ত্র। আমি বুঝি, আমার বাংলাদেশ, সবার আগে বাংলাদেশ। প্রধানমন্ত্রী এসেই বলেছে, প্ল্যান। এটার ভিতরে আপনারা ষড়যন্ত্র খুঁজেন কেন? সে কোন কাজটা খারাপ করছে?”
তিনি আরও বলেন, “ব্যাংক শূন্য, সবকিছু শূন্য। তারপরে আবার বলেন, ওনারাই ফেরেশতা। আর এখন যারা আমরা আছি, আমরা সব খারাপ লোক।”
দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আপস করা যাবে না উল্লেখ করে আইজিপি বলেন, যারা দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে দুর্বল করতে চান, তাঁদের সঙ্গে আঁতাতকারীরা দেশপ্রেমিক হতে পারেন না।
জনগণের সহযোগিতা চাইলেন আইজিপি
সবশেষে জনগণের সহযোগিতা কামনা করে আইজিপি বলেন, পুলিশকে শক্তিশালী করতে না পারলে কেউ দিন-রাতে স্বাচ্ছন্দ্যে চলাফেরা করতে পারবেন না। জনগণের সার্বিক সহযোগিতা পেলে বাংলাদেশ পুলিশ একটি সুখী, সমৃদ্ধ ও শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশ উপহার দিতে পারবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
বাগেরহাটের পুলিশ সুপার মো. জামিলুর ইসলামের সভাপতিত্বে সভায় খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি মো. রেজাউল করিম, বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন, সরকারি পিসি কলেজের অধ্যক্ষ পারভীন আক্তার, বাগেরহাট প্রেসক্লাবের সভাপতি আবু সাইদ শুনুসহ জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

