রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬

গণঅভ্যুত্থানের অপরাধে দুই ট্রাইব্যুনালে ৭ রায়, যাবজ্জীবন ১১ জনের

দুটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ৭ মামলার রায়, যাবজ্জীবন ১১ জনের; বিচারাধীন আরও ২৬টি মামলা

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের সাতটি আলোচিত মামলায় ২৩ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ১১ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন দুটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এসব মামলায় বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড পেয়েছেন ৩৩ জন। খালাস পেয়েছেন একজন আসামি।

গত দুই বছরে ট্রাইব্যুনালগুলোর বিচারিক কার্যক্রমের সর্বশেষ তথ্য সম্প্রতি প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে তুলে ধরা হয়েছে। প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিমের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জুলাই-আগস্টে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা এখন পর্যন্ত ৭০টি। এর মধ্যে ২৬টি বিচারাধীন এবং ৪৪টি মিস কেস হিসেবে রয়েছে।

দুটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এসব মামলায় গ্রেপ্তার আসামির সংখ্যা ২০৩। পলাতক রয়েছেন ৩৫২ জন।

দ্রুত বিচার শেষ করার আশা প্রসিকিউশনের

চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসকে বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ও আহত ব্যক্তিদের বিচারের প্রতিশ্রুতি নিয়ে ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠিত হয়েছিল। এরই মধ্যে দুটি ট্রাইব্যুনাল সাতটি আলোচিত মামলার রায় দিয়েছেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।

আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘খুব দ্রুততার সাথে এবং অত্যন্ত সত্যতার সাথে এই বিচারগুলো সম্পন্ন করা হয়েছে।’

তিনি আশা প্রকাশ করেন, জনআকাঙ্ক্ষার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে অবশিষ্ট মামলাগুলোর বিচার দ্রুত শেষ হবে এবং রায় কার্যকর হবে।

পলাতক আসামিদের বিষয়ে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, তাঁদের বিচারের মুখোমুখি করার চেষ্টা চলছে। তাঁর ভাষ্য, কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি যেন হয়রানির শিকার না হন এবং কোনো দোষী ব্যক্তি যেন ছাড় না পান, তা নিশ্চিত করতে চায় প্রসিকিউশন।

শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের মৃত্যুদণ্ড

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর মৃত্যুদণ্ড দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। একই মামলায় রাজসাক্ষী হওয়া পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল-মামুনকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল ওই রায়ে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেন। পাশাপাশি শহীদদের পরিবার ও আহত ব্যক্তিদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়।

চাঁনখারপুলে ছয়জনকে হত্যার মামলায় তিন পুলিশ কর্মকর্তার মৃত্যুদণ্ড

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজধানীর চাঁনখারপুল এলাকায় শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে ছয়জন নিহত হওয়ার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ২০২৬ সালের ২৬ জানুয়ারি রায় দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১।

ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, সাবেক যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী ও রমনা অঞ্চলের সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার শাহ আলম মো. আখতারুল ইসলামকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

এ ছাড়া সাবেক সহকারী কমিশনার মোহাম্মদ ইমরুলকে ছয় বছর, শাহবাগ থানার সাবেক ওসি (অপারেশন) মো. আরশেদ হোসেনকে চার বছর এবং তিন কনস্টেবল মো. সুজন মিয়া, মো. ইমাজ হোসেন ইমন ও মো. নাসিরুল ইসলামকে তিন বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

চাঁনখারপুলে নিহত ছয়জন হলেন শাহরিয়ার খান আনাস, শেখ মাহদী হাসান জুনায়েদ, মো. ইয়াকুব, মো. রাকিব হাওলাদার, মো. ইসমামুল হক ও মানিক মিয়া শাহরিক।

আশুলিয়ায় লাশ পোড়ানোর মামলায় ছয়জনের মৃত্যুদণ্ড

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় আশুলিয়ায় ছয়জনের লাশ পোড়ানো এবং আরও একজনকে হত্যার ঘটনায় ২০২৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি রায় দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। সাবেক সংসদ সদস্য মুহাম্মদ সাইফুল ইসলামসহ ছয় আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। একই মামলায় সাতজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অন্য আসামিরা হলেন আশুলিয়া থানার তৎকালীন ওসি এএফএম সায়েদ রনি, সাবেক এএসআই বিশ্বজিৎ সাহা, সাবেক এসআই আবদুল মালেক, সাবেক কনস্টেবল মুকুল চোকদার ও স্থানীয় যুবলীগ নেতা রনি ভূঁইয়া।

যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্তদের মধ্যে রয়েছেন ঢাকা রেঞ্জের সাবেক ডিআইজি সৈয়দ নুরুল ইসলাম, সাবেক পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামান রিপন, সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবদুল্লাহিল কাফী, সাভার সার্কেলের সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. শহিদুল ইসলাম এবং পুলিশের আরও তিন কর্মকর্তা।

এ ছাড়া সাবেক এসআই আরাফাত উদ্দীন ও কামরুল হাসানকে সাত বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। মামলায় রাজসাক্ষী হওয়া শেখ আবজালুল হককে ক্ষমা করেন ট্রাইব্যুনাল।

আবু সাঈদ হত্যা মামলায় দুইজনের মৃত্যুদণ্ড

২০২৪ সালের জুলাইয়ে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যার ঘটনায় ২০২৬ সালের ৯ এপ্রিল রায় দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। সাবেক এএসআই মো. আমির হোসেন ও সাবেক কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়কে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। তিনজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

রায়ে অন্য আসামিদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তাঁদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. হাসিবুর রশিদ, রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সাবেক কমিশনার মনিরুজ্জামান, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, পুলিশ কর্মকর্তা ও তৎকালীন ছাত্রলীগের নেতারা রয়েছেন।

একাধিক আসামিকে ১০ বছর, কয়েকজনকে পাঁচ বছর এবং আরও কয়েকজনকে তিন বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। প্রক্টর অফিসের চুক্তিভিত্তিক কর্মচারী আনোয়ার পারভেজের হাজতবাসের সময়কেই কারাবাস হিসেবে গণ্য করার নির্দেশ দেওয়া হয়।

রামপুরায় হত্যার মামলায় তিনজনের মৃত্যুদণ্ড

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর রামপুরায় একটি নির্মাণাধীন ভবনের কার্নিশে ঝুলে থাকা এক তরুণকে গুলি এবং একই এলাকায় আরও দুজনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ২৮ জুন রায় দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১।

রায়ে ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, খিলগাঁও অঞ্চলের সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার মো. রাশেদুল ইসলাম এবং রামপুরা থানার সাবেক ওসি মো. মশিউর রহমানকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। সাবেক এসআই তারিকুল ইসলাম ভূঁইয়াকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং রামপুরা পুলিশ ফাঁড়ির সাবেক এএসআই চঞ্চল চন্দ্র সরকারকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

হাসানুল হক ইনুর ১০ বছরের কারাদণ্ড

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনুকে ৩০ জুন ১০ বছরের কারাদণ্ড দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২।

বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল একই সঙ্গে মামলার দুটি অভিযোগে এক লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেন। গণঅভ্যুত্থান দমনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে কথোপকথনের মাধ্যমে কমান্ড রেসপনসিবিলিটি এবং কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় ইনুর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছিল।

ওবায়দুল কাদেরসহ সাতজনের মৃত্যুদণ্ড

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ সাতজনকে ১৫ সেপ্টেম্বর মৃত্যুদণ্ড দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অন্য আসামিরা হলেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ ও সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল এবং ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান।

আসামিদের সবাই পলাতক রয়েছেন। রায়ে ওবায়দুল কাদের, বাহাউদ্দিন নাছিম, মোহাম্মদ আলী আরাফাত, শেখ ফজলে শামস পরশ ও মাইনুল হোসেন খানের সম্পত্তির অর্ধেক বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়। বাজেয়াপ্ত সম্পত্তি জুলাই শহীদদের পরিবার ও আহত ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেওয়ার আদেশও দেন ট্রাইব্যুনাল।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের পাশাপাশি আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুম-খুনের অভিযোগের বিচারও দুটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চলমান রয়েছে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন