চলতি অর্থবছরে ৪৩ লাখ কৃষককে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা, এ পর্যন্ত তথ্য সংগ্রহ ১৯ লাখ ২৫ হাজার কৃষকের
দেশের কৃষকদের নিবন্ধন, আর্থিক সহায়তা প্রদান ও কৃষি উপকরণ বিতরণ সহজ করতে দেশব্যাপী ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে সরকার। আগামী চার বছরে প্রায় ২ কোটি ৪০ লাখ কৃষককে এ কর্মসূচির আওতায় আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৪৩ লাখ কৃষককে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
কর্মসূচির আওতায় দেশের ৬৪ জেলার ৫০৩টি উপজেলায় ১৪ হাজার ১৮০টি কৃষি ব্লককে পর্যায়ক্রমে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে ১ হাজার ৬৮১টি কৃষি ব্লকে কৃষকদের তথ্য সংগ্রহের অগ্রগতি হয়েছে। সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত ১৯ লাখ ২৫ হাজার কৃষকের তথ্য নেওয়া হয়েছে এবং কৃষক কার্ড-সংক্রান্ত ব্যাংক হিসাব খোলা হয়েছে ৯ লাখ।
প্রাথমিক পর্যায়ে ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকদের অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। কৃষকদের একটি সমন্বিত তথ্যভান্ডার গড়ে তোলা এবং তাঁদের কাছে আর্থিক সহায়তা ও কৃষি উপকরণ পৌঁছে দেওয়াই এ কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য।
প্রাক-পাইলটিংয়ে কার্ড পেয়েছেন ২০ হাজারের বেশি কৃষক
কৃষক কার্ড কর্মসূচির বাস্তবায়নপ্রক্রিয়া যাচাই করতে ২০২৬ সালের মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত প্রাক-পাইলটিং কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। এ পর্যায়ে দেশের আট বিভাগের ১০ জেলার ১১টি উপজেলার ১১টি কৃষি ব্লকে ২০ হাজার ৮৩২ জন কৃষকের মধ্যে কার্ড বিতরণ করা হয়েছে।
গত ১৪ এপ্রিল বাংলা নববর্ষের প্রথম দিনে টাঙ্গাইল সদর উপজেলায় আনুষ্ঠানিকভাবে এ কার্যক্রমের উদ্বোধন করা হয়। পরে নির্ধারিত এলাকাগুলোতে প্রাক-পাইলটিং কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
এ পর্যায়ে ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকদের মধ্যে ২০ হাজার ৪৮০ জনকে আর্থিক প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে। জনপ্রতি বছরে ২ হাজার ৫০০ টাকা হিসাবে মোট ৫ কোটি ১২ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়।
প্রাক-পাইলটিংয়ের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে কর্মসূচির পরিধি আরও বিস্তৃত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
৫৬ জেলার ৭৭ উপজেলায় কার্যক্রমের সম্প্রসারণ
গত ১ অক্টোবর দেশের ৫৬ জেলার ৭৭টি উপজেলায় ভার্চুয়ালি একযোগে কৃষক কার্ড কর্মসূচির কার্যক্রম উদ্বোধন করা হয়। এ পর্যায়ে প্রতিটি উপজেলা থেকে একটি করে কৃষি ব্লক নির্বাচন করা হয়েছে।
নির্বাচিত এলাকাগুলোতে মোট ১ লাখ ১০ হাজার ১৬৫ জন কৃষককে কর্মসূচির আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ফেনী জেলার ছয়টি উপজেলার ৭ হাজার ৬৪৩ জন কৃষক রয়েছেন।
একই পর্যায়ে কৃষি উপকরণ সহায়তার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে ১ লাখ ৪৭ জন কৃষককে। এর মধ্যে ফেনীর ছয়টি উপজেলার ৭ হাজার ১৫৩ জন এবং অন্য ৫৫ জেলার ৯২ হাজার ৮৯৪ জন কৃষক রয়েছেন।
কর্মসূচিটি একযোগে সব কৃষি ব্লকে চালু না করে ধাপে ধাপে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তথ্য সংগ্রহ, কৃষক নিবন্ধন, ব্যাংক হিসাব খোলা এবং কার্ড বিতরণের অগ্রগতির ভিত্তিতে পরবর্তী কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হবে।
কৃষকের তথ্যভান্ডার গড়ে তোলার উদ্যোগ
কৃষকদের সঠিক তথ্য সংগ্রহ, তাঁদের চাহিদা নিরূপণ এবং কৃষিসেবা আরও কার্যকর করার ক্ষেত্রে তথ্যভান্ডার গড়ে তোলাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কৃষকদের চাহিদা ও প্রয়োজন সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হওয়ায় তথ্য সংগ্রহ ও হালনাগাদ রাখাকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
কৃষক কার্ড কর্মসূচি বাস্তবায়নে মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালন করছে প্রোগ্রাম অন এগ্রিকালচারাল অ্যান্ড রুরাল ট্রান্সফরমেশন ফর নিউট্রিশন, এন্টারপ্রেনারশিপ অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স ইন বাংলাদেশ (পার্টনার) প্রকল্প।
প্রকল্পটির ডেপুটি প্রোগ্রাম ডিরেক্টর (ডিপিডি) মো. রাকিবুজ্জামান খান রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসকে বলেন, কৃষকদের সঠিক তথ্য সংগ্রহ, তাঁদের চাহিদা নিরূপণ এবং কৃষির আধুনিকায়নে সহায়তা দেওয়ার লক্ষ্যে প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছে।
তিনি বলেন, কৃষকের চাহিদা মৌসুমভিত্তিক পরিবর্তিত হওয়ায় তথ্য সংগ্রহে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তবে নির্ভরযোগ্য তথ্যভান্ডার গড়ে তোলা গেলে কৃষকদের প্রয়োজন অনুযায়ী প্রশিক্ষণ, আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তি, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ও কৃষি উদ্যোক্তা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া সহজ হবে।
রাকিবুজ্জামান খান আরও বলেন, ইতোমধ্যে ২২ হাজার কৃষকের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। কৃষক কার্ড কর্মসূচির সঙ্গে তথ্য ও কার্যক্রমের সমন্বয় করা গেলে কৃষকদের বিভিন্ন কৃষিসেবার আওতায় আনা এবং মাঠপর্যায়ে সরকারি উদ্যোগের কার্যকারিতা বাড়ানো সম্ভব হবে।
সরকারি সহায়তা পৌঁছানো সহজ করাই লক্ষ্য
কৃষি মন্ত্রণালয়ের কৃষক কার্ড সেলের অতিরিক্ত সচিব মো. ইয়াসীন বাসসকে বলেন, কৃষক কার্ড কর্মসূচির মূল লক্ষ্য হলো কৃষকদের সঠিক তথ্য সংরক্ষণ এবং তাঁদের কাছে সরকারি সহায়তা পৌঁছানোর প্রক্রিয়াকে সহজ ও কার্যকর করা। এ জন্য তথ্য সংগ্রহ, যাচাই, ব্যাংক হিসাব খোলা ও পর্যায়ক্রমে কার্ড বিতরণের কাজ সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সেলিম খান বাসসকে বলেন, কৃষক কার্ডের মাধ্যমে প্রকৃত কৃষকদের শনাক্ত করা, তাঁদের প্রয়োজন অনুযায়ী কৃষি উপকরণ ও আর্থিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়া এবং কৃষিসেবা কার্যক্রম আরও সুশৃঙ্খল করার সুযোগ তৈরি হবে।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী আগামী চার বছরের মধ্যে ২ কোটি ৪০ লাখ কৃষককে কৃষক কার্ড দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
কৃষক কার্ডে মিলবে ১০ ধরনের সেবা
কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সেলিম খান জানান, কৃষক কার্ডের মাধ্যমে কৃষকেরা ১০ ধরনের সেবা পাবেন। এর মধ্যে রয়েছে স্বল্প সুদে কৃষিঋণ, সেচ, সার, বীজ, প্রণোদনা, কৃষিবিমা, আবহাওয়াবিষয়ক তথ্য ও বালাইনাশক ব্যবহারের পরামর্শসহ বিভিন্ন সুবিধা।
তিনি বলেন, কৃষক কার্ডের মাধ্যমে কৃষকদের প্রাপ্য সম্মান প্রদর্শনের পাশাপাশি সরকার ও রাষ্ট্র তাঁদের পাশে রয়েছে—এ বার্তাও তুলে ধরা হবে।

