যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ৩০ ঘণ্টা ধরে সংঘাতের খবর নেই; খাদ্য, পানি ও ওষুধের সংকটে থাকা প্রায় দুই হাজার বাসিন্দার কাছে সহায়তা পৌঁছানোর উদ্যোগ
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় খেরসন অঞ্চলের রুশ-অধিকৃত ওলেশকি শহরে কার্যকর হওয়া স্থানীয় যুদ্ধবিরতি দ্বিতীয় দিনেও বহাল রয়েছে। বুধবার রাশিয়া ও ইউক্রেনের মানবাধিকার বিষয়ক ন্যায়পালরা এ তথ্য জানিয়েছেন। এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে খাদ্য, পানি ও ওষুধের সংকটে থাকা শহরটির বাসিন্দাদের কাছে জরুরি মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মঙ্গলবার ভোরে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। বুধবার পর্যন্ত প্রায় ৩০ ঘণ্টায় সেখানে নতুন কোনো সংঘাতের খবর পাওয়া যায়নি বলে দুই দেশের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
খাদ্য ও ওষুধের তীব্র সংকটে বাসিন্দারা
খেরসন অঞ্চলের দিনিপ্রো নদীর তীরবর্তী রুশ-অধিকৃত শহর ওলেশকির বাসিন্দারা কয়েক মাস ধরে খাদ্য, পানি ও ওষুধের সংকটে ভুগছেন। রাশিয়া ও ইউক্রেনের বাহিনীর মধ্যকার লড়াইয়ের মাঝখানে পড়ে তাঁদের স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হচ্ছে।
শহরটির সাবেক বাসিন্দারা, যাঁদের সঙ্গে এখনো সেখানে থাকা মানুষের যোগাযোগ রয়েছে, এএফপিকে জানিয়েছেন, শহরটিতে আনুমানিক দুই হাজার মানুষ রয়ে গেছেন। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ খাবারের অভাবে কবুতর শিকার করে খেতে বাধ্য হয়েছেন।
দীর্ঘদিন ধরে শহরটির বাসিন্দাদের দুর্দশা নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বাড়ছিল। এই পরিস্থিতিতে যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ তৈরি করাই উদ্যোগটির অন্যতম উদ্দেশ্য।
৩০ ঘণ্টায় সংঘাতের খবর নেই: দুই দেশের ন্যায়পাল
ইউক্রেনের মানবাধিকার বিষয়ক ন্যায়পাল দিমিত্রো লুবিনেৎস বুধবার বলেন, ‘ওলেশকিতে যুদ্ধবিরতির ৩০ ঘণ্টা পার হয়েছে, এ সময়ে একটি ঘটনাও ঘটেনি।’
রাশিয়ার মানবাধিকার বিষয়ক ন্যায়পাল ইয়ানা লানত্রাতোভাও প্রায় একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি জানান, ওলেশকিতে যুদ্ধবিরতির প্রথম ৩০ ঘণ্টায় কোনো সংঘাতের ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি।
দুই পক্ষের কর্মকর্তাদের এ বক্তব্য যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকার ইঙ্গিত দিলেও এর পরবর্তী মেয়াদ এবং মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর বাস্তব অগ্রগতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য এখনো স্পষ্ট নয়।
বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়ার পথ নিয়ে অনিশ্চয়তা
যুদ্ধবিরতির আওতায় কতজন বাসিন্দা শহর ছেড়ে যেতে চাইবেন এবং তাঁদের কোন পথে সরিয়ে নেওয়া হবে, তা এখনো পরিষ্কার নয়। দিনিপ্রো নদী বরাবর বিস্তৃত যুদ্ধরেখা পেরিয়ে নিরাপদ স্থানে যাওয়া অত্যন্ত কঠিন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
রাশিয়ার নিয়োগ করা কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন, শহর ছাড়তে ইচ্ছুক বাসিন্দাদের রুশ-অধিকৃত ক্রিমিয়া হয়ে যেতে হতে পারে। রুশ কর্মকর্তাদের দাবি, শহর ছেড়ে যেতে ইচ্ছুক বেশির ভাগ মানুষ ইতোমধ্যে চলে গেছেন।
তবে ইউক্রেনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এএফপিকে জানিয়েছেন, ওলেশকির অনেক বাসিন্দাই শহরটিতে থেকে যেতে চান। ফলে শুধু বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়ার বদলে তাঁদের কাছে খাদ্য, ওষুধ ও অন্যান্য জরুরি সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ তৈরি করাও যুদ্ধবিরতির গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য।
যুদ্ধবিরতিতে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতা
শহরটির বাসিন্দাদের দুর্দশা নিয়ে কয়েক মাস ধরে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বাড়তে থাকায় যুক্তরাষ্ট্রের ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প পরিকল্পিত এই যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
যুদ্ধবিরতির উদ্যোগটি এমন এক সময়ে নেওয়া হয়েছে, যখন রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে দীর্ঘদিনের সংঘাতের কারণে সম্মুখযুদ্ধের এলাকায় বেসামরিক মানুষের জীবন ও মানবিক পরিস্থিতি গুরুতর চাপে রয়েছে।
২০২২ সাল থেকে রুশ নিয়ন্ত্রণে ওলেশকি
২০২২ সালে রাশিয়া ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার হামলা শুরু করার পরপরই ওলেশকি শহরটি দখল করে নেয় রুশ বাহিনী। এরপর থেকে শহরটি যুদ্ধের প্রভাবের মধ্যে রয়েছে।
২০২২ সালে রাশিয়ার সঙ্গে শান্তি আলোচনায় অংশ নেওয়া ইউক্রেনের আইনপ্রণেতা দাভিদ আরাখামিয়া এই যুদ্ধবিরতিকে ‘২০২২ সালের পর সবচেয়ে বড় উত্তেজনা প্রশমন’ বলে বর্ণনা করেছেন।
এর আগে অর্থোডক্স ইস্টারের মতো ধর্মীয় উপলক্ষকে কেন্দ্র করে যুদ্ধ চলাকালে স্বল্প সময়ের জন্য যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছিল। তবে সেসব বিরতির সময় আকাশপথে হামলা কমলেও উভয় পক্ষের বিরুদ্ধে ব্যাপকভাবে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছিল।
ওলেশকিতে বর্তমান যুদ্ধবিরতি কতটা স্থায়ী হবে, তা এখনো অনিশ্চিত। তবে বিরতি বহাল থাকলে দীর্ঘদিন অবরুদ্ধ বাসিন্দাদের কাছে জরুরি সহায়তা পৌঁছানো এবং তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

